প্রকাশ: ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দেওয়ার আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফরের সম্ভাবনা নেই বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। তিনি বলেছেন, ভারতের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর দ্বিপক্ষীয় সফর নিয়ে আলোচনা চলছে, তবে এখনো কোনো তারিখ চূড়ান্ত হয়নি। উপযুক্ত সময় ও পরিবেশ তৈরি হলে সফরটি অনুষ্ঠিত হবে।
শনিবার সকালে সিলেট নগরের একটি হোটেলে কর্মরত টেলিভিশন সাংবাদিকদের সংগঠন ইমজার নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলাপকালে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এসব কথা বলেন। এ সময় তিনি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক, প্রধানমন্ত্রীর জাতিসংঘ সফর, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক, বোয়িং উড়োজাহাজ কেনা, জ্বালানি সংকট, মক্কা চুক্তি এবং মালয়েশিয়ায় শ্রমবাজারসহ বিভিন্ন বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দেন।
প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর প্রসঙ্গে হুমায়ুন কবির বলেন, সফরের দিন-তারিখ এখনো নির্ধারিত হয়নি। তবে এ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের আগে সফরটি হওয়ার সম্ভাবনা নেই বলেও তিনি স্পষ্ট করেন। এর আগে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি জানিয়েছিলেন, উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হলে প্রধানমন্ত্রী অবশ্যই ভারত সফর করবেন। সফরের সময় নির্ধারণের ক্ষেত্রে পারস্পরিক সম্মান, জাতীয় স্বার্থ এবং দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর সময়সূচিকে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে আলোচনার পথ খোলা রাখার বিষয়টিও স্পষ্ট হয়েছে। তিনি বলেন, দুই দেশের মধ্যে হাজার সমস্যা থাকলেও প্রতিবেশী হিসেবে ভারতের সঙ্গে আলোচনার পথ বন্ধ করা যাবে না। বাংলাদেশের স্বার্থ ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে প্রতিবেশী দেশটির সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্কের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে নানা আলোচনা ও টানাপোড়েনের মধ্যে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর এই বক্তব্যকে তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, মতপার্থক্য থাকলেও কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রাখার নীতিতেই এগোচ্ছে বাংলাদেশ। বিশেষ করে দুই দেশের মধ্যে সীমান্ত, বাণিজ্য, নিরাপত্তা, পানি, যোগাযোগ ও রাজনৈতিক নানা ইস্যুতে নিয়মিত আলোচনা প্রয়োজন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন জাতিসংঘ সফর নিয়েও কথা বলেন হুমায়ুন কবির। তিনি জানান, নতুন বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার বার্তা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দেবেন। সেখানে বিভিন্ন দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানদের সঙ্গে বৈঠকের পাশাপাশি বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হবে। এ সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের সম্ভাবনাও রয়েছে বলে জানান তিনি।
জাতিসংঘের অধিবেশন বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের অবস্থান তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। বিশেষ করে নতুন সরকারের পররাষ্ট্রনীতি, অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার, বিনিয়োগের সম্ভাবনা এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে বার্তা দেওয়ার ক্ষেত্রে এই সফর গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কও এই সফরের আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে।
জ্বালানি খাতের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়েও সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, জ্বালানি খাতকে প্রধানমন্ত্রী সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছেন এবং সংকট সমাধানে সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করছে। দেশের অর্থনীতি, শিল্প উৎপাদন, পরিবহন এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে জ্বালানি সরবরাহ সরাসরি যুক্ত হওয়ায় এ খাতের স্থিতিশীলতা সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার বলে তিনি উল্লেখ করেন।
জ্বালানি খাতের অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রসঙ্গ তুলে ধরে হুমায়ুন কবির সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কার ব্যবস্থাপনার সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, জ্বালানি খাতের দিকে তাকালেই কীভাবে দুর্নীতির একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি হতে পারে, তার ধারণা পাওয়া যায়। তবে বর্তমান সরকার পরিস্থিতি পরিবর্তনের জন্য কাজ করছে বলে দাবি করেন তিনি।
