প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে অংশ নিতে গিয়ে ইতালির মেস্ত্রে শহরে হামলা ও হেনস্তার অভিযোগের পর নতুন করে আলোচনায় এসেছেন অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধন। দেশে ফিরে সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) সকালে বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি দাবি করেছেন, ঘটনার পর তার নিজের সিনেমার টিমের একটি অংশও তার পাশে থাকেনি। বরং উৎসবের পরবর্তী কার্যক্রমে তাদের সঙ্গে অংশ নেওয়া থেকে তাকে বিরত থাকতে বলা হয়েছিল। এমনকি টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবেও যেতে তাকে নিষেধ করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন এই অভিনেত্রী।
বাঁধনের এই বক্তব্য এমন সময়ে সামনে এলো, যখন রুবাইয়াত হোসেন পরিচালিত ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ চলচ্চিত্র উৎসবে জায়গা করে নিচ্ছে। সিনেমাটি ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের ৮৩তম আসরের অরিজোন্তি প্রতিযোগিতা বিভাগে নির্বাচিত হয়েছে। উৎসবের আনুষ্ঠানিক তথ্য অনুযায়ী, ছবিটির প্রদর্শনী হয়েছে ৬ ও ৭ সেপ্টেম্বরসহ নির্ধারিত কয়েকটি আয়োজনে। ছবিতে বাঁধনের পাশাপাশি অভিনয় করেছেন জাইনিন চৌধুরী করিম, রিকিতা নন্দিনী শিমু, সুনেরাহ বিনতে কামালসহ অন্যরা।
ভেনিসে সিনেমাটির আন্তর্জাতিক যাত্রা নিয়ে যখন বাংলাদেশি চলচ্চিত্রাঙ্গনে আগ্রহ তৈরি হয়েছে, ঠিক সেই সময়ই মেস্ত্রে শহরের একটি ঘটনায় পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে মোড় নেয়। বাঁধনের অভিযোগ, কয়েকজন বাংলাদেশি তাকে রাজনৈতিক পরিচয় ও কর্মকাণ্ডের কারণে লক্ষ্য করে হেনস্তা করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও নিয়েও ব্যাপক আলোচনা হয়। ইতালির সংবাদ সংস্থা আনসা জানিয়েছে, মেস্ত্রেতে অভিনেত্রীকে কয়েকজন বাংলাদেশি নাগরিক ঘিরে হেনস্তা করেন এবং তাকে ‘জুলাই যোদ্ধা’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।
বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঘটনার পর বাঁধন ইতালিতে পুলিশের কাছে অভিযোগ করেন। তিনি কয়েকজন বাংলাদেশি নাগরিককে ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ করেন এবং ঘটনার ভিডিওসহ প্রয়োজনীয় তথ্য পুলিশকে দেন। বাংলাদেশ দূতাবাস ও মিলানে বাংলাদেশের কনস্যুলেট থেকেও তাকে কনস্যুলার ও আইনি সহায়তা দেওয়া হয় বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল।
ঘটনাটি বাংলাদেশের জাতীয় সংসদেও আলোচনায় আসে। ৮ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির জানান, বাঁধনের ওপর হামলার বিষয়টি ইতালীয় কর্তৃপক্ষের কাছে গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরা হয়েছে এবং বাংলাদেশ দূতাবাস প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে। তিনি ঘটনাটিকে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ওপর আঘাত হিসেবেও উল্লেখ করেন। একই দিনে সংসদে ঘটনাটির প্রতিবাদ জানানো হয় এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগের বিষয়েও জানতে চাওয়া হয়।
ইতালির পক্ষ থেকেও ঘটনাটির নিন্দা জানানো হয়েছে। ভেনেতো অঞ্চলের প্রেসিডেন্ট আলবের্তো স্তেফানি বাঁধনের প্রতি সংহতি প্রকাশ করে বলেন, কারও রাজনৈতিক মত, নাগরিক অবস্থান বা কর্মকাণ্ডের কারণে তাকে আক্রমণ, অপমান বা ভয় দেখানো গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি ঘটনার পূর্ণ তদন্ত করে দায়ীদের শনাক্ত করার প্রত্যাশাও জানান।
তবে হামলার অভিযোগের পাশাপাশি এখন যে বিষয়টি বেশি আলোচনায় এসেছে, তা হলো ঘটনার পর বাঁধনের সঙ্গে তার সিনেমার টিমের সম্পর্কের অবস্থান। দেশে ফেরার পর সাংবাদিকদের তিনি বলেন, তার টিম তাকে ‘ডিজওন’ করেছে। উৎসবের বাকি দিনগুলোতে তাদের সঙ্গে অংশ নিতে তাকে নিষেধ করা হয়েছিল বলেও দাবি করেন তিনি। একইভাবে টরন্টো চলচ্চিত্র উৎসবে যাওয়ার ক্ষেত্রেও বাধার মুখে পড়েছেন বলে জানান অভিনেত্রী।
