সাগর-রুনি হত্যা: ১৩ বছর ধরে কারাগারে এনাম

প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।

মুঠোফোনের পর্দায় ছেলের খবর পড়তে পড়তে চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি ফাতেমা বেগম। দীর্ঘদিন কারাগারে থাকা ছেলে এনাম আহমেদ ওরফে হুমায়ুন কবীর, পরিবারের কাছে এনামুল—মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন, এমন খবরই সম্প্রতি জানতে পেরেছেন তিনি। একসময় যে ছেলে পরিবারের স্বচ্ছলতা ফেরাতে ঢাকায় নিরাপত্তাপ্রহরীর চাকরি নিয়েছিলেন, সেই ছেলের জীবনের সাড়ে ১৩ বছর কেটে গেছে কারাগারের চার দেয়ালের মধ্যে।

ফাতেমা বেগমের কাছে সময় যেন থেমে আছে। এক দিন, দুই দিন নয়—প্রায় সাড়ে ১৩ বছর ধরে তিনি অপেক্ষা করছেন ছেলের জন্য। এর মধ্যে পরিবারে এসেছে একের পর এক বিপর্যয়। স্বামী কালা মিয়ার মৃত্যু, দীর্ঘদিনের আর্থিক সংকট এবং ছেলের কারাবাস—সব মিলিয়ে বড়লেখার এই পরিবারটি এখন প্রায় নিঃস্ব।

সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যা মামলায় সন্দেহভাজন হিসেবে ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে এনামুলকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি তখন ওই ভবনের নিরাপত্তাপ্রহরী হিসেবে কাজ করতেন। গ্রেপ্তারের পর থেকে এখনো কারাগারে রয়েছেন তিনি।

এনামুলের পরিবারের দাবি, তাঁর বিরুদ্ধে দীর্ঘ তদন্ত চললেও হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সম্প্রতি পিবিআইয়ের একটি তদন্ত প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে এমন তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে যে, তদন্তে এখন পর্যন্ত এনাম আহমেদের বিরুদ্ধে সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

এ অবস্থায় এনামুলের পরিবারের পক্ষ থেকে তাঁর মুক্তি ও চিকিৎসার দাবি উঠেছে। একই দাবি জানিয়েছেন নিহত সাংবাদিক মেহেরুন রুনির ভাই নওশের আলমও। তাঁর মতে, হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উদঘাটন করে জড়িতদের শনাক্ত ও বিচার করা প্রয়োজন; তবে নিরপরাধ কাউকে দীর্ঘদিন হয়রানির মধ্যে রাখা উচিত নয়।

এনামুল আহমেদ মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার দক্ষিণভাগ দক্ষিণ ইউনিয়নের পূর্ব-দক্ষিণভাগ গ্রামের মৃত মকবুল আলী ওরফে কালা মিয়ার ছেলে। তাঁর পরিবারের ভাষ্য, ঢাকায় চাকরি করে পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিলেন এনামুল। কিন্তু গ্রেপ্তারের পর তাঁর জীবন সম্পূর্ণ বদলে যায়।

এর আগে এনামুলের বাবা কালা মিয়াকে র‌্যাব পরিচয়ে তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও করে আসছে পরিবারটি। ফাতেমা বেগম জানান, আনুমানিক ২০১২ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর দক্ষিণভাগ বাজারে নিজের ফার্নিচারের দোকানে যাওয়ার পথে তাঁর স্বামী নিখোঁজ হন। পরিবারের দাবি, কয়েকজন ব্যক্তি র‌্যাব পরিচয়ে তাঁকে গাড়িতে তুলে নিয়ে যায়।

ফাতেমার ভাষ্য অনুযায়ী, কালা মিয়া পরে পরিবারের কাছে জানিয়েছিলেন, গাড়িতে তোলার পর তাঁর চোখ বেঁধে একটি অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানে তাঁকে নির্যাতন ও বৈদ্যুতিক শক দেওয়া হয়েছিল। নিখোঁজ হওয়ার পর স্বামীর কোনো সন্ধান না পেয়ে ফাতেমা বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজি করেন। আত্মীয়স্বজন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছেও যোগাযোগ করেন তিনি।

