প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার সীমান্তবর্তী দুর্গম বোবারথল এলাকায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে ১ হাজার ৭৭০ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট জব্দ করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। এ সময় মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে দুই ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে। বিজিবির দাবি, জব্দ করা ইয়াবার আনুমানিক বাজারমূল্য ৫ লাখ ৩৩ হাজার ৫০০ টাকা।
সোমবার (৩১ আগস্ট) বিকেলে বড়লেখার দক্ষিণ শাহবাজপুর ইউনিয়নের গান্ধাই সীমান্ত এলাকায় গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালানো হয়। বিজিবি জানিয়েছে, সীমান্তপথ ব্যবহার করে ইয়াবার একটি চালান বাংলাদেশের ভেতরে আনার চেষ্টা চলছে—এমন তথ্য পাওয়ার পর বোবারথল বিওপির দায়িত্বপূর্ণ এলাকায় বিশেষ নজরদারি ও অভিযান পরিচালনা করা হয়।
আটক দুজন হলেন বড়লেখা উপজেলার দক্ষিণ শাহবাজপুর ইউনিয়নের গান্ধাই গ্রামের মো. আব্দুল কাদির ও ইমরান হোসেন। তাদের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা দায়েরের পর আইনগত প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
সীমান্তবর্তী দুর্গম এলাকাগুলো দীর্ঘদিন ধরেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য বিশেষ চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত। পাহাড়ি ও প্রত্যন্ত পথ, সীমান্তের বিস্তৃত এলাকা এবং স্থানীয় যোগাযোগব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার সুযোগ নিয়ে বিভিন্ন সময় চোরাকারবারিরা অবৈধ পণ্য ও মাদক পাচারের চেষ্টা করে থাকে। এ ধরনের অপরাধ ঠেকাতে বিজিবি নিয়মিত টহল ও নজরদারি চালিয়ে আসছে।
বিজিবি সূত্রে জানা গেছে, সোমবার বিকেলে তাদের কাছে তথ্য আসে যে, কয়েকজন চোরাকারবারি বোবারথল এলাকার দুর্গম গান্ধাই সীমান্ত দিয়ে মাদকের একটি বড় চালান নিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা করছে। খবর পাওয়ার পর দ্রুত ওই এলাকায় বিশেষ অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
অভিযান চলাকালে বিজিবির টহল দলের উপস্থিতি টের পেয়ে সন্দেহভাজন কয়েকজন ব্যক্তি পালানোর চেষ্টা করে বলে জানিয়েছে বিজিবি। তবে টহলরত সদস্যরা ধাওয়া দিয়ে দুজনকে আটক করতে সক্ষম হন। পরে তাদের দেহ তল্লাশি চালিয়ে ১ হাজার ৭৭০ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়।
বিজিবির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, উদ্ধার করা ইয়াবার আনুমানিক বাজারমূল্য ৫ লাখ ৩৩ হাজার ৫০০ টাকা। তবে তদন্তের মাধ্যমে মাদকের এই চালান কোথা থেকে এসেছে, কার কাছে পৌঁছানোর কথা ছিল এবং এর সঙ্গে আরও কোনো ব্যক্তি বা চক্র জড়িত রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে।
বিজিবি-৫২ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আতাউর রহমান সুজন জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বড়লেখার গান্ধাই সীমান্ত এলাকায় বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানে ১ হাজার ৭৭০ পিস ইয়াবাসহ দুইজনকে আটক করা সম্ভব হয়েছে।
তিনি জানান, সীমান্ত এলাকায় মাদক ও অন্যান্য অবৈধ পণ্য পাচার রোধে বিজিবির অভিযান অব্যাহত রয়েছে। সীমান্তের গুরুত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে নিয়মিত টহল জোরদারের পাশাপাশি গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে বিশেষ অভিযানও পরিচালনা করা হচ্ছে।
আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য রাতেই জব্দ করা ইয়াবাসহ তাদের বড়লেখা থানায় হস্তান্তর করা হয়।
বড়লেখা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান খান জানান, বিজিবি ইয়াবাসহ আটক দুই ব্যক্তিকে থানায় সোপর্দ করেছে। তাদের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা দায়ের করা হয়েছে।
মাদক পাচারের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান চললেও সীমান্তপথে মাদক প্রবেশের চেষ্টা পুরোপুরি বন্ধ করা এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে ইয়াবার মতো মাদক দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ার আগে সীমান্তেই চালান আটক করা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মাদকের বিস্তার শুধু আইনশৃঙ্খলার জন্য নয়, সামাজিক ও পারিবারিক জীবনেও গভীর সংকট তৈরি করে। তরুণ সমাজের একটি অংশ মাদকাসক্তির ঝুঁকিতে পড়লে তার প্রভাব পরিবার থেকে শুরু করে শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক সামাজিক নিরাপত্তার ওপর পড়ে। এ কারণে মাদক পাচার বন্ধে সীমান্ত নিরাপত্তার পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা ও আইন প্রয়োগের কার্যকর সমন্বয়ের প্রয়োজন রয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, সীমান্তবর্তী প্রত্যন্ত এলাকাগুলোতে নজরদারি আরও শক্তিশালী করা গেলে চোরাকারবারিদের চলাচল সীমিত করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে সীমান্ত এলাকার মানুষকে সচেতন করা এবং সন্দেহজনক কর্মকাণ্ডের তথ্য দ্রুত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানোর সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন।
বড়লেখার বোবারথল ও গান্ধাইয়ের মতো দুর্গম সীমান্ত এলাকায় অভিযান পরিচালনা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য সহজ নয়। প্রতিকূল যোগাযোগব্যবস্থা এবং বিস্তৃত সীমান্ত এলাকার কারণে প্রতিটি পথ ও প্রবেশপথে সার্বক্ষণিক নজরদারি নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। তবু গোয়েন্দা তথ্য ও নিয়মিত টহলের মাধ্যমে মাদক পাচারকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে বিজিবি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি চালান জব্দ হওয়া মাদকবিরোধী অভিযানের গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হলেও এর পেছনে থাকা পুরো নেটওয়ার্ক চিহ্নিত করা আরও জরুরি। উদ্ধার হওয়া মাদক কোথা থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে এবং দেশের অভ্যন্তরে কার কাছে পৌঁছানোর পরিকল্পনা ছিল, তা তদন্তের মাধ্যমে বেরিয়ে এলে বড় কোনো চক্রের সন্ধান মিলতে পারে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানানো হয়েছে। বিজিবি ও পুলিশ জানিয়েছে, সীমান্ত ব্যবহার করে যারা মাদক পাচারের চেষ্টা করবে, তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বড়লেখা সীমান্তে সর্বশেষ এই অভিযানে ইয়াবাসহ দুইজনকে আটকের ঘটনায় স্থানীয় পর্যায়েও আলোচনা তৈরি হয়েছে। সীমান্ত দিয়ে মাদক পাচার প্রতিরোধে নিয়মিত অভিযান আরও জোরদার করার দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহলের প্রতিনিধিরা।
বর্তমানে আটক দুই ব্যক্তির বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার তদন্ত চলছে। তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মাদক চালানের সঙ্গে জড়িত অন্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
সীমান্তে মাদকবিরোধী অভিযান অব্যাহত রেখে পাচারচক্রের পুরো নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। বড়লেখার গান্ধাই সীমান্তে ১ হাজার ৭৭০ পিস ইয়াবা জব্দের এই ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিল, সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদারের পাশাপাশি মাদকের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র ও সমাজের সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তোলা কতটা জরুরি।


