প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ককে অতীতের ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে ভবিষ্যতের সম্ভাবনা, পারস্পরিক স্বার্থ এবং জনগণের কল্যাণকে সামনে রেখে এগিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। তিনি বলেছেন, দুই প্রতিবেশী দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ থাকাটা স্বাভাবিক। তবে সেই চ্যালেঞ্জগুলোকে বাস্তবতার আলোকে বিবেচনা করে পারস্পরিক সহযোগিতার পথ খুঁজে বের করতে হবে।
তার মতে, ইতিহাস ও অতীতকে পুরোপুরি ভুলে যাওয়া সম্ভব নয়। কারণ দুই দেশের দীর্ঘ সম্পর্কের সঙ্গে ইতিহাস, সংস্কৃতি, রাজনীতি এবং মানুষের আবেগ জড়িয়ে আছে। কিন্তু অতীতের কোনো নির্দিষ্ট ঘটনা বা মতবিরোধকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন আটকে থাকলে ভবিষ্যতের উন্নয়ন ও সহযোগিতার সম্ভাবনা বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
মঙ্গলবার সচিবালয়ে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীলদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ভারতীয় হাইকমিশনার এসব কথা বলেন। বৈঠকে দুই দেশের পারস্পরিক সহযোগিতা, জনগণের স্বার্থ, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং ভবিষ্যতে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও কার্যকর করার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
বাংলাদেশ ও ভারত দক্ষিণ এশিয়ার দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী রাষ্ট্র। দীর্ঘ স্থলসীমান্ত, অভিন্ন নদী, বাণিজ্যিক সম্পর্ক, সাংস্কৃতিক যোগাযোগ এবং মানুষের পারস্পরিক যাতায়াতের কারণে দুই দেশের সম্পর্ক বহুমাত্রিক। একই সঙ্গে সীমান্ত, পানি, বাণিজ্য ভারসাম্য, রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং বিভিন্ন জাতীয় স্বার্থকে কেন্দ্র করে সময়ে সময়ে মতপার্থক্যও দেখা দিয়েছে।
এই বাস্তবতার মধ্যেই ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ ও ভারতের সামনে বিভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জ থাকবেই। তবে চ্যালেঞ্জ থাকা মানেই সম্পর্ক থেমে যাবে—এমনটি নয়। বরং পারস্পরিক বোঝাপড়া, আলোচনা এবং সহযোগিতার মাধ্যমে জটিল বিষয়গুলোর সমাধানের পথ তৈরি করতে হবে।
তিনি বলেন, অতীতকে অস্বীকার করা সম্ভব নয়, আবার অতীতের মধ্যেই আটকে থাকাও কোনো দেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদে কল্যাণকর নয়। দুই দেশের জনগণের উন্নয়ন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়ে নতুন সম্ভাবনার দিকে এগিয়ে যেতে হবে।
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ভারতীয় হাইকমিশনার প্রতিবেশী দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে মন্তব্য না করার নীতির কথাও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, একটি দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে অন্য দেশের প্রতিনিধি বা কূটনীতিকের মন্তব্য করা সমীচীন নয়।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, একটি দেশের জনগণ এবং নির্বাচিত সরকারই নিজেদের দেশের প্রয়োজন, অগ্রাধিকার ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত নিতে পারে। কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে পারস্পরিক সম্মান ও সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ বলেও তিনি ইঙ্গিত দেন।
বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের আলোচনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো দুই দেশের সাধারণ মানুষের স্বার্থ। সীমান্তের দুই পাশে বসবাসকারী মানুষের জীবনযাত্রা, ব্যবসা-বাণিজ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা, যোগাযোগ এবং কর্মসংস্থানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের নানা সিদ্ধান্ত প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িয়ে থাকে।
দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, দুই দেশের সরকার যে সিদ্ধান্তই নেয় না কেন, তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জীবনে গিয়ে পড়ে। তাই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে এমন সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন, যা জনগণের জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে।
