প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
বিশ্বের সবচেয়ে বড় বহুপাক্ষিক ফোরাম জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে সভাপতির দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। আগামী ৮ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হতে যাওয়া নতুন অধিবেশনের সঙ্গে তার এক বছরের দায়িত্বকালও শুরু হবে। এর মধ্য দিয়ে প্রায় চার দশক পর আবারও একজন বাংলাদেশি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মঞ্চের সভাপতির আসনে বসতে যাচ্ছেন।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব কেবল একটি আনুষ্ঠানিক পদ নয়। ১৯৩ সদস্যের এই বৈশ্বিক ফোরামে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের রাষ্ট্রগুলো আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা, উন্নয়ন, মানবাধিকার, জলবায়ু পরিবর্তন, দারিদ্র্য, বৈশ্বিক অর্থনীতি এবং নানা সংকট নিয়ে আলোচনা করে। এসব আলোচনা পরিচালনা, সদস্যরাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সমন্বয় এবং সাধারণ পরিষদের কার্যক্রমকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে সভাপতির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
গত ২ জুন নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে গোপন ব্যালটে ড. খলিলুর রহমান সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হন। নির্বাচনে মোট ১৯০টি ভোট পড়েছিল। এর মধ্যে বাংলাদেশের প্রার্থী খলিলুর রহমান পান ৯৯ ভোট। তার প্রতিদ্বন্দ্বী সাইপ্রাসের বিশেষ দূত আন্দ্রেয়াস এস কাকোরিস পান ৯১ ভোট। অর্থাৎ আট ভোটের ব্যবধানে জয় পান বাংলাদেশের প্রার্থী।
এ নির্বাচন ছিল বাংলাদেশের কূটনৈতিক অঙ্গনের জন্য একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতির পদটি আঞ্চলিক ঘূর্ণননীতির ভিত্তিতে বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে বণ্টিত হয়। ৮১তম অধিবেশনের সভাপতির পদটি এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের জন্য নির্ধারিত ছিল। সেই প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ ড. খলিলুর রহমানকে প্রার্থী করে এবং ভোটাভুটিতে তিনি নির্বাচিত হন।
ড. খলিলুর রহমানের সামনে দায়িত্বের মেয়াদ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু সামনে আসবে। জাতিসংঘের ৮১তম অধিবেশনের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘Restoring Trust, Managing Transformation: A United Nations That Delivers for All’—অর্থাৎ আস্থা পুনরুদ্ধার, পরিবর্তন ব্যবস্থাপনা এবং সবার জন্য কার্যকর জাতিসংঘ গড়ে তোলার লক্ষ্যকে সামনে রেখে অধিবেশন পরিচালিত হবে।
৮ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্ক স্থানীয় সময় বিকেল ৩টায় সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের উদ্বোধনী কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। এর পর ২২ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হবে বহুল প্রতীক্ষিত উচ্চপর্যায়ের সাধারণ বিতর্ক। ২২ থেকে ২৬ সেপ্টেম্বর এবং ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলবে সাধারণ বিতর্ক, যেখানে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান এবং মন্ত্রীরা নিজ নিজ দেশের অবস্থান ও বৈশ্বিক বিভিন্ন বিষয়ে বক্তব্য দেবেন।
এই সাধারণ বিতর্ক জাতিসংঘের কূটনৈতিক ক্যালেন্ডারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলোর একটি। বিশ্বের প্রায় সব দেশের শীর্ষ নেতৃত্ব এই সময়ে নিউইয়র্কে সমবেত হন। যুদ্ধ ও সংঘাত, মানবিক সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে সেখানে আলোচনা হয়। ফলে সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে ড. খলিলুর রহমানকে এমন একটি সময়ে দায়িত্ব পালন করতে হবে, যখন বহুপাক্ষিক সহযোগিতা নানা চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে।
নির্বাচনের পর ড. খলিলুর রহমান তার দায়িত্বের অগ্রাধিকার সম্পর্কে যে ধারণা দিয়েছেন, তাতেও বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তা, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার অগ্রগতি, জলবায়ু ও পরিবেশ, মানবাধিকার, উদীয়মান প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার শাসন এবং জাতিসংঘ সংস্কারের বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থা পুনর্গঠন এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেছেন।
বাংলাদেশের জন্য এ দায়িত্বের গুরুত্ব আরও বেশি। কারণ সাধারণ পরিষদের সভাপতির পদে বাংলাদেশের একজন কূটনীতিকের উপস্থিতি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের দীর্ঘদিনের বহুপাক্ষিক কূটনীতির ধারাবাহিকতারও প্রতিফলন। শান্তিরক্ষা কার্যক্রম, টেকসই উন্নয়ন, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি এবং রোহিঙ্গা সংকটের মতো বিভিন্ন ইস্যুতে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে জাতিসংঘের প্ল্যাটফর্মে সক্রিয়। ফলে সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালনের সময় এসব অভিজ্ঞতাও আন্তর্জাতিক আলোচনায় বাংলাদেশের অবস্থানকে দৃশ্যমান করার সুযোগ তৈরি করতে পারে।
