প্রকাশ: ১৮ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলায় মাত্র ২০ মাস বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে মরম আলী (২৩) নামে এক যুবককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। অভিযোগটি সামনে আসার পর এলাকায় ব্যাপক উদ্বেগ ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। এত অল্প বয়সী একটি শিশুকে ঘিরে এমন গুরুতর অভিযোগের ঘটনায় পরিবার, স্থানীয় বাসিন্দা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে বিষয়টি নিয়ে তীব্র উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নের বাবনগাঁও গ্রামের নিজ বাড়ি থেকে সোমবার দিবাগত রাত সোয়া ১২টার দিকে মরম আলীকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর আগে শিশুটির পরিবারের পক্ষ থেকে ছাতক থানায় মামলা করা হয়। মামলার পরপরই অভিযুক্ত ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারে অভিযান চালায় পুলিশ।
পুলিশ ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, গত রোববার সকাল ১১টার দিকে শিশুটিকে বাড়ির পাশের একটি ঘরে নিয়ে যান মরম আলী। সেখানে শিশুটির ওপর যৌন নির্যাতন করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তার পরিবার। এজাহারে বলা হয়েছে, শিশুটির মা ঘটনাস্থলে গিয়ে বিষয়টি দেখতে পান। তিনি চিৎকার করলে অভিযুক্ত ব্যক্তি সেখান থেকে পালিয়ে যান বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
ঘটনার পর শিশুটিকে দ্রুত ছাতক উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকেরা শিশুটির শরীরে, বিশেষ করে যৌনাঙ্গে আঘাতের চিহ্ন দেখতে পান বলে মামলার সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। পরে উন্নত চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য তাকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) পাঠানো হয়। সেখানে শিশুটিকে ভর্তি করে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
শিশুটির চিকিৎসার পাশাপাশি ঘটনার প্রকৃত কারণ ও অভিযোগের সত্যতা নির্ণয়ে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে ছাতক থানার এসআই মো. সালাউদ্দিন মোল্লাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। শিশুটির পরিবারের অভিযোগ, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য এবং চিকিৎসা-সংক্রান্ত তথ্যসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো তদন্তের আওতায় আনা হচ্ছে।
শিশুটির বাবা বাদী হয়ে সোমবার ছাতক থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ৯(১) ধারায় মামলা করেন। মামলার পর পুলিশ অভিযান চালিয়ে অভিযুক্ত মরম আলীকে তার নিজ বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করে। তাকে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আদালতে পাঠানোর প্রস্তুতি নেওয়া হয়।
ছাতক থানার পরিদর্শক (তদন্ত) ঝলক গোপ জানান, মামলা দায়েরের পর পুলিশ অভিযুক্ত ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে। তিনি বলেন, শিশুটির পরিবার মামলা করেছে এবং শিশুটির মা ঘটনাটি দেখেছেন বলে অভিযোগ করেছেন। ধর্ষণ কিংবা ধর্ষণের চেষ্টা—দুই ক্ষেত্রেই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত তথ্য বের করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ ঘটনায় সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে শিশুটির বয়স। মাত্র ২০ মাস বয়সী একটি শিশু নিজের নিরাপত্তা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়া, কোনো ধরনের সম্মতি প্রকাশ করা কিংবা নিজের সঙ্গে ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনা ভাষায় প্রকাশ করার সক্ষমতা রাখে না। ফলে এমন অভিযোগের ক্ষেত্রে শিশুটির চিকিৎসা, নিরাপত্তা, মানসিক সুরক্ষা এবং তদন্ত প্রক্রিয়ায় তার সর্বোচ্চ স্বার্থ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায়িত্বও এখানে অত্যন্ত সংবেদনশীল। শিশুটির পরিচয় যাতে প্রকাশ না পায় এবং তদন্তের স্বার্থে পরিবারের সদস্যদের ওপর যেন কোনো ধরনের সামাজিক বা মানসিক চাপ তৈরি না হয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে অভিযোগ প্রমাণের আগে কাউকে অপরাধী হিসেবে চূড়ান্তভাবে চিহ্নিত না করে তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার ওপর আস্থা রাখার বিষয়টিও জরুরি।
ঘটনার পর স্থানীয় পর্যায়ে শিশুর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে পরিচিত ব্যক্তি বা প্রতিবেশীর সঙ্গে শিশুদের যোগাযোগের ক্ষেত্রে পরিবারের সতর্কতা কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেই বিষয়টিও সামনে এসেছে। শিশুদের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি প্রতিবেশী ও স্থানীয় সমাজের দায়িত্বও রয়েছে। কোনো শিশুকে একা কোথাও নিয়ে যাওয়া, নির্জন স্থানে নিয়ে যাওয়া কিংবা তার সঙ্গে অস্বাভাবিক আচরণের মতো বিষয় নজরে এলে তা গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন।
তবে এই ঘটনার ক্ষেত্রে অভিযোগের প্রকৃত স্বরূপ নির্ধারণ করবে তদন্ত ও পরবর্তী বিচারিক প্রক্রিয়া। চিকিৎসা প্রতিবেদন, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য, এজাহারে উল্লেখিত তথ্য, অন্যান্য সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই মামলার পরবর্তী গতিপথ নির্ধারিত হবে। গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তি অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশের হেফাজতে রয়েছেন; আদালতের বিচারিক সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকে চূড়ান্ত অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা আইনগতভাবে সমীচীন নয়।
একটি শিশুকে ঘিরে এমন অভিযোগ শুধু একটি পরিবারের ওপর আঘাত নয়, এটি সমাজের নিরাপত্তাবোধকেও নাড়া দেয়। শিশুটির চিকিৎসা যেন যথাযথভাবে সম্পন্ন হয়, পরিবার যেন প্রয়োজনীয় সহায়তা পায় এবং অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত হয়—এখন মূল গুরুত্ব সেদিকেই। একই সঙ্গে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে শিশুদের নিরাপত্তা, সচেতনতা এবং সামাজিক নজরদারি আরও জোরদার করার প্রয়োজন রয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত তথ্য উদঘাটন করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এখন তদন্তের অগ্রগতি এবং আদালতের পরবর্তী কার্যক্রমের দিকেই নজর রয়েছে।


