প্রকাশ: ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
বাংলাদেশে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা এবং তথাকথিত মব সংস্কৃতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেছেন, দেশে যে ধরনের মব সংস্কৃতি ও জনতার হাতে বিচার করার অপসংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল, তা রোধে সরকার সজাগ রয়েছে এবং এ ধরনের কর্মকাণ্ড কঠোরভাবে দমন করা হবে।
মঙ্গলবার দুপুরে সিলেটের বিজিবি সেক্টর সদর দপ্তরে ‘সীমান্ত স্কুল অব সারভেইলেন্স অ্যান্ড ড্রোন ওয়ারফেয়ার’-এর উদ্বোধন এবং আধুনিক ড্রোন প্রযুক্তির প্রদর্শনী শেষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় সীমান্ত নিরাপত্তা, আন্তসীমান্ত অপরাধ, মাদক চোরাচালান এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে সরকারের পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, একটি সভ্য ও আইনের শাসনভিত্তিক রাষ্ট্রে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সুযোগ নেই। অপরাধের অভিযোগ থাকলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী তদন্ত ও বিচার হবে। জনতার চাপ, উত্তেজনা বা সংঘবদ্ধ শক্তির মাধ্যমে কাউকে শাস্তি দেওয়ার প্রবণতা সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য বিপজ্জনক বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সরকার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে। মব তৈরি করে ভয়ভীতি সৃষ্টি, হামলা, ভাঙচুর কিংবা কোনো ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে সংঘবদ্ধ সহিংসতার মতো কর্মকাণ্ড বরদাশত করা হবে না। জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
দেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন ঘটনায় জনতার সংঘবদ্ধ আচরণ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তথ্য, গুজব বা উত্তেজনাকর প্রচারণার কারণে অনেক সময় পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। এমন বাস্তবতায় মব সংস্কৃতির বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থানের কথা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে আবারও স্পষ্ট হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে সীমান্ত নিরাপত্তার বিষয়েও গুরুত্বারোপ করেন সালাহউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, বর্তমান সময়ের অপরাধ মোকাবিলায় শুধু প্রচলিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ, সীমান্তপথে চোরাচালান এবং আন্তসীমান্ত অপরাধ প্রতিরোধে আধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো প্রয়োজন। এ লক্ষ্যেই সরকার বিভিন্ন ধরনের উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
তিনি বলেন, সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নজরদারি ব্যবস্থা আরও আধুনিক করা হচ্ছে। সীমান্তের দুর্গম ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হলে অপরাধীদের গতিবিধি শনাক্ত করা এবং দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হবে। বিশেষ করে ড্রোন প্রযুক্তি সীমান্ত নজরদারিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সিলেটে ‘সীমান্ত স্কুল অব সারভেইলেন্স অ্যান্ড ড্রোন ওয়ারফেয়ার’-এর উদ্বোধনকে আধুনিক সীমান্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নিরাপত্তা ও নজরদারি কার্যক্রমে ড্রোনের ব্যবহার বাড়ছে। সীমান্ত এলাকায় মানুষের পক্ষে সব সময় সরাসরি নজরদারি চালানো সম্ভব না হলেও আকাশপথে প্রযুক্তিনির্ভর পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে বড় এলাকা পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আগামী দুই বছরের মধ্যে বিশ্বের উন্নত প্রযুক্তির ড্রোন দেশে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। এসব প্রযুক্তি ব্যবহার করে সীমান্ত এলাকায় চোরাকারবারি ও মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
বাংলাদেশের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় মাদক ও পণ্য চোরাচালান দীর্ঘদিনের একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সীমান্তের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য, দুর্গম এলাকা এবং অপরাধীদের পরিবর্তিত কৌশলের কারণে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে প্রায়ই নতুন নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়। আধুনিক নজরদারি প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে এসব অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি বলেন, সীমান্ত এলাকায় অপরাধ নিয়ন্ত্রণে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের সক্ষমতা আরও বাড়ানো হচ্ছে। বিজিবিকে আধুনিকায়নের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এবং প্রযুক্তিগত সুবিধাও সম্প্রসারণ করা হবে। সীমান্ত নিরাপত্তা শুধু চোরাচালান রোধের বিষয় নয়; এটি দেশের সামগ্রিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গেও জড়িত।