প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের কয়েক মাসের মধ্যেই মন্ত্রিসভায় আরও বড় পরিসরে পুনর্বণ্টন ও রদবদলের আলোচনা সামনে এসেছে। বিশেষ করে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে জোর আলোচনা চলছে। একই সঙ্গে মন্ত্রিসভার কলেবর বাড়িয়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে নতুন প্রতিমন্ত্রী যুক্ত করার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
বর্তমানে সরকারের মন্ত্রিসভায় ৪৯ জন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী শপথ নিয়েছেন। তাঁদের মধ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে আ ন ম এহছানুল হক মিলন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এম এ মুহিত। সরকারি দায়িত্ব বণ্টনের প্রকাশিত তথ্যেও এসব পদে তাঁদের নাম রয়েছে।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে মন্ত্রিসভার কয়েকটি দপ্তরের কার্যক্রম, মন্ত্রীদের বক্তব্য এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা তৈরি হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় সরকারের কার্যক্রম আরও গতিশীল করা, জনমনে আস্থা বাড়ানো এবং মন্ত্রীদের কর্মদক্ষতার মূল্যায়নের ভিত্তিতে দায়িত্ব পুনর্বণ্টনের উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে বলে সূত্রের দাবি।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে সম্ভাব্য রদবদলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে দেখা হচ্ছে। সূত্রের দাবি, বর্তমান স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুলকে সরিয়ে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিতকে পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। স্বাস্থ্য খাতে অভিজ্ঞতা, প্রশাসনিক কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ততা এবং তুলনামূলক সংযত বক্তব্যের কারণে মুহিতকে নিয়ে সরকারের ভেতরে ইতিবাচক আলোচনা রয়েছে বলে জানা গেছে।
তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত বা প্রজ্ঞাপন জারি হয়নি। ফলে সম্ভাব্য রদবদলের খবরকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে ঘিরে সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড নিয়ে যে সমালোচনা তৈরি হয়েছে, তা-ও সম্ভাব্য পরিবর্তনের আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে বলে সূত্রের দাবি। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শিশু মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে মন্ত্রীর বক্তব্য, চিকিৎসকদের আচরণ সম্পর্কে মন্তব্য এবং হাসপাতাল পরিদর্শনের সময় বিভিন্ন কর্মকাণ্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার জন্ম দেয়। স্বাস্থ্য খাতের একটি অংশ এসব ঘটনায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছে বলেও বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজের একটি অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের সময় প্রধানমন্ত্রী তাঁকে থামিয়ে দেন—এমন ঘটনাও রাজনৈতিক মহলে আলোচিত হয়েছে। এ ছাড়া নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় একটি বেসরকারি হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল ও পরে পুনর্বহালকে কেন্দ্র করে স্বাস্থ্য প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয়ের প্রশ্ন উঠেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কেনাকাটা ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনা নিয়েও বিভিন্ন অভিযোগ ও আলোচনা রয়েছে। কিডনি হাসপাতালের ডায়ালাইসিস মেশিন কেনা এবং ঔষধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে মন্ত্রণালয়ের ভেতরে প্রশ্ন উঠেছে বলে জানা গেছে। অতীতের একটি ঠিকাদার চক্রের সঙ্গে বর্তমান মন্ত্রণালয়ের কারও যোগাযোগের অভিযোগও আলোচনায় এসেছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা নিশ্চিত করা যায়নি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ও সম্ভাব্য রদবদলের আলোচনায় রয়েছে। বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের বিরুদ্ধে নেতাকর্মীদের সঙ্গে আচরণ, যোগাযোগের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা এবং কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে সমালোচনা রয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে। বিশেষ করে দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে পরীক্ষা আয়োজনসহ কয়েকটি বিষয়ে সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রশ্ন উঠেছে।
তাঁর সম্ভাব্য বিকল্প হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের উপদেষ্টা মাহাদী আমিন এবং শিক্ষক নেতা অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়ার নাম আলোচনায় রয়েছে বলে সূত্রের দাবি। তবে মাহাদী আমিন বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের উপদেষ্টা হিসেবে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমে যুক্ত আছেন এবং সম্প্রতি শিক্ষা ও কারিগরি সহযোগিতা সংক্রান্ত বিভিন্ন সরকারি অনুষ্ঠানে তাঁর অংশগ্রহণের তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে।
