প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত মাওলানা আবুল কালাম আযাদ ওরফে বাচ্চু রাজাকারের আপিল গ্রহণযোগ্য কি না, সে বিষয়ে আগামী ৭ সেপ্টেম্বর আদেশ দেবেন আপিল বিভাগ। দীর্ঘ সময় পর তার করা আপিল আইনগতভাবে গ্রহণ করা যাবে কি না, সেটিই এখন মামলাটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।
সোমবার (৩১ আগস্ট) আপিল বিভাগের বিচারপতি মো. রেজাউল হকের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ এ বিষয়ে শুনানি শেষে আদেশের জন্য ৭ সেপ্টেম্বর দিন নির্ধারণ করেন। আদালতের সামনে মূল প্রশ্ন ছিল, মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণার প্রায় ৪ হাজার ৯১৫ দিন পর আবুল কালাম আযাদ আপিল করার সুযোগ পাবেন কি না।
এই সিদ্ধান্ত শুধু একটি ব্যক্তির আপিলের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে না, বরং দীর্ঘ সময় পর আত্মসমর্পণ, সাজা স্থগিত এবং আপিলের সুযোগের মতো গুরুত্বপূর্ণ আইনগত বিষয়ও আলোচনায় এনেছে।
আদালতে আবুল কালাম আযাদের আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন সিনিয়র আইনজীবী এহসান এ সিদ্দিক। অন্যদিকে প্রসিকিউশনের পক্ষে ছিলেন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। শুনানি শেষে আদালত তাৎক্ষণিক কোনো সিদ্ধান্ত না দিয়ে বিষয়টি নিয়ে আদেশের জন্য ৭ সেপ্টেম্বর নির্ধারণ করেন।
আবুল কালাম আযাদের করা আবেদনে আপিল দায়েরে বিলম্ব মার্জনার আবেদন করা হয়েছে। একই সঙ্গে আপিলের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তার মৃত্যুদণ্ডের সাজা স্থগিত রাখার আবেদনও জানানো হয়েছে।
মামলাটির পটভূমি ফিরে যায় মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে। ফরিদপুরের বিভিন্ন এলাকায় ১৯৭১ সালে সংঘটিত একাধিক মানবতাবিরোধী অপরাধের ঘটনায় তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার চলাকালে তিনি পলাতক ছিলেন।
২০১৩ সালের ২১ জানুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৪১ বছর পর মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় এটিই ছিল প্রথম রায়। সেই কারণে মামলাটি দেশের যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রক্রিয়ার ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
তবে রায় ঘোষণার সময় তিনি আদালতের হেফাজতে ছিলেন না। দীর্ঘদিন পলাতক থাকার পর চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আত্মসমর্পণ করেন। আত্মসমর্পণের পর তার আপিলের পথ খুলতে প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।
সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের বক্তব্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির কাছে করা আবেদনের পর বিশেষ শর্তে তার সাজা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য স্থগিত করা হয়েছিল। শর্ত ছিল, তিনি আত্মসমর্পণ করে আইন অনুযায়ী আপিল করবেন। সেই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আত্মসমর্পণ করেন।
আত্মসমর্পণের পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ তার আপিলের জন্য প্রয়োজনীয় নথিপত্র সরবরাহের নির্দেশ দেয়। এরপর তিনি আপিল দায়ের করেন এবং বিলম্বের বিষয়টি মার্জনা করার আবেদন জানান।
