প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস ও সার সংকট নিরসন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি বন্ধ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নসহ ছয় দফা দাবিতে ১১ দলীয় ঐক্যের ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখী লংমার্চ শুরু হয়েছে। শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) সকাল ৭টায় রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে উদ্বোধনী সমাবেশের মধ্য দিয়ে কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়। সমাবেশ শেষে চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওনা হয় লংমার্চের গাড়িবহর।
উদ্বোধনী সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ও জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ উদ্বোধনী বক্তব্য দেন। এ সময় জোটের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারাও বক্তব্য রাখেন।
নেতাদের বক্তব্যের পর নির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী চট্টগ্রামের পথে যাত্রা শুরু করে লংমার্চের গাড়িবহর। আয়োজকদের পক্ষ থেকে কর্মসূচিকে শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর আগে লংমার্চ সফল করতে দীর্ঘ সময় ধরে প্রস্তুতি, স্থানীয় পর্যায়ে প্রচার, সাংগঠনিক সমন্বয় এবং প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
১১ দলীয় ঐক্যের ঘোষিত কর্মসূচির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ছয়টি দাবি। এর মধ্যে রয়েছে গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ-তেল-গ্যাস ও সার সংকটের সমাধান, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি রোধ, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি বন্ধ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন ও প্রশাসনের সর্বস্তরে সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধ করা। জোটের নেতারা এসব দাবিকে জনগণের দৈনন্দিন জীবন, অর্থনীতি ও রাষ্ট্র পরিচালনার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত বিষয় হিসেবে তুলে ধরছেন।
লংমার্চকে ঘিরে এর আগে জোটের নেতারা জানিয়েছিলেন, কর্মসূচির উদ্দেশ্য কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া নয়; বরং ঘোষিত দাবিগুলো নিয়ে জনমত তৈরি এবং সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করা। জোটের পক্ষ থেকে কর্মসূচিকে শান্তিপূর্ণ রাখার কথাও বলা হয়েছে। একই সঙ্গে লংমার্চে প্রশাসনিক সহযোগিতা প্রত্যাশা করেছেন নেতারা।
কর্মসূচির রুটে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পথসভা আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। ঢাকার শাপলা চত্বর থেকে চট্টগ্রামের লালদিঘি ময়দান পর্যন্ত দীর্ঘ এই যাত্রাপথে নারায়ণগঞ্জের কাচপুর, কুমিল্লার পদুয়া বাজার বিশ্বরোড, ফেনীর মহীপাল এবং মীরসরাই এলাকায় পথসভা হওয়ার কথা রয়েছে। এসব পথসভায় স্থানীয় নেতাকর্মী ও সমর্থকদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণেরও আহ্বান জানানো হয়েছে।
লংমার্চের শেষ পর্যায়ে চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক লালদিঘি ময়দানে সমাপনী জনসভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে ১১ দলীয় ঐক্যের শীর্ষ নেতারা বক্তব্য দেবেন এবং ঘোষিত দাবিগুলো নিয়ে তাদের অবস্থান তুলে ধরবেন। ফলে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত পুরো কর্মসূচিকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
লংমার্চের আগে শুক্রবার ১১ দলীয় ঐক্যের নেতারা কর্মসূচির প্রস্তুতি নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। সেখানে লংমার্চের রুট, গাড়িবহরের ব্যবস্থাপনা, পথসভা এবং শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচি সম্পন্ন করার বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়। জোটের পক্ষ থেকে বলা হয়, কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারীদের শৃঙ্খলা বজায় রাখার পাশাপাশি নির্ধারিত কাঠামোর মধ্যে গাড়িবহর পরিচালনা করা হবে।
জোটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার এর আগে জানিয়েছিলেন, লংমার্চে অংশ নেওয়া গাড়িবহরের সঙ্গে নির্ধারিত নিয়মের বাইরে কোনো গাড়ি চলন্ত অবস্থায় যুক্ত হবে না। বহরের ব্যবস্থাপনা এবং গণমাধ্যমের গাড়ি চলাচল নিয়েও পরিকল্পনার কথা জানানো হয়। স্থানীয় পর্যায়ে পথসভাগুলোতে স্থানীয় নেতাকর্মীরা দায়িত্ব পালন করবেন বলেও জানানো হয়েছিল।
লংমার্চকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক উত্তাপের পাশাপাশি জনদুর্ভোগের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক দেশের অন্যতম ব্যস্ত যোগাযোগপথ হওয়ায় বড় আকারের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে যানবাহন চলাচলে চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে কুমিল্লা, ফেনী ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে বিপুলসংখ্যক মানুষের সমাগম হলে স্বাভাবিক যান চলাচল ব্যাহত হতে পারে। ফলে কর্মসূচির রাজনৈতিক গুরুত্বের পাশাপাশি এর ব্যবস্থাপনাও সংশ্লিষ্টদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
আয়োজকদের দাবি, কর্মসূচিতে বিপুলসংখ্যক যানবাহন অংশ নেবে। এর আগে ১১ দলীয় ঐক্যের পক্ষ থেকে প্রায় দেড় হাজার গাড়ি অংশ নেওয়ার প্রস্তুতির কথা জানানো হয়েছিল। তবে বাস্তবে কতসংখ্যক যানবাহন ও মানুষ কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন, তা দিনের কর্মসূচি শেষ হওয়ার পরই স্পষ্ট হবে।
এই লংমার্চ এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন দ্রব্যমূল্য, জ্বালানি সরবরাহ, আইনশৃঙ্খলা এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা চলছে। ১১ দলীয় ঐক্য এসব ইস্যুকে সামনে এনে রাজপথে তাদের সাংগঠনিক উপস্থিতি জানান দিতে চাইছে। বিশেষ করে গণভোটের গণরায় ও জুলাই গণহত্যার বিচারকে দাবির তালিকায় সামনে রাখার মাধ্যমে তারা রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক সংস্কারের বিষয়গুলোকেও কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত করেছে।
জোটের নেতারা মনে করছেন, সংসদের পাশাপাশি রাজপথেও জনগণের দাবি তুলে ধরা প্রয়োজন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, জনজীবনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সমস্যাগুলোর দ্রুত সমাধান এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় জবাবদিহি নিশ্চিত করার জন্য সরকারের ওপর রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপ তৈরি করাই এ ধরনের কর্মসূচির অন্যতম উদ্দেশ্য।
অন্যদিকে, এমন বড় রাজনৈতিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যাতে কোনোভাবেই অবনতি না ঘটে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। লংমার্চের পথে কোথাও অপ্রীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি না হওয়া, যান চলাচল স্বাভাবিক রাখা এবং অংশগ্রহণকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রশাসনের জন্য বড় দায়িত্ব। জোটের পক্ষ থেকেও শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচি পালনের আহ্বান জানানো হয়েছে।
ঢাকার শাপলা চত্বর থেকে শুরু হওয়া এই লংমার্চ শেষ পর্যন্ত চট্টগ্রামের লালদিঘি ময়দানে গিয়ে কী ধরনের জনসমাগম তৈরি করে এবং সেখানে নেতারা কী বার্তা দেন, সেদিকেই এখন রাজনৈতিক মহলের নজর। ছয় দফা দাবিকে সামনে রেখে আয়োজিত এ কর্মসূচি ১১ দলীয় ঐক্যের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কর্মসূচির দিকনির্দেশনা এবং রাজপথে তাদের সাংগঠনিক সক্ষমতারও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এই লংমার্চ শুধু একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি হিসেবেই নয়, বরং ঘোষিত দাবিগুলোর প্রতি জনসমর্থন কতটা রয়েছে, তারও একটি দৃশ্যমান প্রকাশ ঘটাতে পারে। তবে কর্মসূচির রাজনৈতিক প্রভাব নির্ভর করবে এর শান্তিপূর্ণ বাস্তবায়ন, জনসম্পৃক্ততা এবং পরবর্তী সময়ে উত্থাপিত দাবিগুলো নিয়ে সরকারের অবস্থানের ওপর।


