সিলেটের মাদ্রাসায় আরও শিশুকে নির্যাতনের অভিযোগ

প্রকাশ:১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।

সিলেট সদর উপজেলার পীরেরবাজার এলাকায় একটি মাদ্রাসার শিক্ষককে দুই শিশুকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগে গ্রেপ্তারের পর নতুন করে আরও কয়েকজন শিক্ষার্থী একই ধরনের নির্যাতনের শিকার হওয়ার অভিযোগ সামনে এসেছে। অভিভাবকদের দাবি, মাদ্রাসাটিতে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অনৈতিক আচরণের ঘটনা ঘটলেও অনেক শিশু ভয় ও হুমকির কারণে বিষয়টি কাউকে জানাতে পারেনি।

ঘটনার পর থেকে জামেয়া তাহফিজুল কোরআন মাদ্রাসাটি কার্যত বন্ধ রয়েছে। মাদ্রাসার গেটে তালা ঝুলছে এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের কাউকেই সেখানে পাওয়া যাচ্ছে না। এদিকে গ্রেপ্তার মাদ্রাসার মুহতামিম ফয়জুল হকের বিরুদ্ধে করা মামলার তদন্তে অভিযোগের সঙ্গে আর কেউ জড়িত কি না, সেটিও খতিয়ে দেখছে পুলিশ।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, সম্প্রতি ওই মাদ্রাসার হিফজ শাখার ৮ থেকে ১০ বছর বয়সী দুই শিশু বাড়িতে ফিরে যাওয়ার পর আর মাদ্রাসায় যেতে অস্বীকৃতি জানায়। অভিভাবকেরা নানা উপায়ে তাদের ফের মাদ্রাসায় পাঠানোর চেষ্টা করলেও শিশুরা রাজি হয়নি। একপর্যায়ে তারা অভিভাবকদের কাছে মাদ্রাসায় থাকাকালে তাদের সঙ্গে কী ঘটেছে, তা জানায়।

অভিভাবকদের অভিযোগ, শিশুদের নিয়মিতভাবে ভয় দেখানো হতো এবং বিষয়টি অন্য কারও কাছে প্রকাশ না করার জন্য চাপ দেওয়া হতো। শিশুদের বক্তব্যের পর বিষয়টি পরিবারের সদস্যদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করে। পরে তারা মাদ্রাসায় গিয়ে অন্য শিক্ষার্থীদের সঙ্গেও কথা বলেন। তখন আরও কয়েকজন শিক্ষার্থী একই ধরনের নির্যাতনের অভিযোগ করেছে বলে দাবি করেছেন অভিভাবকেরা।

এক নির্যাতিত শিশুর বাবা জানান, কয়েক দিন আগে মাদ্রাসার এক শিশুর শারীরিক অসুস্থতা দেখা দিলে বিষয়টি নিয়ে পরিবারের সদস্যদের খবর দেওয়া হয়। পরে চিকিৎসকের কাছে নেওয়ার পর শিশুটির শরীরে আঘাতের চিহ্নের বিষয়টি সামনে আসে। এর পর থেকেই পরিবারের সন্দেহ বাড়তে থাকে।

তিনি জানান, মাদ্রাসা থেকে ছুটির পর তার সন্তান সেখানে ফিরে যেতে চাইছিল না। সন্তানকে জিজ্ঞাসাবাদ করেও প্রথমে কোনো তথ্য পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে ভয় ও মানসিক চাপের মধ্যে শিশুটি নির্যাতনের কথা জানায়। এরপর কয়েকজন অভিভাবক একসঙ্গে মাদ্রাসায় গিয়ে অন্য শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বললে আরও অভিযোগ সামনে আসে বলে দাবি করেন তিনি।

অভিভাবকদের ভাষ্য অনুযায়ী, শিক্ষার্থীদের মধ্যে কয়েকজন জানিয়েছে, রাতে তাদের একজন বা দুজনকে শিক্ষকের কক্ষে ডেকে নেওয়া হতো। সেখানে তাদের সঙ্গে অনৈতিক আচরণ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব ঘটনা প্রকাশ করলে শাস্তি বা অন্য ধরনের ক্ষতির ভয় দেখানো হতো বলেও অভিযোগ করেছেন অভিভাবকেরা।

ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। পীরেরবাজার এলাকার এক বাসিন্দার দাবি, এর আগেও ওই মাদ্রাসার শিক্ষককে ঘিরে শিশুদের সঙ্গে অনৈতিক আচরণের অভিযোগ শোনা গিয়েছিল। এবার নতুন করে অভিযোগ সামনে আসায় স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। মাদ্রাসাটিতে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি চালু না করার দাবিও জানিয়েছেন কেউ কেউ।

এর আগে দুই শিশুকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগে মাদ্রাসার মুহতামিম ফয়জুল হককে আটক করে শাহপরান (রহ.) থানার পুলিশ। পরে তাকে মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়। পুলিশ জানিয়েছে, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে অভিযুক্ত ব্যক্তি অভিযোগের বিষয়ে স্বীকারোক্তিমূলক বক্তব্য দিয়েছেন। তবে আদালতে তার বক্তব্যের পূর্ণাঙ্গ আইনি মূল্যায়ন এবং মামলার পরবর্তী বিচারিক প্রক্রিয়া সংশ্লিষ্ট আদালতের বিষয়।

সিলেট মহানগর পুলিশ কমিশনার সারোয়ার মুর্শেদ শামীম জানিয়েছেন, গ্রেপ্তার মাদ্রাসা শিক্ষকের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের অন্য কোনো শিক্ষক বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এ ধরনের ঘটনায় জড়িত কি না, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। তদন্তে প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ এবং অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করা হবে বলে পুলিশ জানিয়েছে।

শাহপরান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. ফেরদৌস আহমদ জানিয়েছেন, অভিযোগের প্রাথমিক পর্যায়ে ৮ থেকে ১০ বছর বয়সী দুই শিশুর পরিবারের কাছ থেকে তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, শিশুরা মাদ্রাসায় থাকতে ভয় পাচ্ছিল এবং বাড়ি ফিরে যাওয়ার পর আর সেখানে যেতে চাইছিল না। পরে পরিবারের সদস্যদের কাছে তারা নির্যাতনের অভিযোগ করে।

শিশুদের এমন আচরণ ও বক্তব্যকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন অভিভাবকেরা। কারণ, অনেক শিশু ভয়, লজ্জা, মানসিক চাপ কিংবা অভিযুক্ত ব্যক্তির হুমকির কারণে নির্যাতনের ঘটনা তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশ করতে পারে না। ফলে একটি অভিযোগ সামনে আসার পর একই প্রতিষ্ঠানে থাকা অন্য শিশুদের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।

শিশু অধিকারকর্মীদের দৃষ্টিতে, আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব আরও বেশি। সেখানে শিক্ষার্থীরা দিনের বড় একটি সময় শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠানের তত্ত্বাবধানে থাকে। বিশেষ করে ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে অভিভাবকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ, নিরাপদ অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা এবং শিক্ষকদের আচরণ পর্যবেক্ষণের মতো বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ। কোনো শিশু অস্বাভাবিক আচরণ করলে বা হঠাৎ প্রতিষ্ঠানে যেতে অস্বীকৃতি জানালে সেটিকে গুরুত্ব দিয়ে কারণ অনুসন্ধান করাও প্রয়োজন।

সিলেটের এই ঘটনায় সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, অভিযোগের পরিধি কেবল দুই শিশুর মধ্যে সীমাবদ্ধ কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। আরও শিক্ষার্থী একই ধরনের অভিযোগ করেছে বলে অভিভাবকেরা দাবি করলেও তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এসব অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়। তাই অভিযোগগুলো যথাযথভাবে যাচাই করে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করা জরুরি।

