প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন
সংযুক্ত আরব আমিরাতে প্রায় চার হাজার বাংলাদেশির ভিসা বাতিল হওয়ার ঘটনায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে প্রবাসী ও তাদের পরিবারের মধ্যে। বিষয়টি সরকারের নজরে রয়েছে জানিয়ে কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর। একই সঙ্গে ভিসা বাতিলের কারণে কর্মহীন হয়ে দেশে ফেরা ক্ষতিগ্রস্ত প্রবাসীরা দ্রুত পুনর্বাসন, আর্থিক সহায়তা ও বিকল্প কর্মসংস্থানের দাবি জানিয়েছেন।
রোববার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর জানান, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ভিসা বাতিল হওয়া চার হাজার বাংলাদেশির বিষয়টি প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অবগত রয়েছে। বিষয়টি সমাধানে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
সরকারের পক্ষ থেকে এমন আশ্বাস আসার পর ক্ষতিগ্রস্ত প্রবাসীদের মধ্যে কিছুটা প্রত্যাশা তৈরি হলেও অনিশ্চয়তা কাটেনি। কারণ সংযুক্ত আরব আমিরাতে কর্মসংস্থানের ওপর নির্ভর করে দেশে থাকা হাজারো পরিবারের জীবনযাপন। হঠাৎ ভিসা বাতিল হয়ে যাওয়ায় শুধু সংশ্লিষ্ট কর্মীর চাকরি বা বিদেশে অবস্থানের সুযোগই অনিশ্চিত হয়নি, অনেক পরিবারের নিয়মিত আয়ও বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত প্রবাসীরা সোমবার জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে তাদের পরিস্থিতি তুলে ধরেন। সেখানে তারা দ্রুত পুনর্বাসনসহ সরকারের কাছে পাঁচ দফা দাবি জানান। তাদের বক্তব্য, যারা দীর্ঘদিন সংযুক্ত আরব আমিরাতে কাজ করে দেশে অর্থ পাঠিয়েছেন, তাদের অনেকেই ছুটিতে এসে ভিসা বাতিলের কারণে আর কর্মস্থলে ফিরতে পারছেন না। ফলে তারা হঠাৎ করে কর্মহীন অবস্থায় পড়েছেন।
ভুক্তভোগীরা বলেন, ভিসা বাতিলের কারণে দেশে ফিরে আসা প্রবাসীদের দ্রুত পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। যতদিন পর্যন্ত তাদের পুনর্বাসন করা না যায়, ততদিন তাদের এবং পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তার জন্য মাসে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা করে প্রবাসী সহায়তা ভাতা দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। তাদের মতে, বিদেশে কর্মসংস্থান হারানোর পর দেশে ফিরে নতুন করে কাজ খুঁজে পাওয়া অনেকের জন্য সহজ নয়। বিশেষ করে দীর্ঘদিন বিদেশে থাকার পর দেশে ফিরে আসা কর্মীদের জন্য তাৎক্ষণিকভাবে আয় করার সুযোগ তৈরি করা জরুরি।
প্রবাসীরা আরও দাবি করেছেন, কোনো কারণে ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশিদের আবার সংযুক্ত আরব আমিরাতে পাঠানো সম্ভব না হলে সরকারের উদ্যোগে উপযুক্ত অন্য কোনো দেশে তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। বিকল্প দেশে পুনর্বাসনের আগ পর্যন্ত তাদের জন্য সহায়তা ভাতা চালু রাখার দাবিও জানিয়েছেন তারা।
তাদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি হলো, সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকারের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক আলোচনা জোরদার করা। ভিসা জটিলতার দ্রুত সমাধানের পাশাপাশি যেসব বাংলাদেশি আগে বৈধভাবে কর্মরত ছিলেন, তাদের আগের কর্মস্থলে ফিরে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করতে উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন ক্ষতিগ্রস্তরা।
প্রবাসীদের ভাষ্য, বিদেশে একজন কর্মীর কর্মসংস্থান শুধু তার ব্যক্তিগত আয়ের বিষয় নয়। এর সঙ্গে দেশে থাকা পরিবারের খাদ্য, চিকিৎসা, সন্তানের পড়াশোনা, আবাসন এবং ভবিষ্যতের আর্থিক পরিকল্পনা জড়িত থাকে। ফলে হঠাৎ ভিসা বাতিল হলে তার প্রভাব একটি পরিবারের গণ্ডি ছাড়িয়ে বৃহত্তর সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিসরেও পড়ে।
এ কারণে বাংলাদেশ দূতাবাস ও কনস্যুলার সেবাকে আরও কার্যকর এবং সহজলভ্য করার দাবিও জানিয়েছেন তারা। বিদেশে থাকা বাংলাদেশিদের ভিসা নবায়ন, পুনঃপ্রাপ্তি এবং অন্যান্য প্রশাসনিক জটিলতার ক্ষেত্রে দ্রুত সহায়তা পাওয়ার ব্যবস্থা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত প্রবাসীরা শুধু বর্তমান চার হাজার ভিসা বাতিলের সমস্যার সমাধান চাননি। বর্তমানে সংযুক্ত আরব আমিরাতে অবস্থানরত অন্যান্য বাংলাদেশিদের ভিসা-সংক্রান্ত জটিলতারও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান চেয়েছেন তারা। তাদের মতে, বৈধভাবে কর্মরত ও অবস্থানরত বাংলাদেশিদের ভিসা, কর্মসংস্থান এবং বৈধ অবস্থান নিশ্চিত করতে দুই দেশের সরকারের মধ্যে আরও কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন।
