প্রকাশ: ১৮ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেট নগরীর রায়নগরে ব্যবসায়ী আব্দুস সাত্তার ও তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া বেগমের সঙ্গে গৃহকর্মী তাহমিনা বেগমের হত্যাকাণ্ডের পর তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই সামনে আসছে নতুন নতুন প্রশ্ন। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে নিহত গৃহকর্মী তাহমিনার প্রকৃত বয়স। পরিবারের দাবি, তাহমিনার বয়স ছিল ১২ থেকে ১৩ বছরের মধ্যে। অন্যদিকে পুলিশের সাম্প্রতিক নথিতে তাঁর বয়স ১৮ বছর উল্লেখ করা হয়েছে। এর আগে আবার বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে তাঁর বয়স ১৫ ও ২৫ বছর বলেও তথ্য প্রকাশিত হয়েছিল।
বয়স নিয়ে এই একাধিক তথ্যের কারণে চাঞ্চল্যকর ট্রিপল মার্ডারের তদন্তে নতুন করে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে পুলিশ যখন হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে তাহমিনার সঙ্গে অভিযুক্ত বাবুল মিয়ার সম্পর্কের বিষয়টি সামনে এনেছে, তখন তাঁর প্রকৃত বয়স নির্ধারণ মামলার তদন্ত ও পরবর্তী বিচারিক প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
গত ১২ আগস্ট সিলেট নগরীর রায়নগর মিতালী আবাসিক এলাকার একটি বাসা থেকে আব্দুস সাত্তার, তাঁর স্ত্রী সুরাইয়া বেগম এবং গৃহকর্মী তাহমিনার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। একই ঘটনায় তিনজনের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে নগরজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। তদন্তের শুরু থেকেই পুলিশ হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য কারণ ও ঘটনাপ্রবাহ খতিয়ে দেখতে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করছে। এরই মধ্যে সন্দেহভাজন হিসেবে বাবুল মিয়াকে গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ ও রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে।
তদন্তের প্রাথমিক পর্যায়ে পুলিশ দাবি করে, তাহমিনার সঙ্গে সম্পর্কের জের ধরেই এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়ে থাকতে পারে। তবে নিহত সাত্তার-সুরাইয়া দম্পতির পরিবার পুলিশের এই ব্যাখ্যা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে। তাদের দাবি, হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ উদঘাটনের জন্য তদন্ত আরও গভীরভাবে করা প্রয়োজন। সোমবার আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনেও তারা এ বিষয়ে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেন।
সেই সংবাদ সম্মেলনে তাহমিনার বয়স নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। নিহত দম্পতির ছেলে আরিফ ইফতেখার জানান, তাহমিনার বয়স আনুমানিক ১২ থেকে ১৩ বছর হবে। তাহমিনার বাবা আফতাব মিয়াও একই ধরনের তথ্য দিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, মেয়ের বয়স ১২ থেকে ১৩ বছরের মধ্যে।
কিন্তু পুলিশের নথিতে পাওয়া তথ্যের সঙ্গে পরিবারের বক্তব্যের এই পার্থক্যই এখন তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাবুল মিয়াকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানোর আবেদনে পুলিশ তাহমিনার বয়স ১৮ বছর উল্লেখ করেছে বলে জানা গেছে। অর্থাৎ একই ব্যক্তির বয়স নিয়ে পরিবার এবং পুলিশের নথিতে অন্তত পাঁচ থেকে ছয় বছরের পার্থক্য দেখা যাচ্ছে।
এর আগে হত্যাকাণ্ডের পর স্থানীয় বাসিন্দাদের বরাত দিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে তাহমিনার বয়স ২৫ বছর উল্লেখ করা হয়েছিল। পরে পুলিশের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমকে জানানো হয়, তাঁর বয়স ১৫ বছর। একটি প্রতিবেদনে পরিবারের সদস্যদের বরাত দিয়েও তাহমিনাকে ১৫ বছর বয়সী কিশোরী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। সেখানে বলা হয়েছিল, কোরবানির ঈদের পর তিনি রায়নগরের ওই বাসায় গৃহকর্মী হিসেবে কাজে যোগ দেন।
ফলে তাহমিনার বয়স নিয়ে এখন পর্যন্ত অন্তত চার ধরনের তথ্য সামনে এসেছে—১২ বা ১৩, ১৫, ১৮ এবং ২৫ বছর। এত ভিন্ন তথ্য কীভাবে বিভিন্ন পর্যায়ে সামনে এলো, তার নির্ভুল ব্যাখ্যা এখনো স্পষ্ট নয়। তদন্তকারী সংস্থার কাছে এ বিষয়টি নিশ্চিত করার দায়িত্বও তাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সিলেট কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খান মোহাম্মদ মাঈনুল জাকির জানিয়েছেন, ঘটনার পর স্থানীয়দের কাছ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে যে তথ্য পাওয়া গিয়েছিল, সেটিই প্রাথমিকভাবে উল্লেখ করা হয়েছিল। তদন্ত এখনো চলমান রয়েছে। কোনো তথ্যগত অসঙ্গতি থাকলে পরবর্তী সময়ে তা সংশোধন করা হবে বলেও তিনি জানিয়েছেন।