একপর্যায়ে কালা মিয়ার মুঠোফোন থেকেই পরিবারের কাছে একটি ফোন আসে। তিনি এনামুলের বিষয়ে জানতে চেয়েছিলেন বলে জানান ফাতেমা। এরপর প্রায় ২১ দিন পর তাঁকে ভৈরবের কাছে ফেলে যাওয়ার কথা পরিবারকে জানান তিনি। গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় স্থানীয় লোকজন তাঁকে সিলেটগামী একটি বাসে তুলে দেন। পরে পরিবারের সদস্যরা সিলেটের কদমতলী বাসস্ট্যান্ড থেকে তাঁকে বাড়িতে নিয়ে যান।

ফাতেমার দাবি, ওই ঘটনার পর তাঁর স্বামী আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি। শারীরিক অসুস্থতার পাশাপাশি তিনি মানসিকভাবেও ভেঙে পড়েছিলেন। ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং চিকিৎসার পেছনে পরিবারের বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় হয়। চলতি বছরের ৩ ফেব্রুয়ারি কালা মিয়া মারা যান। স্বামীর মৃত্যুর পরও ফাতেমার কষ্ট শেষ হয়নি; কারণ তাঁর ছেলে এনামুল তখনো কারাগারে।

ফাতেমা বলেন, ছেলের বিরুদ্ধে যদি অপরাধের প্রমাণ থাকে, তাহলে তিনি বিচার চান। কিন্তু তাঁর বিশ্বাস, সাগর-রুনি হত্যার সঙ্গে তাঁর ছেলে জড়িত নন। দীর্ঘদিন ধরে কারাগারে থাকার কারণে পরিবারটি সামাজিক ও আর্থিকভাবে যে ক্ষতির মুখে পড়েছে, তার অবসান চান তিনি।

পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, আর্থিক সংকট ও ভয়-ভীতির কারণে এনামুলের মামলা যথাযথভাবে পরিচালনার জন্য নিয়মিত আইনগত সহায়তাও নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। এনামুলের বড় ভাই শাহিন আহমদ জানান, ভাই গ্রেপ্তারের পর তাঁদের পরিবার আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটিয়েছে। অর্থের অভাবও ছিল। ফলে মামলা চালানোর মতো পরিস্থিতি তাঁদের ছিল না।

শাহিনের অভিযোগ, তাঁদের বাবা নিখোঁজ হওয়ার পর যে পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেছেন, তার প্রভাব পুরো পরিবারের ওপর পড়েছিল। তিনি বলেন, এনামুল যদি নির্দোষ হয়ে থাকেন, তাহলে তাঁকে দ্রুত মুক্তি দিয়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা করা উচিত।

সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের তদন্তের ইতিহাসও দীর্ঘ ও জটিল। ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাতে রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের একটি বাসা থেকে সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। সাগর মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক এবং রুনি এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

রুনির ভাই নওশের আলম বাদী হয়ে শেরেবাংলা নগর থানায় হত্যা মামলা করেন। প্রথমে থানা-পুলিশ মামলাটি তদন্ত করে। পরে তদন্তভার ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগে দেওয়া হয়। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে তদন্তে অগ্রগতি না হওয়ায় পরবর্তী সময়ে মামলাটির তদন্তভার র‌্যাবের কাছে যায়।

দীর্ঘ সময় তদন্তের পরও র‌্যাব প্রতিবেদন দিতে পারেনি। বিভিন্ন সময়ে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের সময় বাড়ানো হয়। একপর্যায়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে মামলাটি তদন্তে টাস্কফোর্স গঠন করা হয়। বর্তমানে হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী পুলিশের অপরাধ তদন্ত সংস্থা পিবিআইয়ের একটি টাস্কফোর্স মামলাটি তদন্ত করছে।

এনামুলকে ওই ভবনের নিরাপত্তাপ্রহরী হিসেবে কাজ করার সূত্র ধরে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। এরপর কেটে গেছে প্রায় সাড়ে ১৩ বছর। কিন্তু সম্প্রতি প্রকাশিত পিবিআইয়ের তদন্ত প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে জানা যায়, তদন্তে এখন পর্যন্ত তাঁর বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

প্রতিবেদনে এনামুলের বর্তমান মানসিক অবস্থার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। আদালতের আদেশ অনুযায়ী গত ২২ এপ্রিল কাশিমপুর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে তাঁকে পুনরায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তদন্ত কর্মকর্তাদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, জিজ্ঞাসাবাদের সময় তিনি অনেক প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট উত্তর দিতে পারেননি। অনেক বিষয় মনে করতে পারছিলেন না এবং তাঁর বক্তব্য ছিল এলোমেলো।

