বজ্রপাতে সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জে দুইজনের মৃত্যু

প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।

সুনামগঞ্জের তাহিরপুর ও হবিগঞ্জের মাধবপুরে পৃথক বজ্রপাতের ঘটনায় দুইজনের মৃত্যু হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) সকালে অল্প সময়ের ব্যবধানে জেলার দুটি উপজেলায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহতদের একজন নৌযান শ্রমিক এবং অন্যজন কৃষিকাজে নিয়োজিত ছিলেন।

তাহিরপুরে মাটিয়ান হাওরে বজ্রপাতে নিহত হয়েছেন শিপু মিয়া। তিনি উপজেলার বালিজুরী গ্রামের আতাউর রহমানের ছেলে। জীবিকার প্রয়োজনে দীর্ঘদিন ধরে ইঞ্জিনচালিত নৌযানে পণ্য পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। অন্যদিকে হবিগঞ্জের মাধবপুরে জমিতে কৃষিকাজ করতে গিয়ে বজ্রপাতে প্রাণ হারিয়েছেন লিটন সরকার নামের ৩৫ বছর বয়সী এক যুবক। তিনি উপজেলার নোয়াহাটি সুরমা গ্রামের ঠাকুরধন সরকারের ছেলে।

পুলিশ ও পরিবার সূত্রে জানা গেছে, শিপু মিয়া ইঞ্জিনচালিত নৌযানের মাধ্যমে তাহিরপুর উপজেলার বাগলি শুল্কস্টেশন থেকে দেশের বিভিন্ন এলাকায় কয়লা ও চুনাপাথর পরিবহন করতেন। প্রতিদিনের মতো কাজের প্রয়োজনে বৃহস্পতিবার সকালে তিনি একই গ্রামের প্রতিবেশী ও নৌযানের ইঞ্জিনচালক মোজ্জামিল হকের সঙ্গে বাড়ি থেকে বের হন। বাগলি শুল্কস্টেশন থেকে চুনাপাথর নিয়ে ময়মনসিংহ এলাকার চারঘাটে যাওয়ার উদ্দেশ্যে তারা যাত্রা শুরু করেছিলেন।

পথে মাটিয়ান হাওরের মধ্যে পৌঁছালে হঠাৎ করে বৃষ্টি শুরু হয়। বৃষ্টির সঙ্গে আকস্মিক বজ্রপাত হলে নৌযানের সুকানির দায়িত্বে থাকা শিপু মিয়া গুরুতর আহত হন। নৌযানে থাকা অন্যরা দ্রুত তাঁকে উদ্ধারের চেষ্টা করেন। পরে ইঞ্জিনচালক মোজ্জামিল হক আহত শিপু মিয়াকে তাহিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান।

তবে হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক পরীক্ষা করে শিপু মিয়াকে মৃত ঘোষণা করেন। আকস্মিক এ ঘটনায় তাঁর পরিবার ও স্বজনদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। কাজের উদ্দেশ্যে সকালে বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর আর জীবিত অবস্থায় ফিরে না আসায় স্বজনদের মধ্যে নেমে এসেছে গভীর বেদনা।

তাহিরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফারুক আহমদ জানিয়েছেন, মাটিয়ান হাওরে বজ্রপাতের শিকার হয়ে একজন নৌযান শ্রমিকের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

তাহিরপুরের বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চলে বর্ষা মৌসুমে নৌপথে মানুষের চলাচল ও পণ্য পরিবহন বেড়ে যায়। স্থানীয় শ্রমজীবী মানুষের একটি বড় অংশ জীবিকার প্রয়োজনে নদী, হাওর ও জলাশয়কেন্দ্রিক বিভিন্ন কাজে যুক্ত থাকেন। ফলে হঠাৎ বৃষ্টি ও বজ্রপাতের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় নৌযানে অবস্থানরত শ্রমিকদের ঝুঁকিও বেড়ে যায়। বৃহস্পতিবারের দুর্ঘটনাটি সেই ঝুঁকিরই একটি করুণ উদাহরণ হয়ে উঠেছে।