২১ জানুয়ারি আদালতে আত্মসমর্পণের সময় আবুল কালাম আযাদের পক্ষে আইনজীবী মশিউল আলম বিষয়টি ব্যাখ্যা করেন। তিনি জানান, ২০১৩ সালে মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণার পর দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হয়েছে। রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদনের প্রেক্ষাপটে সাজা সাময়িকভাবে স্থগিত হওয়ার পর আত্মসমর্পণ এবং আপিল করার সুযোগ তৈরি হয়।
বর্তমান পর্যায়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, দীর্ঘ প্রায় ১৩ বছরের বেশি সময় পর করা এই আপিল আদালত গ্রহণ করবেন কি না। সাধারণভাবে আপিল করার ক্ষেত্রে নির্ধারিত সময়সীমা থাকে। নির্ধারিত সময় অতিক্রম হলে বিলম্বের কারণ ব্যাখ্যা করে আদালতের কাছে সেই বিলম্ব মার্জনার আবেদন করতে হয়।
এ ক্ষেত্রে আবুল কালাম আযাদের মৃত্যুদণ্ডের রায়ের পর ৪ হাজার ৯১৫ দিন পার হওয়ার বিষয়টি আদালতের বিবেচনায় এসেছে। তাই আপিলের মূল যুক্তি ও অভিযোগের বিষয়ে শুনানিতে যাওয়ার আগে আপিলটি আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য কি না, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত প্রয়োজন।
আগামী ৭ সেপ্টেম্বর আপিল বিভাগের আদেশে বিষয়টির পরবর্তী পথ নির্ধারিত হবে। আদালত যদি আপিল গ্রহণযোগ্য বলে মনে করেন, তাহলে মামলাটির মূল আপিলের বিষয়ে পরবর্তী শুনানির পথ তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে আপিল গ্রহণযোগ্য না হলে বর্তমান আবেদনের ভবিষ্যৎ ভিন্ন দিকে মোড় নিতে পারে।
মামলাটি আবারও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার এবং দীর্ঘদিন পর আইনি প্রক্রিয়ায় ফিরে আসার প্রশ্নকে সামনে এনেছে। স্বাধীনতার সময় সংঘটিত অপরাধের বিচারকে ঘিরে বাংলাদেশের ইতিহাসে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ভূমিকা দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয়।
আবুল কালাম আযাদের মামলাটি বিশেষভাবে আলোচিত হওয়ার আরেকটি কারণ হলো, ২০১৩ সালে ঘোষিত রায়ের সময় তিনি পলাতক ছিলেন। ফলে রায়ের পর নিয়মিত আপিল প্রক্রিয়ায় তার অংশগ্রহণ হয়নি। দীর্ঘ সময় পর আত্মসমর্পণের মাধ্যমে তিনি আবার বিচারিক প্রক্রিয়ার আওতায় আসেন।
এখন আদালতের সামনে প্রশ্ন শুধু আপিলের সময়সীমা নয়; বরং আত্মসমর্পণের পর রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত, সাজা স্থগিতের প্রেক্ষাপট এবং বিলম্বের ব্যাখ্যা বিবেচনা করে আপিলের সুযোগ দেওয়া হবে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
আইনজীবী ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর যুক্তিতর্ক শুনে আপিল বিভাগ আগামী ৭ সেপ্টেম্বর আদেশ দেবেন। ওই আদেশের দিকেই এখন নজর থাকবে আইনজীবী, প্রসিকিউশন এবং মামলাটির সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের।
দীর্ঘ ৪ হাজার ৯১৫ দিন পর করা এই আপিলের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে আদালতের সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসের একটি আলোচিত মামলার পরবর্তী অধ্যায় নির্ধারণ করবে। মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের রায় বহাল থাকবে কি না, সে প্রশ্নে এখনই কোনো সিদ্ধান্ত হচ্ছে না। প্রথম ধাপে নির্ধারণ করা হবে, এত দীর্ঘ সময় পর করা আপিলটি আদালতে গ্রহণ করা যাবে কি না।
৭ সেপ্টেম্বরের আদেশের পরই স্পষ্ট হবে, মাওলানা আবুল কালাম আযাদ ওরফে বাচ্চু রাজাকারের মামলাটি আপিল পর্যায়ে পূর্ণাঙ্গ শুনানির দিকে এগোবে, নাকি আইনি গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্নেই এর পরবর্তী পথ নির্ধারিত হবে।