একই সঙ্গে তদন্ত চলাকালে মাদ্রাসার অন্যান্য শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও মানসিক সুস্থতার বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। যেসব শিশু ঘটনাগুলোর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে, তাদের সঙ্গে সংবেদনশীল ও শিশুবান্ধব পদ্ধতিতে কথা বলা জরুরি। তাদের পরিচয় প্রকাশ না করে প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ও মানসিক সহায়তা নিশ্চিত করাও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

অভিভাবকদের জন্যও এ ঘটনা একটি সতর্কবার্তা হয়ে এসেছে। কোনো শিশু হঠাৎ করে মাদ্রাসা বা আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে না চাইলে, আচরণে বড় পরিবর্তন দেখা দিলে, অস্বাভাবিক ভয় বা উদ্বেগ প্রকাশ করলে কিংবা শারীরিক আঘাতের চিহ্ন দেখা গেলে বিষয়টি অবহেলা না করার আহ্বান রয়েছে। শিশুকে ভয় দেখিয়ে বা শাস্তি দিয়ে নয়, বরং নিরাপদ পরিবেশে তার কথা শোনার মাধ্যমে প্রকৃত কারণ জানার চেষ্টা করা প্রয়োজন।

বর্তমানে পুলিশের তদন্তে মূল প্রশ্ন হলো, গ্রেপ্তার শিক্ষক ছাড়াও আর কেউ এই ঘটনায় জড়িত ছিলেন কি না এবং মাদ্রাসাটিতে আরও শিক্ষার্থী নির্যাতনের শিকার হয়েছে কি না। পাশাপাশি আগে এ ধরনের কোনো অভিযোগ উঠেছিল কি না, অভিযোগ উঠলে তা কর্তৃপক্ষ কীভাবে মোকাবিলা করেছিল, সেসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় আসতে পারে।

শিশুদের জন্য একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিরাপদ আশ্রয় হওয়ার কথা। সেখানে জ্ঞান ও নৈতিক শিক্ষা পাওয়ার পরিবর্তে কোনো শিশু যদি ভয়, নির্যাতন কিংবা অনিরাপত্তার অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়, সেটি শুধু একটি পরিবারের সংকট নয়; বরং পুরো শিক্ষাব্যবস্থা ও সমাজের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়। তাই সিলেটের এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রকৃত তথ্য উদ্ঘাটন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর নজরদারি ও শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন।

এই সপ্তাহের খবরাখবর

ছাত্র উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে শতকোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ নুরের

প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বিদেশি কর্মীদের ভিসা নিয়ম আরও কঠোর করছে যুক্তরাষ্ট্র

প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সম্পত্তি আইন বাতিলের দাবিতে ইসলামি দলগুলোর বিক্ষোভ

প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

কঙ্গোর স্কুলে ভয়াবহ আগুন, পদদলনে ২৯ শিশুর মৃত্যু

প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

ভারতের সঙ্গে ১০১ চুক্তি পর্যালোচনা করছে সরকার

প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বিষয়বস্তু

ছাত্র উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে শতকোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ নুরের

প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বিদেশি কর্মীদের ভিসা নিয়ম আরও কঠোর করছে যুক্তরাষ্ট্র

প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সম্পত্তি আইন বাতিলের দাবিতে ইসলামি দলগুলোর বিক্ষোভ

প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

কঙ্গোর স্কুলে ভয়াবহ আগুন, পদদলনে ২৯ শিশুর মৃত্যু

প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

ভারতের সঙ্গে ১০১ চুক্তি পর্যালোচনা করছে সরকার

প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

মদ্যপ অবস্থায় মাকে মারধরের দায়ে ছেলের ৬ মাসের কারাদণ্ড

প্রকাশ:  ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

আগামীকাল নয়াদিল্লিতে ব্রিকস সম্মেলন শুরু

প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

শরিয়ার দোহাই দিয়ে বাবা-মায়ের অধিকার রক্ষার আইনের বিরোধিতা কেন

প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সম্পর্কিত নিবন্ধ

জনপ্র্যিয় পেজ