তবে বাঁধনের এই অভিযোগের বিষয়ে সিনেমাটির নির্মাতা বা প্রযোজনা দলের পক্ষ থেকে একই সময়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া গেছে কি না, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। ফলে বিষয়টি আপাতত অভিনেত্রীর বক্তব্য হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে। সংবাদমাধ্যমের দায়িত্বশীলতার জায়গা থেকে অভিযোগ এবং তার সত্যতা—দুটিকে আলাদা করে দেখা জরুরি।
এদিকে ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’-এর টরন্টো যাত্রার বিষয়টি অবশ্য আগে থেকেই আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়েছিল। টরন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের ২০২৬ সালের আয়োজনের জন্য সিনেমাটি নির্বাচিত হয়েছে এবং নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী সেপ্টেম্বরের ১৬, ১৭ ও ১৯ তারিখে ছবিটির প্রদর্শনী হওয়ার কথা রয়েছে। ফলে বাঁধনের বক্তব্যে যে ‘টরন্টোতে যেতে নিষেধাজ্ঞা’র কথা এসেছে, সেটি তার ব্যক্তিগত অংশগ্রহণকে ঘিরে অভিযোগ—সিনেমাটির উৎসবের আনুষ্ঠানিক নির্বাচন বাতিল হয়েছে, এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
এই পরিস্থিতিতে বাঁধনের বক্তব্যের আরেকটি মানবিক দিকও সামনে এসেছে। তিনি জানিয়েছেন, তার সহকর্মীদের মধ্যে সুনেরাহ, জাইনিন এবং জাইনিনের মা তাকে সহযোগিতা করেছেন। অর্থাৎ পুরো টিম তার কাছ থেকে সরে গেছে—এমন সরল চিত্রের বদলে, তার নিজের বক্তব্যেই দেখা যায় যে টিমের কিছু সদস্য ব্যক্তিগতভাবে তার পাশে ছিলেন।
ভেনিসে হামলার পর রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায় থেকে পাওয়া সহযোগিতার কথাও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেছেন বাঁধন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবের পরিচালক, ইতালি সরকার, বাংলাদেশের সরকার এবং ইতালিতে বাংলাদেশের দূতাবাস তাকে সহযোগিতা করেছে। ঘটনার রাতেই সরকারি পর্যায় থেকে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে উৎসব কর্তৃপক্ষ তার থাকার ব্যবস্থাতেও পরিবর্তন আনে বলে জানান তিনি।
বাঁধনের এই বক্তব্যের মধ্যে যেমন আঘাতের অভিজ্ঞতা রয়েছে, তেমনি রয়েছে পাশে দাঁড়ানো মানুষদের প্রতি কৃতজ্ঞতাও। দেশে ফিরে তিনি দেশবাসী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সমর্থনের জন্য কৃতজ্ঞতা জানান। রাজনৈতিক মতাদর্শের পার্থক্য ভুলে যারা তার পাশে দাঁড়িয়েছেন, তাদের এই সমর্থন তিনি মনে রাখবেন বলেও উল্লেখ করেন।
একজন অভিনয়শিল্পীর জন্য আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের মঞ্চে নিজের দেশের প্রতিনিধিত্ব করা যেমন বড় অর্জন, তেমনি সেই সফরেই রাজনৈতিক মতপার্থক্যকে কেন্দ্র করে হেনস্তার অভিযোগ নিঃসন্দেহে উদ্বেগের বিষয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, এ ধরনের ঘটনায় শিল্পী, সহকর্মী, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি হয়। একই সঙ্গে কোনো অভিযোগের বিচার বা দায় নির্ধারণের ক্ষেত্রে তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ার ওপর আস্থা রাখাও জরুরি।
‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ ইতোমধ্যে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক অর্জনের স্বাক্ষর রেখেছে। ভেনিসের পর টরন্টোতেও ছবিটির প্রদর্শনী নির্ধারিত হওয়ায় সিনেমাটিকে ঘিরে আন্তর্জাতিক আগ্রহ অব্যাহত রয়েছে।
এখন বাঁধনের অভিযোগ, ইতালির ঘটনার তদন্ত এবং তার সিনেমার আন্তর্জাতিক যাত্রা—এই তিনটি বিষয়ই আলাদাভাবে সামনে থাকবে। একদিকে হামলার অভিযোগের আইনি নিষ্পত্তির অপেক্ষা, অন্যদিকে নিজের টিমের কাছ থেকে প্রত্যাশিত সমর্থন না পাওয়ার দাবি—সব মিলিয়ে ভেনিস সফরটি বাঁধনের ক্যারিয়ারের একটি সাফল্যময় অধ্যায়ের পাশাপাশি ব্যক্তিগতভাবে কঠিন এক অভিজ্ঞতাও হয়ে উঠেছে।


