প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সাভারের আলোচিত রানা প্লাজা ভবন নির্মাণে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে দায়ের করা মামলায় ভবনটির মালিক সোহেল রানাসহ আট আসামির রায় আবারও পিছিয়েছে। ঢাকার বিভাগীয় স্পেশাল জজ আদালত আগামী ৬ অক্টোবর রায় ঘোষণার নতুন তারিখ নির্ধারণ করেছেন। একই দিনে মামলাটিতে পুনরায় যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের জন্যও দিন ধার্য করা হয়েছে।
মঙ্গলবার সকালে ঢাকার বিভাগীয় স্পেশাল জজ আদালতের বিচারক বি এম তারিকুল কবীর নতুন তারিখ ঘোষণা করেন। এর আগে গত ১৬ আগস্ট মামলাটির রায় ঘোষণার দিন নির্ধারিত ছিল। তবে নির্ধারিত সময়ে রায়ের প্রস্তুতি শেষ না হওয়ায় আদালত তা পিছিয়ে ১ সেপ্টেম্বর নতুন দিন ধার্য করেছিলেন। এবারও রায় ঘোষণা না হওয়ায় মামলাটি আরও এক দফা পিছিয়ে গেল।
রানা প্লাজা ধসের এক যুগেরও বেশি সময় পর ভবন নির্মাণে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের এই মামলার রায় ঘিরে নিহত ও ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের পরিবারসহ সংশ্লিষ্টদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে প্রত্যাশা রয়েছে। ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিলের ভয়াবহ ভবনধস শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের পোশাকশিল্পের ইতিহাসেও গভীরভাবে আলোচিত একটি ঘটনা। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে একটি বহুতল ভবন ধসে পড়ায় সেখানে কর্মরত বিপুলসংখ্যক মানুষ ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়েন। সরকারি হিসাবে ওই ঘটনায় ১ হাজার ১৩৬ জনের বেশি মানুষ নিহত হন। আহত হন আরও বহু শ্রমিক ও কর্মচারী।
এ মামলায় সোহেল রানার সঙ্গে আসামি রয়েছেন সাভার পৌরসভার সাবেক মেয়র রেফাত উল্লাহ, সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা উত্তম কুমার রায়, নির্বাহী প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম, সাবেক সহকারী প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমান, সাবেক উপসহকারী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান রাসেল, সাবেক টাউন প্ল্যানার ফারজানা ইসলাম এবং লাইসেন্স পরিদর্শক মো. আবদুল মোত্তালিব।
আসামিদের মধ্যে সোহেল রানা এ মামলায় জামিনে থাকলেও রানা প্লাজা ধসে শ্রমিক নিহত হওয়ার ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলায় তিনি বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। আগামী ৬ অক্টোবর রায় ঘোষণার দিন তাকে কারাগার থেকে আদালতে হাজির করার কথা রয়েছে। অন্যদিকে মাহবুবুর রহমান ও ফারজানা ইসলাম পলাতক রয়েছেন। জামিনে থাকা অন্যান্য আসামিদেরও ওই দিন আদালতে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।
মামলার বিচারিক কার্যক্রম চলাকালে সোহেল রানার বাবা আবদুল খালেক এবং মা মর্জিনা খাতুন বেগম মারা যান। তাদের মৃত্যুর পর আদালত তাদের মামলা থেকে অব্যাহতি দেন। ফলে বর্তমানে আট আসামিকে ঘিরেই ভবন নির্মাণে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের বিচারিক কার্যক্রম সম্পন্ন হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।
রানা প্লাজা ভবনটি ধসে পড়ার পর এর নির্মাণপ্রক্রিয়া, অনুমোদিত নকশা, কাঠামোগত পরিবর্তন এবং ভবনের ব্যবহার নিয়ে ব্যাপক প্রশ্ন ওঠে। ভবনটি নির্মাণের শুরুতে ছয়তলা একটি শপিং কমপ্লেক্স হিসেবে অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল বলে মামলার অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০০৬ সালের ১০ এপ্রিল সাভার পৌরসভা থেকে ভবনটির নকশা অনুমোদন করা হয়। পরবর্তী সময়ে ২০০৮ সালের ২২ জানুয়ারি ভবনটির ওপর আরও চারটি তলা নির্মাণের অনুমোদন চাওয়া হয়।
অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ভবনটি শপিং কমপ্লেক্স হিসেবে অনুমোদিত হলেও পরে সেখানে পাঁচটি পোশাক কারখানা স্থাপনের অনুমতি দেওয়া হয়। নকশা অনুমোদন, অতিরিক্ত তলা নির্মাণ এবং পোশাক কারখানা স্থাপনের অনুমোদন দেওয়ার বিভিন্ন পর্যায়ে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ আনা হয়। ভবনটির ব্যবহার ও কাঠামোগত পরিবর্তনের ফলে নিরাপত্তা ও স্থায়িত্ব নিয়ে যে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল, মামলার অভিযোগে তারও উল্লেখ রয়েছে।
দুর্ঘটনার পর ভবন নির্মাণের অনুমোদন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়ে তদন্ত শুরু করে দুর্নীতি দমন কমিশন। নকশাবহির্ভূতভাবে ভবন নির্মাণের অভিযোগে ২০১৪ সালের ১৫ জুন সাভার থানায় ১৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। সে সময় ভবনটির মালিক হিসেবে নথিতে তার বাবা আবদুল খালেকের নাম থাকায় সোহেল রানাকে মামলায় আসামি করা হয়নি।
পরবর্তী তদন্তে ভবন নির্মাণ, অনুমোদন ও ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সোহেল রানার সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়ার কথা জানায় দুদক। এর পর অধিকতর তদন্ত শেষে ২০১৭ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি সোহেল রানা, তার বাবা-মাসহ মোট ১৮ জনকে আসামি করে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করা হয়।
পরে অভিযোগ গঠনের সময় আটজনকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয় এবং ১০ আসামির বিরুদ্ধে বিচার শুরুর আদেশ দেওয়া হয়। বিচার চলাকালে সোহেল রানার বাবা ও মায়ের মৃত্যু হওয়ায় তাদেরও মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এর ফলে বর্তমানে আটজন আসামিকে ঘিরে মামলাটির বিচারিক কার্যক্রম এগিয়েছে।
২০১৭ সালের ২১ মে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে এ মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রপক্ষ ২০ জন সাক্ষী উপস্থাপনের অনুমতি পেলেও আদালতে ১৯ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন। তাদের সাক্ষ্যগ্রহণ, আসামিপক্ষের জেরা এবং অন্যান্য আইনি প্রক্রিয়া শেষে মামলাটি রায় ঘোষণার পর্যায়ে পৌঁছায়।
তবে রায় ঘোষণার নির্ধারিত সময়েও তা না হওয়ায় এখন আবার যুক্তিতর্কের সুযোগ রাখা হয়েছে। ফলে আগামী ৬ অক্টোবর মামলার বিচারিক কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন হতে যাচ্ছে। ওই দিন যুক্তিতর্ক শেষে আদালত রায় ঘোষণা করবেন কি না, সেটিই এখন নজরদারির বিষয়।
রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় দায়ের করা একাধিক মামলার মধ্যে ভবন নির্মাণে অনিয়ম ও দুর্নীতির মামলাটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। কারণ, এই মামলায় শুধু ভবনধসের পরিণতি নয়, বরং ভবন নির্মাণের অনুমোদন, নকশা পরিবর্তন, অতিরিক্ত তলা নির্মাণ এবং পোশাক কারখানা স্থাপনের অনুমোদন প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা নিয়ে বিচার চলছে।
২০১৩ সালের সেই ভয়াবহ দিনের পর বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের কর্মপরিবেশ, ভবন নিরাপত্তা এবং শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে দেশে-বিদেশে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। রানা প্লাজার ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার করা মরদেহ, আহত শ্রমিকদের আর্তনাদ এবং স্বজনদের দীর্ঘ অপেক্ষা বাংলাদেশের শিল্পায়নের ইতিহাসে এক গভীর মানবিক ক্ষত তৈরি করে। সেই ঘটনার দায় ও জবাবদিহি নিয়ে বিচারিক প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর অপেক্ষাও দীর্ঘ হয়েছে।
আদালতের পরবর্তী সিদ্ধান্ত তাই শুধু একটি মামলার আইনি নিষ্পত্তির বিষয় নয়; ভবন নির্মাণ ও অনুমোদন ব্যবস্থায় দায়িত্বশীলতা, সরকারি প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি এবং শিল্পকারখানায় নিরাপত্তার প্রশ্নেও এর গুরুত্ব রয়েছে। আগামী ৬ অক্টোবর আদালতে কী সিদ্ধান্ত আসে, সেদিকেই এখন সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টি।