অন্যদিকে একই সকালে হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলায় কৃষিকাজ করতে গিয়ে বজ্রপাতে প্রাণ হারিয়েছেন লিটন সরকার। উপজেলার নোয়াহাটি পশ্চিম মাঠে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। নিহত লিটন সরকার নোয়াহাটি সুরমা গ্রামের বাসিন্দা এবং ঠাকুরধন সরকারের ছেলে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিনের মতো বৃহস্পতিবার সকালে কৃষিকাজের উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হয়ে মাঠে যান লিটন সরকার। এ সময় আকাশে মেঘ ছিল এবং বৃষ্টির আবহ তৈরি হয়। মাঠে কাজ করার সময় হঠাৎ বজ্রপাত হলে তিনি গুরুতরভাবে আহত হন। বজ্রপাতের আঘাতে ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয় বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

ঘটনার পর আশপাশের লোকজন দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে যান। তাঁকে উদ্ধারের চেষ্টা করা হলেও ততক্ষণে তিনি মারা গেছেন বলে নিশ্চিত হন স্থানীয়রা। পরে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায় এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করে।

মাধবপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সোহেল রানা বজ্রপাতে লিটন সরকারের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, ঘটনাটি সম্পর্কে পুলিশ অবগত হয়েছে এবং দুই নিহতের মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চলছে।

একই দিনে দেশের দুটি হাওর ও কৃষিপ্রধান এলাকায় পৃথক বজ্রপাতের ঘটনায় দুইজনের মৃত্যু স্থানীয় মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষ করে খোলা মাঠ, হাওর ও জলাশয়ে কাজ করা শ্রমজীবী মানুষের জন্য বজ্রপাত বরাবরই একটি বড় প্রাকৃতিক ঝুঁকি। বর্ষা ও বর্ষা-পরবর্তী সময়ে কালো মেঘ, বৃষ্টি ও বজ্রসহ ঝড়ের আশঙ্কা তৈরি হলে এসব এলাকায় কর্মরত মানুষ অনেক সময় কাজ বন্ধ করে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার সুযোগ পান না। জীবিকার তাগিদে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশেও কাজ চালিয়ে যেতে হয় তাঁদের।

শিপু মিয়ার ক্ষেত্রেও কাজের প্রয়োজনে তাঁকে নৌযানে করে পণ্য পরিবহন করতে হচ্ছিল। অন্যদিকে লিটন সরকার মাঠে কৃষিকাজ করতে গিয়ে বজ্রপাতের শিকার হন। দুই ঘটনাই দেখিয়ে দেয়, প্রকৃতির আকস্মিক পরিবর্তনের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত শ্রমজীবী মানুষের নিরাপত্তা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

বজ্রপাত সাধারণত খুব অল্প সময়ের মধ্যে ঘটে এবং অনেক ক্ষেত্রে এর পূর্বাভাস পাওয়ার সুযোগ সীমিত থাকে। খোলা জায়গা, উঁচু স্থান, জলাশয় কিংবা নৌযানে অবস্থানরত মানুষের জন্য এ সময় ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে। বিশেষজ্ঞরা সাধারণত বজ্রপাতের সময় খোলা মাঠ, পানির কাছাকাছি স্থান ও গাছের নিচে অবস্থান না করার পরামর্শ দিয়ে থাকেন। নিরাপদ স্থাপনার ভেতরে আশ্রয় নেওয়া এবং ঝড়-বৃষ্টির সময় অপ্রয়োজনে বাইরে না যাওয়াকে গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

তবে গ্রামাঞ্চলের অনেক শ্রমজীবী মানুষের জন্য বাস্তবে এসব সতর্কতা সবসময় অনুসরণ করা সহজ হয় না। কৃষককে মাঠে থাকতে হয়, নৌযান শ্রমিককে পণ্য পরিবহনের কাজ করতে হয়, আবার অনেক মানুষ জীবিকার প্রয়োজনে নদী-হাওর ও খোলা এলাকায় চলাচল করেন। ফলে বজ্রপাতের ঝুঁকি কমাতে ব্যক্তিগত সতর্কতার পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা এবং দুর্যোগকালীন নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