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণের বিষয়েও সরকার আরও কঠোর আইন ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নিচ্ছে বলে জানান সালাহউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, মাদকের বিস্তার শুধু আইন-শৃঙ্খলার সমস্যা নয়, এটি একটি সামাজিক সংকট। মাদক তরুণ সমাজকে বিপথে নিতে পারে এবং পরিবার ও সমাজে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করে। এ কারণে মাদক চোরাচালান ও ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তিনি জানান, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন আরও শক্তিশালী করার বিষয়েও কাজ চলছে। অপরাধীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে আইন, তদন্ত ও প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন বলে মনে করছে সরকার।
সীমান্তে অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণে মালখানা ও হাজতখানার সংখ্যা বাড়ানোর কথাও উল্লেখ করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সীমান্ত এলাকায় আইন প্রয়োগ ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত সক্ষমতা বৃদ্ধি করা হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি সীমান্ত নিরাপত্তায় মানবসম্পদ, গোয়েন্দা তথ্য এবং স্থানীয় জনগণের সহযোগিতাও গুরুত্বপূর্ণ। শুধু প্রযুক্তির ওপর নির্ভর না করে সমন্বিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে চোরাচালান, মাদক ব্যবসা এবং অন্যান্য আন্তসীমান্ত অপরাধ মোকাবিলায় আরও ভালো ফল পাওয়া সম্ভব।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সিলেট সফরকে কেন্দ্র করে জেলার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিও গুরুত্ব পাচ্ছে। সফরসূচি অনুযায়ী, তিনি বিকেলে সিলেট সার্কিট হাউজে জেলা প্রশাসন এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে একটি বিশেষ পর্যালোচনা সভায় অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।
ওই সভায় সিলেট জেলার সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ এবং উন্নয়নসংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা। স্থানীয় প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময়ের মাধ্যমে মাঠপর্যায়ের সমস্যা ও করণীয় সম্পর্কে ধারণা নেওয়া হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
সিলেট দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সীমান্তবর্তী অঞ্চল হওয়ায় এখানকার নিরাপত্তা ব্যবস্থার গুরুত্বও বিশেষভাবে বিবেচিত হয়। সীমান্তপথে অবৈধ পণ্য ও মাদক পাচার প্রতিরোধ, চোরাচালান নিয়ন্ত্রণ এবং স্থানীয় পর্যায়ে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা প্রশাসনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
সিলেট সফরের আরেকটি কর্মসূচিতে বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর। সিলেট জেলা বিএনপির উদ্যোগে জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে এ আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে।
তবে দিনের কর্মসূচিতে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে সীমান্ত নিরাপত্তা ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে সরকারের পরিকল্পনা। বিশেষ করে ড্রোন প্রযুক্তির মাধ্যমে নজরদারি বাড়ানোর উদ্যোগ ভবিষ্যতে সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
একই সঙ্গে মব সংস্কৃতির বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থানের ঘোষণা দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যাতে আইন নিজের হাতে তুলে নিতে না পারে এবং অপরাধের বিচার কেবল আইন ও আদালতের মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়, সে লক্ষ্যেই সরকারের অবস্থান আরও কঠোর হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
সালাহউদ্দিন আহমেদের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, সরকার একদিকে প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়, অন্যদিকে সমাজে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতাও বন্ধ করতে চায়। মব সংস্কৃতি দমন, মাদক নিয়ন্ত্রণ এবং সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদারে সরকারের এসব উদ্যোগ কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়, সেদিকেই এখন নজর থাকবে দেশবাসীর।