ড. খলিলুর রহমানের কূটনৈতিক অভিজ্ঞতাও তার নতুন দায়িত্বের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, তিনি চার দশকেরও বেশি সময় ধরে কূটনীতি ও বহুপাক্ষিক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত। ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র ক্যাডারে যোগ দেওয়ার পর তিনি নিউইয়র্ক ও জেনেভায় জাতিসংঘ-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেছেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী হওয়ার আগে তিনি জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং রোহিঙ্গা বিষয়ক হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভাপতির পদে বাংলাদেশের সর্বশেষ উপস্থিতি ছিল ১৯৮৬ সালে। সে সময় বাংলাদেশের সাবেক পররাষ্ট্রসচিব ও রাজনীতিবিদ হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী সাধারণ পরিষদের ৪১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। প্রায় ৪০ বছর পর আবারও একজন বাংলাদেশি এই দায়িত্বে আসছেন।
দীর্ঘ এই ব্যবধান বাংলাদেশের কূটনৈতিক ইতিহাসে ড. খলিলুর রহমানের নির্বাচনের গুরুত্ব আরও বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে এটি বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের একটি বড় সুযোগও তৈরি করেছে। সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে তাকে বিভিন্ন দেশের মধ্যে মতপার্থক্যের মধ্যেও আলোচনার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। জাতিসংঘের মতো বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানে যেখানে প্রতিটি দেশের নিজস্ব রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক স্বার্থ রয়েছে, সেখানে সমন্বয় ও ভারসাম্য রক্ষা সভাপতির অন্যতম বড় দায়িত্ব।
বর্তমান বিশ্বে যুদ্ধ ও সংঘাতের বিস্তার, মানবিক সংকট, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত, উন্নয়ন অর্থায়নের ঘাটতি, প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন এবং আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আস্থার প্রশ্ন জাতিসংঘের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ড. খলিলুর রহমান নির্বাচনের পর এসব বাস্তবতা তুলে ধরে বহুপাক্ষিক ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।
বিশেষ করে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের মেয়াদ ২০২৬ সালের শেষ দিকে শেষ হওয়ার কথা। ফলে ৮১তম অধিবেশনের মেয়াদকালে নতুন মহাসচিব নির্বাচনের প্রক্রিয়াও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠবে। এই প্রক্রিয়ায় সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব রাজনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে আরও সংবেদনশীল হয়ে উঠতে পারে।
বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্যও এ দায়িত্ব একটি বিশেষ গর্বের বিষয়। আন্তর্জাতিক রাজনীতির কেন্দ্রীয় মঞ্চে দেশের একজন প্রতিনিধি যখন বিশ্বের রাষ্ট্রগুলোর সাধারণ পরিষদের কার্যক্রম পরিচালনা করবেন, তখন তা দেশের কূটনৈতিক সক্ষমতার একটি দৃশ্যমান প্রতীক হয়ে উঠবে। তবে একই সঙ্গে এই দায়িত্বের সঙ্গে যুক্ত থাকবে বড় প্রত্যাশা। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বৈশ্বিক শান্তি, উন্নয়ন ও ন্যায়ভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার পক্ষে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ভূমিকা রাখার সুযোগ থাকবে তার সামনে।
আগামী ৮ সেপ্টেম্বর থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ড. খলিলুর রহমানের সামনে থাকবে এক বছরের ব্যস্ত কূটনৈতিক সময়সূচি। সাধারণ পরিষদের নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি বিশ্বনেতাদের উচ্চপর্যায়ের বৈঠক, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংকট নিয়ে আলোচনা এবং গুরুত্বপূর্ণ বহুপাক্ষিক উদ্যোগে সভাপতির ভূমিকা পালন করতে হবে তাকে।
চার দশক আগে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর পর এবার ড. খলিলুর রহমানের মাধ্যমে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্বে বাংলাদেশের দ্বিতীয়বারের মতো প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হয়েছে। বাংলাদেশের কূটনীতির জন্য এটি যেমন একটি ঐতিহাসিক অর্জন, তেমনি বিশ্বমঞ্চে দায়িত্বশীল ও কার্যকর ভূমিকা রাখারও একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। এখন নজর থাকবে, ৮১তম অধিবেশনের পুরো মেয়াদে বাংলাদেশ কীভাবে এই দায়িত্বকে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, শান্তি ও বহুপাক্ষিকতার স্বার্থে কাজে লাগাতে পারে।