সুনামগঞ্জের তাহিরপুর ও হবিগঞ্জের মাধবপুরের দুই পরিবারে বৃহস্পতিবার সকালটি শুরু হয়েছিল স্বাভাবিক দিনের মতোই। কাজের উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হওয়া দুই মানুষ যে আর ফিরবেন না, তা স্বজনদের কেউই ভাবতে পারেননি। একজনের কর্মস্থল ছিল হাওরের জলপথ, অন্যজনের ছিল কৃষিজমি। কয়েক মুহূর্তের বজ্রপাতেই থেমে গেছে দুটি জীবন, শোক নেমে এসেছে দুটি পরিবারে।

স্থানীয়দের কাছে এ ধরনের ঘটনা শুধু একটি দুর্ঘটনার খবর নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি পরিবারের আয়-রোজগার, স্বজনদের ভবিষ্যৎ এবং হঠাৎ তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তা। বিশেষ করে কর্মক্ষম বয়সী কোনো মানুষের আকস্মিক মৃত্যু হলে পরিবারের ওপর এর প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। তাই বজ্রপাতের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রাণহানি কমাতে সচেতনতার পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষের জন্য কার্যকর নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।

বৃহস্পতিবারের পৃথক দুই ঘটনায় সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জে যে প্রাণহানি ঘটেছে, তা বর্ষাকালে বজ্রপাতের ঝুঁকি সম্পর্কে নতুন করে সতর্ক হওয়ার প্রয়োজনীয়তাও সামনে এনেছে। আকাশে মেঘ জমা, বজ্রধ্বনি ও ঝড়-বৃষ্টির পরিস্থিতি তৈরি হলে বিশেষ করে হাওর, নদী, খোলা মাঠ ও কৃষিজমিতে থাকা মানুষের দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করা জরুরি। একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে বজ্রপাত সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো এবং ঝুঁকিপূর্ণ সময়ে মানুষের চলাচল ও কাজের বিষয়ে সতর্কতা জোরদার করা প্রয়োজন।

দুই পরিবারের কাছে বৃহস্পতিবারের সকাল তাই হয়ে থাকল এক গভীর শোকের দিন। জীবিকার প্রয়োজনে ঘর থেকে বের হওয়া শিপু মিয়া ও লিটন সরকার আর ফিরলেন না আপনজনদের কাছে। তাঁদের আকস্মিক মৃত্যু আবারও মনে করিয়ে দিল, প্রকৃতির স্বাভাবিক ছন্দের আড়ালেও কখনো কখনো লুকিয়ে থাকে এমন বিপদ, যার আঘাত কয়েক মুহূর্তেই একটি পরিবারের জীবনকে বদলে দিতে পারে।

এই সপ্তাহের খবরাখবর

সর্বজনীন পেনশনে মুনাফা বাড়ল, নমিনির সুবিধাও

প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

শ্রীমঙ্গলে বাড়ির আঙিনায় ১৮ ফুটের অজগর

প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সর্বজনীন পেনশনে বড় পরিবর্তনের প্রস্তাব

প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বাংলাদেশ-ফ্রান্স সম্পর্ক জোরদারে নতুন উদ্যোগ

প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর  ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

হাতিয়ায় বিশাল শাপলা পাতা মাছ বিক্রি ৮২ হাজার টাকায়

প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বিষয়বস্তু

সর্বজনীন পেনশনে মুনাফা বাড়ল, নমিনির সুবিধাও

প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

শ্রীমঙ্গলে বাড়ির আঙিনায় ১৮ ফুটের অজগর

প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সর্বজনীন পেনশনে বড় পরিবর্তনের প্রস্তাব

প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বাংলাদেশ-ফ্রান্স সম্পর্ক জোরদারে নতুন উদ্যোগ

প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর  ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

হাতিয়ায় বিশাল শাপলা পাতা মাছ বিক্রি ৮২ হাজার টাকায়

প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

জাফলংয়ে তরুণী হত্যা মামলায় দুজনের মৃত্যুদণ্ড

প্রকাশ:  ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

হামলার ঘটনায় তিনজনের ছবি প্রকাশ পুলিশের

প্রকাশ: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিলেট নগরীর মিরবক্সটুলায় মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ, ফার্মেসিকে জরিমানা

প্রকাশ:  ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সম্পর্কিত নিবন্ধ

জনপ্র্যিয় পেজ