প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন
বাংলাদেশের মানুষ ইতিহাসের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁকে গণতন্ত্র, অধিকার ও সুশাসনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে এবং কখনোই স্বৈরাচারী শাসনকে সমর্থন করেনি বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, এ দেশের জনগণ চিরকাল গণতন্ত্রকামী। নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের সংগ্রামে তারা বারবার ত্যাগ স্বীকার করেছে।
সোমবার জাতীয় সংসদ ভবনে স্পিকারের কার্যালয়ে ইন্টার-পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের (আইপিইউ) মহাসচিব মিজ অ্যান্ডা ফিলিপের নেতৃত্বাধীন একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎকালে তিনি এসব কথা বলেন। বৈঠকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস, গণতান্ত্রিক রূপান্তর, সংসদীয় ব্যবস্থার কার্যকারিতা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভূমিকা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
স্পিকার বলেন, বাংলাদেশের জনগণের রাজনৈতিক ইতিহাস মূলত অধিকার আদায়ের ইতিহাস। এই দেশের মানুষ গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার জন্য দীর্ঘ সংগ্রাম করেছে এবং প্রয়োজন হলে জীবন দিতেও পিছপা হয়নি। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ ছিল বাঙালির অধিকার, মর্যাদা ও আত্মনিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সর্বোচ্চ সংগ্রাম। সেই সংগ্রামে লাখো মানুষের আত্মত্যাগ বাংলাদেশের জনগণের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের প্রতি গভীর আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন।
তিনি বলেন, ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ কখনো কোনো স্বৈরাচারী শাসনকে স্থায়ীভাবে গ্রহণ করেনি। বিভিন্ন সময়ে গণতান্ত্রিক অধিকার সীমিত করার চেষ্টা হলেও জনগণ আন্দোলন ও সংগ্রামের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে সাধারণ মানুষের এই ভূমিকা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক চেতনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, একটি দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো শুধু নির্বাচনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। গণতন্ত্রকে কার্যকর করতে হলে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, জবাবদিহিমূলক প্রশাসন, আইনের শাসন এবং জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সংসদকে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রকৃত প্রতিফলন ঘটাতে হলে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এই নির্বাচন দেশের ইতিহাসের অন্যতম অবাধ, নিরপেক্ষ ও প্রতিযোগিতাপূর্ণ নির্বাচন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ তাদের প্রতিনিধি নির্বাচনের সুযোগ পেয়েছে এবং বর্তমান সংসদ জনগণের গণতান্ত্রিক প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটিয়ে দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করছে।
স্পিকারের মতে, একটি কার্যকর সংসদ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। সংসদ শুধু আইন প্রণয়নের প্রতিষ্ঠান নয়, এটি সরকারের কার্যক্রমের ওপর নজরদারি, জনস্বার্থের বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা এবং রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। জনগণের আস্থা ধরে রাখতে সংসদকে আরও কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক হতে হবে।
বৈঠকে আইপিইউ মহাসচিব মিজ অ্যান্ডা ফিলিপ বাংলাদেশের বর্তমান গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতার প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও শক্তিশালী করার মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণের সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকে টেকসই করতে প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হবে।
তিনি বলেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে বর্তমান প্রজন্মের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়বদ্ধতা রয়েছে। শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা এবং কার্যকর সংসদীয় ব্যবস্থা নিশ্চিত করার মাধ্যমেই সেই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা সম্ভব। জনগণের আস্থা অর্জন ও ধরে রাখতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং কার্যকারিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আইপিইউ মহাসচিব আরও আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, একটি শক্তিশালী ও কার্যকর সংসদীয় ব্যবস্থা সাধারণ মানুষের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করতে পারে। জনগণ যখন দেখতে পায় যে তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা সংসদে তাদের সমস্যা, প্রত্যাশা ও উদ্বেগের কথা তুলে ধরছেন, তখন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি আস্থা বাড়ে।