মক্কা চুক্তি নিয়ে সরকারের অবস্থান সম্পর্কেও বক্তব্য দেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। তিনি জানান, এ বিষয়ে এখনো আলোচনা চলছে। বাংলাদেশের জন্য এই চুক্তিতে যুক্ত হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তার ভাষায়, বিশ্বের অনেক দেশই একাধিক নিরাপত্তা জোটের সঙ্গে সম্পর্ক রাখছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও কোথায় যুক্ত হওয়া প্রয়োজন, সেটি জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতেই নির্ধারণ করা হবে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানের কথাও তুলে ধরেন হুমায়ুন কবির। তিনি বলেন, দেশের পররাষ্ট্রনীতিতে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। কোনো নির্দিষ্ট দেশের সঙ্গে সম্পর্ককে অন্য দেশের সঙ্গে বৈরিতার কারণ হিসেবে দেখা হবে না। বরং বাংলাদেশের প্রয়োজন ও স্বার্থ বিবেচনায় বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার নীতিতে সরকার এগোচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার প্রসঙ্গও উঠে আসে সাংবাদিকদের প্রশ্নে। এ বিষয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশকে বোয়িং কিনতেই হবে—এমন কোনো চাপ নেই। দেশের প্রয়োজন ও চাহিদার কারণেই যুক্তরাষ্ট্র থেকে বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে প্রয়োজন হলে আরও উড়োজাহাজ কেনা হতে পারে বলেও জানান তিনি।
বিমান পরিবহন খাতের সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি তুলে ধরেন। বাংলাদেশের বিমান বহরের সক্ষমতা বাড়ানো না গেলে নতুন আন্তর্জাতিক রুট চালু করা এবং আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলের বাজারে প্রতিযোগিতা করা কঠিন হবে বলে তিনি মনে করেন। এভিয়েশন খাতে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করতে দীর্ঘমেয়াদে নতুন উড়োজাহাজ সংযোজন প্রয়োজন বলেও তার বক্তব্যে উঠে আসে।
মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের শ্রমশক্তি রপ্তানির বিষয়েও কথা বলেন হুমায়ুন কবির। তিনি অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় একটি সিন্ডিকেটের কারণে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশের কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছিল। বর্তমান সরকার সেই সিন্ডিকেট ভেঙে দিয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, এখন ধাপে ধাপে মালয়েশিয়ায় শ্রমশক্তি রপ্তানি করা হবে।
বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবিকার সঙ্গে বিদেশে কর্মসংস্থানের বিষয়টি সরাসরি যুক্ত। তাই শ্রমবাজার সম্প্রসারণের পাশাপাশি কর্মীদের স্বচ্ছ ও নিরাপদ প্রক্রিয়ায় বিদেশে পাঠানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে জানানো হয়েছে। মালয়েশিয়ার বাজারে নতুন করে কর্মী পাঠানোর উদ্যোগ সফল হলে বাংলাদেশি কর্মপ্রত্যাশীদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
কলকাতায় বাংলাদেশি নাগরিকদের হোটেলে থাকার জায়গা না পাওয়া এবং কেউ কেউ রাস্তায় রাত কাটাতে বাধ্য হওয়ার অভিযোগ নিয়েও প্রতিমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন সাংবাদিকরা। জবাবে হুমায়ুন কবির বলেন, নির্দিষ্ট ঘটনা ও প্রমাণসহ বিষয়টি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নজরে আনা হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বাংলাদেশি নাগরিকদের বিদেশে গিয়ে হয়রানি বা বৈষম্যের শিকার হওয়ার অভিযোগ কূটনৈতিকভাবে গুরুত্ব দিয়ে দেখার কথা জানানোর মধ্য দিয়ে নাগরিক সুরক্ষার বিষয়টিও সামনে আনেন প্রতিমন্ত্রী। কোনো নির্দিষ্ট ঘটনায় সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে বলেও তার বক্তব্যে ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
সব মিলিয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে একদিকে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে আলোচনা অব্যাহত রাখার বার্তা এসেছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে সম্পর্ক পরিচালনার অবস্থানও তুলে ধরা হয়েছে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের আগে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর না হওয়ার বিষয়টি আপাতত স্পষ্ট হলেও ভবিষ্যতে উপযুক্ত পরিবেশ ও সময় তৈরি হলে দ্বিপক্ষীয় সফরটি অনুষ্ঠিত হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে প্রতিবেশী সম্পর্ক, জ্বালানি নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, শ্রমবাজার এবং বহুপক্ষীয় নিরাপত্তা সহযোগিতার মতো বিষয়গুলো ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। প্রধানমন্ত্রীর জাতিসংঘ সফর সামনে রেখে এসব ইস্যুতে সরকারের অবস্থান আন্তর্জাতিক পরিসরে কতটা গুরুত্ব পায়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।


