প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) সুবিধাভোগীর তালিকা যাচাই-বাছাই করে ৫৯ লাখ অযোগ্য সুবিধাভোগীকে বাদ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। একই সঙ্গে আগামী চার থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে টিসিবির ভর্তুকি শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছেন তিনি। বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর কারওয়ান বাজারে টিসিবির পণ্য বিক্রি কার্যক্রম ও ডিজিটাল রূপান্তর-সংক্রান্ত অনুষ্ঠানে এসব তথ্য জানান মন্ত্রী।
সরকারের ভর্তুকির আওতায় নিম্নআয়ের মানুষের কাছে ন্যায্যমূল্যে বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে টিসিবি দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। বাজারে পণ্যের দাম বাড়লে সীমিত আয়ের পরিবারগুলোর ওপর চাপ কমাতে টিসিবির কার্যক্রম বিশেষ গুরুত্ব পায়। ফলে সুবিধাভোগীর তালিকা কতটা সঠিক, প্রকৃত দরিদ্র ও প্রয়োজনীয় মানুষ কতটা সুবিধা পাচ্ছেন এবং সরকারি অর্থ কীভাবে ব্যয় হচ্ছে—এসব বিষয়ও টিসিবির কার্যক্রমের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
বাণিজ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, যাচাই-বাছাইয়ের পর ৫৯ লাখ অযোগ্য সুবিধাভোগীকে টিসিবির কার্ড থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে এবং প্রকৃত সুবিধাভোগীদের কার্ড দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে তালিকার নির্ভুলতা বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারি সহায়তা প্রকৃত প্রাপকদের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হবে বলে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে।
বৃহস্পতিবারের অনুষ্ঠানে টিসিবির কার্যক্রমের ডিজিটাল রূপান্তরের বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। মন্ত্রী জানান, টিসিবির কার্ড ডিজিটাল করার ফলে সরকারের ৩০০ কোটি থেকে সাড়ে ৩০০ কোটি টাকা পর্যন্ত সাশ্রয় হতে পারে। ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে সুবিধাভোগীদের তথ্য ব্যবস্থাপনা আরও সহজ ও কার্যকর করার পাশাপাশি কার্ডসংক্রান্ত বিভিন্ন জটিলতা কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
বর্তমানে টিসিবির পণ্য নিতে সুবিধাভোগীদের কার্ড ব্যবহারের প্রয়োজন হয়। কোনো কার্ড হারিয়ে গেলে বা নষ্ট হয়ে গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি যেন শুধু কার্ডের সমস্যার কারণে পণ্য পাওয়া থেকে বঞ্চিত না হন, সে ব্যবস্থাও ডিজিটাল পদ্ধতির মাধ্যমে করার কথা জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী। এতে সুবিধাভোগীদের জন্য পণ্য সংগ্রহের প্রক্রিয়া সহজ হওয়ার পাশাপাশি কার্ড ব্যবস্থাপনায়ও পরিবর্তন আসবে।
টিসিবির ডিজিটাল রূপান্তরের পেছনে আরেকটি বড় লক্ষ্য হচ্ছে সরকারি ভর্তুকির অর্থ ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ ও দক্ষতা বাড়ানো। দীর্ঘদিন ধরে ভর্তুকিনির্ভর এ কার্যক্রম পরিচালনার ফলে সরকারের ওপর যে আর্থিক চাপ তৈরি হয়, সেটি ধীরে ধীরে কমানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তবে একই সঙ্গে নিম্নআয়ের মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা কীভাবে অব্যাহত রাখা হবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে থাকছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেছেন, আগামী চার থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে টিসিবির ভর্তুকি শূন্যে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থাৎ বর্তমান ভর্তুকিনির্ভর ব্যবস্থাকে ধীরে ধীরে এমন একটি কাঠামোয় নেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে, যেখানে সরকারি ভর্তুকির প্রয়োজন কমে আসবে। মন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, এ পরিবর্তন একবারে নয়, বরং কয়েক বছরের মধ্যে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
তবে টিসিবির কার্যক্রম শুধু সরকারি ব্যয় কমানোর বিষয় নয়; এর সঙ্গে দেশের বাজারব্যবস্থা ও নিম্নআয়ের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ও জড়িত। বাজারে যখন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যায়, তখন সীমিত আয়ের মানুষের জন্য ভর্তুকিমূল্যে পণ্য কেনার সুযোগ সংসারের ব্যয় সামলাতে কিছুটা সহায়তা করতে পারে। তাই ভর্তুকি কমানোর পাশাপাশি বাজারে পণ্যের সরবরাহ ও দামের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
বাণিজ্যমন্ত্রী নিজেও অনুষ্ঠানে বাজারের সরবরাহব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সরবরাহ ও সাপ্লাই চেইনের মধ্যে বৈষম্য রয়েছে এবং এ কারণে বাজারে এখনো পুরোপুরি স্থিতিশীলতা আসেনি। ভর্তুকির মাধ্যমে টিসিবি যে কার্যক্রম পরিচালনা করছে, তা মানুষের জন্য উপকারী হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
