প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেট নগরীতে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে কিশোরদের জড়িয়ে পড়া সহিংসতা, ছিনতাই, মাদক, চুরি, মারামারি ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নগরবাসীর মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি বাড়ছে। এরই মধ্যে পুলিশ সদর দপ্তরের সাম্প্রতিক এক তালিকায় রাজধানীর বাইরে দেশের বিভিন্ন মহানগর ও জেলায় সক্রিয় ২২৭টি কিশোর গ্যাংয়ের তথ্য উঠে এসেছে। এসব গ্রুপে সদস্য রয়েছে প্রায় ২ হাজার ৫৫০ জন। তালিকা অনুযায়ী সিলেট মহানগরে সক্রিয় রয়েছে ১৫টি কিশোর গ্যাং।
সিলেটে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতার ভয়াবহতা সাম্প্রতিক একটি হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে আরও স্পষ্ট হয়েছে। গত ২৭ জুলাই ফুটবল খেলা নিয়ে বিরোধের জেরে নগরীর কাজিরবাজার সেতুর ওপর কিশোর রিফাত আহমদকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। নিহত রিফাতের বয়স ছিল মাত্র ১৫ বছর। সে নগরীর খাসদবির এলাকার বাসিন্দা মিফতাহ উদ্দিনের ছেলে এবং স্থানীয় দ্বীপশিখা উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্র ছিল।
একটি ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া বিরোধ কীভাবে প্রাণঘাতী সংঘাতে রূপ নিতে পারে, রিফাতের মৃত্যু তারই নির্মম উদাহরণ। যে বয়সে একজন কিশোরের পড়াশোনা, খেলাধুলা ও স্বাভাবিক সামাজিক বিকাশের মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠার কথা, সেই বয়সেই সহিংসতার শিকার হয়ে তার জীবন থেমে গেছে। একই সঙ্গে এ ঘটনা কিশোরদের হাতে ছুরি বা অন্যান্য অস্ত্রের সহজলভ্যতা এবং ছোটখাটো বিরোধকে কেন্দ্র করে সংঘবদ্ধ সহিংসতার প্রবণতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
শুধু রিফাত হত্যাকাণ্ড নয়, সিলেট নগরীতে সাম্প্রতিক সময়ে কিশোরদের বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ সামনে এসেছে। মাদক সেবন ও বিক্রি, চুরি, ছিনতাই, মারামারি, নারীদের উত্ত্যক্ত করা এবং বিভিন্ন ধরনের সহিংস কর্মকাণ্ডে কিশোরদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে ছোটখাটো বিরোধ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মন্তব্য, খেলাধুলা কিংবা এলাকার আধিপত্যকে কেন্দ্র করে সংঘাত তৈরি হচ্ছে। পরে সেই বিরোধ দলবদ্ধ হামলা বা ছুরিকাঘাতের মতো গুরুতর অপরাধে গড়াচ্ছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানী বাদে দেশের বিভিন্ন মহানগর ও জেলা পর্যায়ে ২২৭টি কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম মহানগরে রয়েছে ৯৮টি, খুলনায় সাতটি, রাজশাহীতে ১৩টি, সিলেটে ১৫টি এবং গাজীপুরে ১৩টি গ্রুপ। জেলা পর্যায়ে সবচেয়ে বেশি কিশোর গ্যাং রয়েছে নোয়াখালীতে, যেখানে ২৫টি গ্রুপের তথ্য পাওয়া গেছে। অন্যদিকে ঢাকা মহানগর পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে কিশোর গ্যাংয়ের ১৫৯টি গ্রুপ রয়েছে।
দেশজুড়ে কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তৃতি নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও উদ্বিগ্ন। পুলিশ সদর দপ্তরের কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, এসব গ্রুপের সদস্যদের একটি অংশ চাঁদাবাজি, মাদকসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। তাদের মধ্যে অনেকের মধ্যে নিজেকে ‘হিরো’ হিসেবে উপস্থাপন করার প্রবণতা কাজ করে। দলবদ্ধতা ও আর্থিক স্বার্থের সঙ্গে এই মানসিকতা যুক্ত হলে কিশোররা দ্রুত সহিংস অপরাধে জড়িয়ে পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সিলেটে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা বন্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছেন সিলেট-১ আসনের সংসদ সদস্য ও বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। নবাগত পুলিশ কমিশনারের সঙ্গে মতবিনিময় সভা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি সিলেটের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নিজের প্রত্যাশার কথা তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, শুধু বর্তমান পরিস্থিতি কেমন আছে, সেটি বিবেচনা করলেই হবে না; বরং সিলেটের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কেমন হওয়া উচিত, সেটিও গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। তাঁর বক্তব্যে মাদক, অনলাইন জুয়া এবং কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা বন্ধের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
এর আগে গত ৮ মার্চ সিলেট জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভাতেও কিশোর গ্যাং ও ছিনতাই নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছিল। সভায় সিলেট-৪ আসনের সংসদ সদস্য এবং প্রবাসীকল্যাণ, বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন। এমনকি অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গিয়ে কোনো ধরনের তদবির এলে তাতেও যেন গুরুত্ব না দেওয়া হয়, সে বিষয়ে কঠোর অবস্থানের কথা জানান তিনি।