বৈঠকে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভূমিকা নিয়েও আলোচনা হয়। উভয়পক্ষ জাতিসংঘের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠন এবং সাধারণ পরিষদে বাংলাদেশের ইতিবাচক ও সক্রিয় ভূমিকার বিষয়টি তুলে ধরে। আন্তর্জাতিক শান্তি, নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, মানবাধিকার এবং টেকসই উন্নয়নসহ বিভিন্ন বৈশ্বিক ইস্যুতে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নিয়ে আলোচনা করা হয়।
বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা সংক্রান্ত বিরোধ আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমে সফলভাবে নিষ্পত্তির বিষয়টিও আলোচনায় গুরুত্ব পায়। এই সাফল্য আন্তর্জাতিক আইন ও শান্তিপূর্ণ বিরোধ নিষ্পত্তির প্রতি বাংলাদেশের অঙ্গীকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়। আলোচনায় বলা হয়, আন্তর্জাতিক বিরোধ সমাধানে সংলাপ, আইন এবং বহুপক্ষীয় সহযোগিতার ভূমিকা ভবিষ্যতেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে।
সংসদীয় কূটনীতির গুরুত্ব নিয়েও বৈঠকে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়। বর্তমান বিশ্বে রাষ্ট্রীয় কূটনীতির পাশাপাশি সংসদীয় প্রতিনিধিদের পারস্পরিক যোগাযোগ আন্তর্জাতিক সম্পর্ক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিভিন্ন দেশের সংসদ সদস্যদের মধ্যে অভিজ্ঞতা বিনিময়, নীতি নিয়ে আলোচনা এবং আন্তর্জাতিক সমস্যার সমাধানে সহযোগিতা বাড়াতে আইপিইউ একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করছে।
বাংলাদেশের সংসদও আন্তর্জাতিক সংসদীয় কার্যক্রমে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়। বৈঠকে অংশগ্রহণকারীরা মনে করেন, সংসদীয় কূটনীতির মাধ্যমে দেশের জাতীয় স্বার্থ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও কার্যকরভাবে তুলে ধরা সম্ভব।
গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনায় স্পিকার বলেন, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে শক্তিশালী করতে জনগণের অংশগ্রহণের কোনো বিকল্প নেই। দেশের তরুণ প্রজন্মকে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ সম্পর্কে সচেতন করে তোলা এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনে দায়িত্বশীল অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করা জরুরি।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাস প্রমাণ করে যে জনগণ তাদের অধিকার ও মর্যাদার প্রশ্নে কখনো নীরব থাকেনি। স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে শুরু করে বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলন পর্যন্ত প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সাধারণ মানুষই পরিবর্তনের প্রধান শক্তি হিসেবে ভূমিকা রেখেছে। এই ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতেও দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার শক্তি হয়ে থাকবে।
বৈঠকে জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল, চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম, আইপিইউ প্রতিনিধি দলের সদস্যরা এবং সংসদ সচিবালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
আইপিইউ মহাসচিবের নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধি দলের এই সফরকে বাংলাদেশের সংসদীয় কূটনীতির ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বৈঠকে গণতন্ত্র, সংসদীয় সংস্কার, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং জনগণের প্রতি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের দায়বদ্ধতার বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে উঠে আসে।
বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রা নিয়ে আলোচনার মধ্য দিয়ে বৈঠকে একটি বিষয় বিশেষভাবে সামনে আসে—গণতন্ত্রকে শুধু রাজনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না; এটি মানুষের অধিকার, মতপ্রকাশের সুযোগ, জবাবদিহি এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। এই মূল্যবোধগুলো শক্তিশালী করতে পারলেই জনগণের আস্থা আরও দৃঢ় হবে এবং দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘমেয়াদে আরও কার্যকর হয়ে উঠবে।
স্পিকারের বক্তব্যে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সেই দীর্ঘ সংগ্রামের কথাই আবারও উঠে এসেছে, যেখানে জনগণের আকাঙ্ক্ষার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল অধিকার, স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র। তাঁর ভাষায়, বাংলাদেশের মানুষ কখনো স্বৈরাচারকে সমর্থন করেনি—আর এই ঐতিহাসিক চেতনা দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নির্মাণেও গুরুত্বপূর্ণ পথনির্দেশনা হয়ে থাকবে।