এখানে টিসিবির ভূমিকা দুটি দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। একদিকে বাজারে সরকারি হস্তক্ষেপের মাধ্যমে নির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষের কাছে কম দামে পণ্য পৌঁছে দেওয়া, অন্যদিকে বাজারের সরবরাহ পরিস্থিতি ও পণ্যের দামের ওপর চাপ কমাতে সহায়ক ভূমিকা রাখা। ফলে টিসিবির ভবিষ্যৎ কাঠামো পরিবর্তনের ক্ষেত্রে শুধু ভর্তুকির পরিমাণ নয়, বাজার পরিস্থিতি এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বিষয়টিও বিবেচনায় আসবে।
টিসিবির কার্ড ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তনের পাশাপাশি ডিলার নিয়োগ পদ্ধতিতেও ডিজিটাল ব্যবস্থা চালুর কথা জানানো হয়েছে। প্রয়োজনের তুলনায় আবেদনকারী বেশি হলে ডিজিটাল পদ্ধতিতে লটারির মাধ্যমে ডিলার নির্বাচন করার পরিকল্পনার কথা মন্ত্রী জানিয়েছেন। এর মাধ্যমে ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে আবেদন ও বাছাই প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ করার লক্ষ্য রয়েছে।
ডিলার নিয়োগের ক্ষেত্রে অনলাইন ব্যবস্থা চালুর বিষয়টিও টিসিবির সামগ্রিক ডিজিটাল রূপান্তরের অংশ। বর্তমানে টিসিবির পণ্য বিক্রির সঙ্গে বিপুলসংখ্যক ডিলার যুক্ত থাকায় তাঁদের ব্যবস্থাপনা, পণ্য সরবরাহ এবং সুবিধাভোগীদের কাছে পণ্য পৌঁছানোর প্রক্রিয়ায় কার্যকর নজরদারি গুরুত্বপূর্ণ। ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে এসব তথ্য দ্রুত সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনা করা গেলে অনিয়ম শনাক্ত এবং কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের সুযোগ বাড়তে পারে।
অন্যদিকে, কর্মসংস্থানের অভাবের কারণে অনেক মানুষ ডিলার হওয়ার আগ্রহ দেখালেও প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত আবেদনকারীকে ডিলার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কোনো একটি খাতে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি মানুষ নিয়োগ দেওয়ার সুযোগ নেই। ফলে ডিলার নিয়োগেও প্রয়োজন, সক্ষমতা ও নির্ধারিত সংখ্যার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
টিসিবির সুবিধাভোগীর তালিকা থেকে ৫৯ লাখ মানুষ বাদ দেওয়ার বিষয়টি তাই শুধু একটি প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়। এর মাধ্যমে সরকারের সামাজিক সহায়তা ব্যবস্থায় কারা প্রকৃত সুবিধাভোগী হিসেবে থাকবেন, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে। তালিকা থেকে বাদ পড়া ব্যক্তিদের যোগ্যতা কীভাবে যাচাই করা হয়েছে, ভবিষ্যতে নতুন করে যোগ্য কেউ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার সুযোগ কীভাবে পাবেন এবং প্রকৃত সুবিধাভোগীদের বাদ পড়া ঠেকাতে কী ধরনের যাচাই থাকবে—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
সরকারের পক্ষ থেকে ডিজিটাল রূপান্তরের মাধ্যমে প্রকৃত সুবিধাভোগীদের সেবা নিশ্চিত করার কথা বলা হলেও বাস্তব প্রয়োগে ডিজিটাল ব্যবস্থার সহজলভ্যতাও বিবেচনা করা প্রয়োজন। দেশের সব শ্রেণির মানুষ প্রযুক্তি ব্যবহারে সমানভাবে দক্ষ নন। বিশেষ করে নিম্নআয়ের ও বয়স্ক সুবিধাভোগীদের জন্য নতুন ব্যবস্থাটি কতটা সহজ ও ব্যবহারবান্ধব হবে, তা টিসিবির ভবিষ্যৎ কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী চার থেকে পাঁচ বছরে টিসিবির ভর্তুকি শূন্যে নামিয়ে আনার উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমেও বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। তবে সেই পরিবর্তনের সঙ্গে বাজারে নিত্যপণ্যের মূল্য, সরবরাহব্যবস্থা এবং নিম্নআয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতার সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ। ভর্তুকি কমানোর ফলে সরকারি ব্যয় কমলেও সাধারণ মানুষের জন্য সাশ্রয়ী দামে পণ্য পাওয়ার সুযোগ কীভাবে বজায় থাকবে, তা নীতিনির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে।
সব মিলিয়ে টিসিবির ৫৯ লাখ সুবিধাভোগী বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত, কার্ডের ডিজিটাল রূপান্তর, ডিলার নিয়োগে অনলাইন ব্যবস্থা এবং আগামী কয়েক বছরে ভর্তুকি শূন্যে নামানোর পরিকল্পনা প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমে একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। সরকারি সহায়তা যেন প্রকৃত প্রয়োজনীয় মানুষের কাছে পৌঁছায় এবং একই সঙ্গে সরকারি অর্থের ব্যবহার আরও দক্ষ ও স্বচ্ছ হয়—এই দুই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই পরিবর্তনগুলো এগিয়ে নেওয়ার কথা বলা হচ্ছে।
আগামী দিনে এসব উদ্যোগ বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, প্রকৃত সুবিধাভোগীরা কতটা সহজে সেবা পান এবং বাজারের অস্থিরতার সময়ে টিসিবি কীভাবে মানুষের পাশে থাকে—সেটিই হবে এই পরিবর্তনগুলোর বাস্তব মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।