তবে পুলিশ সদর দপ্তরের তালিকায় সিলেটে ১৫টি কিশোর গ্যাং থাকার তথ্য সম্পর্কে সিলেট মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি। বিষয়টি নিয়ে মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (গণমাধ্যম) মো. মনজুরুল আলমের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি।
অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও পুলিশের মতে, কিশোর গ্যাং তৈরির পেছনে শুধু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিই দায়ী নয়। এর সঙ্গে পরিবার, শিক্ষা, সামাজিক পরিবেশ এবং কিশোরদের মানসিক বিকাশের মতো বিষয়গুলোও গভীরভাবে জড়িত। অনেক ক্ষেত্রে অভিভাবকদের পর্যাপ্ত নজরদারির অভাব, প্রযুক্তির অপব্যবহার, মূল্যবোধের দুর্বলতা, অসৎ সঙ্গ, নিজেকে অন্যদের তুলনায় শক্তিশালী প্রমাণের প্রবণতা এবং সুস্থ বিনোদনের অভাব কিশোরদের বিপথে ঠেলে দিতে পারে।
বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও কিশোরদের আচরণে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। বিভিন্ন ধরনের সহিংস ভিডিও, অপরাধকে রোমাঞ্চকর হিসেবে উপস্থাপন করা কনটেন্ট এবং ভার্চুয়াল জগতে দলবদ্ধতার সংস্কৃতি অনেক সময় বাস্তব জীবনেও প্রভাব ফেলতে পারে। কোনো কিশোর যখন অপরাধী গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতার পাশাপাশি পারিবারিক ও সামাজিক নিয়ন্ত্রণও দুর্বল হয়ে যেতে পারে।
পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন্স) খোন্দকার রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা চাঁদাবাজি ও মাদকের মতো বিভিন্ন অপরাধে জড়িত। তাদের মধ্যে এক ধরনের ‘হিরোইজম’ দেখানোর প্রবণতা রয়েছে। এর সঙ্গে আর্থিক সংশ্লিষ্টতা যুক্ত হওয়ায় তারা সহজেই সহিংস কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে।
তিনি আরও জানিয়েছেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরবর্তী সময়ে কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা বেড়ে যায়। তবে পুলিশের অভিযান ও আইনি পদক্ষেপের কারণে বর্তমানে পরিস্থিতি অনেকটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে বলেও দাবি করেছেন তিনি। অভিযানের মাধ্যমে অনেককে আইনের আওতায় আনা হয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে।
কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে শুধু অভিযান পরিচালনা করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অপরাধে জড়িয়ে পড়া কিশোরদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি তাদের পুনর্বাসন, কাউন্সেলিং, শিক্ষা ও ইতিবাচক সামাজিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগও প্রয়োজন। কারণ একজন কিশোর অপরাধে জড়িয়ে পড়ার পর তাকে শুধু শাস্তি দেওয়া নয়, ভবিষ্যতে যেন সে আবার অপরাধে না ফেরে, সেই পথও তৈরি করতে হবে।
এ ক্ষেত্রে খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পুলিশ সদর দপ্তরের কর্মকর্তারাও কিশোরদের বিপথগামী হওয়া ঠেকাতে খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। মাঠ, সাংস্কৃতিক সংগঠন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো সক্রিয় হলে কিশোরদের অবসর সময় ইতিবাচক কাজে ব্যবহার করার সুযোগ বাড়তে পারে।
সিলেটের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির শহর হিসেবে পরিচিত এই নগরে কিশোরদের একটি অংশ যদি অপরাধী গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে, তাহলে তা শুধু আইনশৃঙ্খলার জন্য নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও বড় উদ্বেগের কারণ। রিফাতের মতো একজন কিশোরের মৃত্যু দেখিয়ে দিয়েছে, সামান্য বিরোধও কখনো কখনো কত ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
তাই কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান যেমন প্রয়োজন, তেমনি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সামাজিক সংগঠনগুলোকেও সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। কোনো কিশোরের আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে তা উপেক্ষা না করে দ্রুত নজরে আনা, অপরাধী চক্রের সঙ্গে যোগাযোগের প্রাথমিক পর্যায়েই তাকে ফিরিয়ে আনা এবং সুস্থ সামাজিক পরিবেশ তৈরি করা জরুরি।
সিলেটে সক্রিয় ১৫টি কিশোর গ্যাংয়ের তথ্য তাই শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অসংখ্য পরিবারের উদ্বেগ এবং একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎ। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপের পাশাপাশি কিশোরদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ, খেলাধুলার সুযোগ, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং পরিবারভিত্তিক নজরদারি নিশ্চিত করা গেলে এই প্রবণতা অনেকটাই ঠেকানো সম্ভব। এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, অপরাধে জড়িয়ে পড়ার আগেই কিশোরদের পাশে দাঁড়ানো এবং তাদের জন্য এমন একটি সমাজ তৈরি করা, যেখানে হাতে অস্ত্র নয়, বই, খেলাধুলা ও সৃজনশীলতার সুযোগই হবে তাদের পরিচয়ের প্রধান অংশ।