এদিকে মন্ত্রিসভার সম্ভাব্য পরিবর্তনের সঙ্গে নতুন মুখ যুক্ত করার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। টেকনোক্র্যাট কোটায় আরও কাউকে মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করার আলোচনা রয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে। এ ক্ষেত্রে মুশফিকুল ফজল আনসারীর নাম আলোচনায় থাকার কথা বলা হলেও তাঁর নিয়োগের বিষয়ে কোনো সরকারি ঘোষণা এখনো আসেনি।
এর আগে সরকার গঠনের সময় মন্ত্রিসভায় অভিজ্ঞ রাজনীতিকদের পাশাপাশি বেশ কয়েকজন নতুন মুখ স্থান পেয়েছিলেন। প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা যায়, পূর্ণমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী মিলিয়ে ৪৯ জন শপথ নেন। তাঁদের মধ্যে এম এ মুহিতসহ ২৪ জন প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পান।
সম্ভাব্য সম্প্রসারণে স্বরাষ্ট্র, কৃষি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে নতুন প্রতিমন্ত্রী নিয়োগের বিষয়েও আলোচনা রয়েছে। সরকারের অভ্যন্তরে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক কর্মী, অভিজ্ঞ নেতা এবং বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করা ব্যক্তিদের মূল্যায়ন করা হচ্ছে বলে সূত্রের দাবি।
সম্ভাব্য তালিকায় বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতার নাম ঘুরে বেড়ালেও তাঁদের প্রত্যেকের মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত নয়। রাজনৈতিক মহলে গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, জয়নুল আবদিন ফারুক, শামসুজ্জামান দুদু, মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, হাবিব উন নবী খান সোহেল, আমান উল্লাহ আমান এবং রুহুল কবির রিজভীসহ আরও কয়েকজনের নাম আলোচনায় রয়েছে বলে সূত্রের দাবি। একইভাবে রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, এ বি এম আশরাফ উদ্দীন নিজান, এ বি এম মোশাররফ হোসেন, মজিবুর রহমান ও মাহমুদা হাবিবার নামও সম্ভাব্য তালিকায় রয়েছে বলে জানা গেছে।
তবে মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ভারসাম্য, প্রশাসনিক প্রয়োজন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির যোগ্যতা এবং সরকারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাই শেষ পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। ফলে আলোচনায় থাকা নামগুলোর কোনোটি চূড়ান্ত তালিকা হিসেবে বিবেচনা করা ঠিক হবে না।
অন্যদিকে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় ঘিরেও সাম্প্রতিক একটি ঘটনা আলোচনায় এসেছে। মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা এম রশিদুজ্জামান মিল্লাতের গাড়ি রাজধানীর একটি সড়কে উল্টোপথে চলার ঘটনায় ট্রাফিক পুলিশের মামলা করার কথা বলা হয়েছে। ঘটনাটি নিয়ে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে বলেও সূত্রের দাবি। তবে এ ঘটনার পর মন্ত্রীর দায়িত্ব পরিবর্তনের বিষয়ে কোনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সূত্রগুলোর দাবি, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কাজের অগ্রগতি, সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সক্ষমতা এবং জনমতের প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। সরকারের প্রথম দফার সীমিত পরিবর্তনের পর এবার আরও কাঠামোগতভাবে দায়িত্ব পুনর্বণ্টনের বিষয়টি বিবেচনা করা হতে পারে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, নতুন সরকারের জন্য মন্ত্রিসভার দক্ষতা ও সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, আইনশৃঙ্খলা, কৃষি ও অর্থনীতির মতো জনজীবনের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত মন্ত্রণালয়ে নেতৃত্বের স্থিতিশীলতা সরকারের গ্রহণযোগ্যতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে সম্ভাব্য রদবদল শুধু ব্যক্তিগত পদ পরিবর্তনের বিষয় নয়, সরকারের নীতিগত অগ্রাধিকারও প্রকাশ করতে পারে।
তবে এখন পর্যন্ত মন্ত্রিসভার বড় ধরনের পুনর্বণ্টন নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা দেওয়া হয়নি। তাই আলোচনায় থাকা সম্ভাব্য পরিবর্তনগুলোকে আপাতত রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলের সম্ভাব্য হিসেবেই দেখা হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত কার দায়িত্ব পরিবর্তন হবে, কে নতুন করে মন্ত্রিসভায় যুক্ত হবেন এবং কোন মন্ত্রণালয়ে নতুন নেতৃত্ব আসবে—তা প্রধানমন্ত্রীর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও পরবর্তী সরকারি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমেই নিশ্চিত হবে।