বৈঠকে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বাণিজ্য সম্প্রসারণের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম চললেও বাণিজ্য সম্পর্ককে আরও বিস্তৃত করার সুযোগ রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সীমান্তবর্তী বন্দরগুলোর কার্যকারিতা বৃদ্ধি, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন এবং ব্যবসায়িক জটিলতা কমানো গেলে উভয় দেশের অর্থনীতিই উপকৃত হতে পারে।
সম্ভাব্য মুক্ত বাণিজ্য ব্যবস্থা বা বাণিজ্য সহযোগিতা আরও শক্তিশালী করার বিষয়েও ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। ব্যবসায়িক সম্পর্ক উন্নত হলে শুধু বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান নয়, সীমান্তবর্তী অঞ্চলের ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরাও নতুন সুযোগ পেতে পারেন।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার গুরুত্ব এবং স্থানীয় পর্যায়ে উন্নয়ন কার্যক্রম নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। স্থানীয় সরকার শক্তিশালী হলে জনগণের কাছে সরকারি সেবা দ্রুত পৌঁছানো সম্ভব হয়। স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে নাগরিকদের চাহিদা ও উন্নয়ন অগ্রাধিকার নির্ধারণেও একটি কার্যকর স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বৈঠক শেষে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, ভারতীয় প্রতিনিধি একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ হওয়ায় উভয় পক্ষের মধ্যে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ হয়েছে। পারস্পরিক সম্পর্কের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা ফলপ্রসূ হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়েও আলোচনায় বিষয়টি উঠে আসে। বাংলাদেশ সরকার অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য পরিবেশে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের বিষয়ে অঙ্গীকারবদ্ধ—এ তথ্য ভারতীয় প্রতিনিধিকে জানানো হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে পারস্পরিক আস্থা, সম্মান এবং জাতীয় স্বার্থের ভারসাম্য রক্ষার ওপর। দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও তা আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের সক্ষমতা গড়ে তোলা জরুরি।
বাংলাদেশের জনগণের প্রত্যাশা হলো, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক এমন হবে যেখানে জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন থাকবে, একই সঙ্গে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বাণিজ্য, যোগাযোগ এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার নতুন সুযোগ তৈরি হবে।
ভারতের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী। ভৌগোলিক অবস্থান, আঞ্চলিক যোগাযোগ এবং অর্থনৈতিক সম্ভাবনার কারণে দুই দেশের সহযোগিতার ক্ষেত্র আরও বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
তবে সম্পর্কের ইতিবাচক সম্ভাবনার পাশাপাশি বাস্তব সমস্যাগুলোর সমাধানও গুরুত্বপূর্ণ। জনগণের প্রত্যাশা, দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় যেসব জটিল বিষয় রয়েছে সেগুলো পারস্পরিক সম্মান ও সমতার ভিত্তিতে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
দীনেশ ত্রিবেদীর বক্তব্যের মূল বার্তা ছিল ভবিষ্যতমুখী সম্পর্কের প্রয়োজনীয়তা। অতীতের শিক্ষা থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন বাস্তবতায় এগিয়ে যাওয়ার মধ্যেই দুই দেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক তাই শুধু সরকার থেকে সরকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এই সম্পর্কের সঙ্গে জড়িয়ে আছে কোটি কোটি মানুষের জীবন, অর্থনীতি, সংস্কৃতি এবং ভবিষ্যৎ। পারস্পরিক চ্যালেঞ্জ ও মতপার্থক্যের মধ্যেও যদি দুই দেশ আলোচনার পথ ধরে এগিয়ে যেতে পারে, তাহলে দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সহযোগিতায় নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলতে পারে।
ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার এই বার্তা দুই দেশের কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, পারস্পরিক স্বার্থ ও জনগণের কল্যাণকে সামনে রেখে বাংলাদেশ ও ভারত কতটা কার্যকরভাবে সহযোগিতার নতুন অধ্যায় তৈরি করতে পারে।