সংযুক্ত আরব আমিরাত বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার। দেশটিতে বিভিন্ন খাতে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কাজ করেন। নির্মাণ, পরিবহন, সেবা, ব্যবসা এবং বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত এসব প্রবাসীর পাঠানো অর্থ বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে বড়সংখ্যক কর্মীর ভিসা-সংক্রান্ত জটিলতা দীর্ঘায়িত হলে তার সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
প্রবাসীরা তাদের দাবির মধ্যে দীর্ঘদিন দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখা বাংলাদেশিদের জন্য সুনির্দিষ্ট প্রবাসী পেনশন বা কল্যাণ ভাতা চালুর কথাও বলেছেন। তাদের মতে, কর্মজীবনের দীর্ঘ সময় বিদেশে কাটিয়ে দেশে ফিরে আসা প্রবাসীদের অনেকেই বার্ধক্যে আর্থিক অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হন। তাদের জন্য একটি স্থায়ী সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকলে কর্মজীবন শেষে দেশে ফেরার পর জীবনযাপন তুলনামূলক নিরাপদ হতে পারে।
ভুক্তভোগীদের দাবির মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে ‘রেমিট্যান্স শাটডাউন’-এর হুঁশিয়ারি। তারা বলেছেন, তাদের দাবিগুলো দ্রুত বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে পরবর্তী কর্মসূচি হিসেবে রেমিট্যান্স পাঠানো বন্ধ করার মতো কর্মসূচি ঘোষণা করতে বাধ্য হতে পারেন। এমন বক্তব্যকে ক্ষতিগ্রস্ত প্রবাসীদের ক্ষোভ ও হতাশার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে এই ধরনের কর্মসূচির সম্ভাব্য প্রভাব নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ এবং বহু পরিবারের দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। তাই ভিসা সমস্যার সমাধান না হলে ক্ষতিগ্রস্তদের সঙ্গে সরকারের আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছানো গুরুত্বপূর্ণ বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
সরকারের পক্ষ থেকে অবশ্য ইতোমধ্যে কূটনৈতিক উদ্যোগের কথা জানানো হয়েছে। প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুরের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও বিষয়টি সম্পর্কে অবগত। অর্থাৎ সমস্যাটিকে শুধু শ্রম বা কর্মসংস্থানসংক্রান্ত বিষয় হিসেবে নয়, কূটনৈতিক পর্যায়েও গুরুত্ব দিয়ে দেখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এখন মূল প্রশ্ন হলো, ভিসা বাতিলের পেছনে সুনির্দিষ্ট কারণ কী এবং কত দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশিদের জন্য সমাধানের পথ তৈরি করা সম্ভব হবে। যাদের আগের কর্মস্থলে ফিরে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে পুনরায় প্রবেশ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা সম্ভব হবে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে যারা আর আমিরাতে ফিরতে পারবেন না, তাদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান ও সামাজিক সুরক্ষা কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, সেটিও সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।
প্রবাসীদের অভিযোগ ও দাবির পাশাপাশি সরকারের কূটনৈতিক উদ্যোগের ফলাফল এখন তাই নজরদারিতে থাকবে। চার হাজার বাংলাদেশির ভিসা জটিলতার সমাধান শুধু একটি প্রশাসনিক সমস্যার নিষ্পত্তি নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কয়েক হাজার পরিবারের আয়-রোজগার, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং সামাজিক নিরাপত্তা।
ক্ষতিগ্রস্তদের প্রত্যাশা, দুই দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে এমন একটি সমাধানে পৌঁছাবে যাতে বৈধভাবে কাজ করা বাংলাদেশিরা তাদের কর্মসংস্থানে ফিরতে পারেন অথবা প্রয়োজন হলে বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ পান। একই সঙ্গে ভিসা ও কনস্যুলার জটিলতার দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হলে ভবিষ্যতে একই ধরনের পরিস্থিতিতে সাধারণ প্রবাসীদের ভোগান্তিও কমবে। এখন কূটনৈতিক আলোচনার অগ্রগতি এবং সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকেই তাকিয়ে আছেন ক্ষতিগ্রস্ত প্রবাসী ও তাদের পরিবারের সদস্যরা।