তবে রিমান্ডে থাকা বাবুল মিয়া হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে নতুন কোনো তথ্য দিয়েছেন কি না—এ বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করতে রাজি হননি ওসি। তিনি জানিয়েছেন, চাঞ্চল্যকর ঘটনা বিবেচনায় পুলিশ ঘটনার শুরুতে কিছু তথ্য জানিয়েছিল। পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শেষ হওয়ার পর বিস্তারিত জানানো হবে।
তদন্তের এই অবস্থায় তাহমিনার বয়সের বিষয়টি কেবল একটি প্রশাসনিক তথ্যের অসঙ্গতি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সম্পর্কের যে অভিযোগ বা সম্ভাব্য কারণের কথা পুলিশ বলছে, সেখানে তাহমিনার বয়সের প্রশ্নটি সরাসরি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তিনি যদি অপ্রাপ্তবয়স্ক হয়ে থাকেন, তাহলে তাঁর সঙ্গে কোনো ধরনের সম্পর্কের অভিযোগের আইনগত ব্যাখ্যা একেবারেই ভিন্ন হতে পারে। আবার বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি প্রমাণিত হলে সেই বিষয়টির আইনগত মূল্যায়নও ভিন্ন হবে।
এ কারণে তদন্তকারীদের জন্য জন্মনিবন্ধন, জাতীয় পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নথি, পারিবারিক রেকর্ড কিংবা বয়স নির্ধারণে গ্রহণযোগ্য অন্যান্য নথি যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে পরিবারের দেওয়া তথ্যের সঙ্গে সরকারি নথির মিল-অমিলও পরীক্ষা করা প্রয়োজন। তদন্তে কোনো বয়স নির্ধারণকারী মেডিকেল পরীক্ষা করা হয়ে থাকলে তার ফলও বিষয়টি পরিষ্কার করতে পারে।
তাহমিনার পরিবারের কাছে বয়সের এই প্রশ্ন আরও সংবেদনশীল। মাত্র কয়েক দিন আগেও যে মেয়েটি একটি পরিবারের বাসায় গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করছিল, এখন তার পরিচয় একটি বহুল আলোচিত হত্যাকাণ্ডের অন্যতম ভুক্তভোগী হিসেবে সামনে এসেছে। তার পরিবার একদিকে মেয়েকে হারানোর শোক বহন করছে, অন্যদিকে হত্যাকাণ্ডের কারণ সম্পর্কে নানা বক্তব্য ও তথ্যের মধ্যে সত্যটি খুঁজে পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।
নিহত আব্দুস সাত্তার ও সুরাইয়া বেগমের পরিবারও দ্রুত এবং নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছে। তাদের বক্তব্য, হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ উদঘাটন না করে কোনো একটি সম্ভাব্য কারণকে চূড়ান্ত হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। বিশেষ করে নিহত তিনজনের পারস্পরিক সম্পর্ক, বাসায় তাদের অবস্থান, ঘটনার সময়কার পরিস্থিতি এবং হত্যাকাণ্ডের আগে ও পরের ঘটনাপ্রবাহ—সবকিছুই তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন বলে তারা মনে করছেন।
অন্যদিকে পুলিশের পক্ষ থেকেও বলা হচ্ছে, তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। ফলে প্রাথমিক পর্যায়ে পাওয়া তথ্যের সঙ্গে পরবর্তী তদন্তে নতুন তথ্য যুক্ত হতে পারে। তদন্ত এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বয়স, সম্পর্ক এবং হত্যাকাণ্ডের উদ্দেশ্য নিয়ে বর্তমানে যে প্রশ্নগুলো রয়েছে, সেগুলোরও উত্তর পাওয়া যেতে পারে।
চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের তদন্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তথ্যের নির্ভুলতা। বিশেষ করে নিহত একজনের বয়স নিয়ে যখন পরিবার, স্থানীয় সূত্র, সংবাদ প্রতিবেদন এবং পুলিশের নথিতে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, তখন কোনো একটি তথ্যকে চূড়ান্ত ধরে নেওয়ার আগে যথাযথ নথি ও প্রমাণের ভিত্তিতে বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি।
তাহমিনার প্রকৃত বয়স নির্ধারণ হলে মামলার অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তরও স্পষ্ট হতে পারে। একই সঙ্গে পুলিশের পক্ষ থেকে হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে যে সম্পর্কের বিষয়টি সামনে এসেছে, সেটিও নতুন করে যাচাই করার সুযোগ তৈরি হবে। কারণ একজন নিহত ব্যক্তির বয়স সম্পর্কে ভুল তথ্য পুরো ঘটনার ব্যাখ্যা ও জনমনে তৈরি হওয়া ধারণাকে প্রভাবিত করতে পারে।
এখন তাই রায়নগরের ট্রিপল মার্ডার মামলায় তদন্তকারীদের সামনে শুধু হত্যাকারী শনাক্ত ও হত্যার কারণ উদঘাটনের প্রশ্নই নয়, নিহত গৃহকর্মী তাহমিনার পরিচয় ও বয়সের সঠিক তথ্য নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পরিবারগুলোর প্রত্যাশা, তদন্ত যেন কোনো পূর্বধারণার ওপর নির্ভর না করে এবং প্রত্যেকটি তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে যাচাই করা হয়। তাহলেই আব্দুস সাত্তার, সুরাইয়া বেগম ও তাহমিনা হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উদঘাটনের পথ আরও পরিষ্কার হবে।