কারা কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন কারাবন্দী থাকার কারণে এনামুল বর্তমানে মানসিক ভারসাম্যহীনতায় ভুগছেন। তাঁকে সাধারণ বন্দীদের থেকে আলাদা একটি ওয়ার্ডে রাখা হয়েছে এবং প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তাঁর দ্রুত উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এনামুলের পরিবারের জন্য সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো, একজন সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার হওয়ার পর তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি সময় কারাগারে কেটে গেছে। অন্যদিকে মামলার তদন্ত এখনো শেষ হয়নি এবং হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্যও পুরোপুরি উন্মোচিত হয়নি। ফলে এনামুলের পরিবারের প্রশ্ন, যদি তাঁর বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার প্রমাণ না থাকে, তাহলে এত দীর্ঘ সময় তিনি কেন কারাগারে থাকবেন।

নিহত সাংবাদিক দম্পতির পরিবারের পক্ষ থেকেও নিরপরাধ কাউকে হয়রানি না করার আহ্বান এসেছে। মেহেরুন রুনির ভাই নওশের আলম জানিয়েছেন, তিনি এনামুলকে জামিন দিয়ে মুক্তি দেওয়ার পাশাপাশি তাঁর চিকিৎসার ব্যবস্থা করার পক্ষে। একই সঙ্গে তিনি চান, সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করে সুস্পষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতে বিচার নিশ্চিত করা হোক।

একটি হত্যাকাণ্ডের বিচারহীনতা যেমন নিহতদের পরিবারের জন্য দীর্ঘস্থায়ী যন্ত্রণা তৈরি করে, তেমনি কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি যদি দীর্ঘদিন সন্দেহের বোঝা নিয়ে কারাগারে থাকেন, সেটিও মানবিক ও ন্যায়বিচারের প্রশ্ন সামনে আনে। সাগর-রুনি হত্যার দীর্ঘ তদন্তের পাশাপাশি এনামুল আহমেদের বর্তমান অবস্থাও সেই প্রশ্নকে আরও গভীর করেছে।

ফাতেমা বেগমের চাওয়া খুবই সরল—ছেলে নির্দোষ হলে তাকে মুক্তি দেওয়া হোক, আর যদি কোনো অপরাধের প্রমাণ থাকে তাহলে আইন অনুযায়ী বিচার হোক। বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে করতে স্বামীকে হারিয়েছেন তিনি। এখন ছেলেকে ঘিরে তাঁর শেষ প্রত্যাশা, আইনের যথাযথ প্রক্রিয়ায় সত্য উদঘাটিত হবে এবং তাঁর পরিবারের ওপর দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তার অবসান ঘটবে।

এই সপ্তাহের খবরাখবর

ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে আরও ৫০ মামলা বিচারাধীন

প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

হবিগঞ্জে কোটি টাকার ভারতীয় চোরাচালান জব্দ

প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

মন্ত্রিসভায় বড় রদবদলের আভাস, স্বাস্থ্য-শিক্ষায় পরিবর্তন

প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

ইন্দোনেশিয়ায় ৬.৬ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প

প্রকাশ:  ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

গুলশানে আওয়ামী লীগের মিছিল: গ্রেপ্তার ৩২

প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বিষয়বস্তু

ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে আরও ৫০ মামলা বিচারাধীন

প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

হবিগঞ্জে কোটি টাকার ভারতীয় চোরাচালান জব্দ

প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

মন্ত্রিসভায় বড় রদবদলের আভাস, স্বাস্থ্য-শিক্ষায় পরিবর্তন

প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

ইন্দোনেশিয়ায় ৬.৬ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প

প্রকাশ:  ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

গুলশানে আওয়ামী লীগের মিছিল: গ্রেপ্তার ৩২

প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

ব্রিকসে পাকিস্তানের প্রবেশে ভারতের আপত্তি

প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

টাঙ্গুয়ার হাওরে হৃদরোগে পর্যটকের মৃত্যু

প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক ।...

ছাত্র উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে শতকোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ নুরের

প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সম্পর্কিত নিবন্ধ

জনপ্র্যিয় পেজ