প্রকাশ: ১৮ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেট অঞ্চলে গ্যাস সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান জালালাবাদ গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম লিমিটেডের পরিচালক পদে নিয়োগ পেয়েছেন বিএনপি নেতা মোহাম্মদ বদরুজ্জামান সেলিম। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে তাকে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক হিসেবে মনোনয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বদরুজ্জামান সেলিম সিলেট মহানগর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক এবং বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির সিলেট ইউনিটের সহ-সভাপতি। সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনে তিনি সিলেট-৪ আসন থেকে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন।
সোমবার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে এ-সংক্রান্ত একটি অফিস আদেশ জারি করা হয়। মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব মো. রুহুল আমিন স্বাক্ষরিত ওই চিঠি পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যানের কাছে পাঠানো হয়েছে। চিঠিতে বদরুজ্জামান সেলিমকে জালালাবাদ গ্যাসের পরিচালক পদে মনোনয়ন দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়।
জালালাবাদ গ্যাস সিলেট অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান। সিলেট বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় আবাসিক, বাণিজ্যিক ও শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম সরাসরি যুক্ত। ফলে পরিচালক হিসেবে একজন রাজনৈতিক দলের নেতার পদায়ন ঘিরে স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে স্বাভাবিকভাবেই আলোচনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপির একাধিক নেতাকে বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় প্রশাসনিক সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টি আলোচনায় থাকায় বদরুজ্জামান সেলিমের নতুন দায়িত্বও সেই ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে দেখছেন অনেকে।
বদরুজ্জামান সেলিম দীর্ঘদিন ধরে সিলেটের রাজনীতিতে সক্রিয়। মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি দলীয় বিভিন্ন সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন। সামাজিক ও মানবিক কার্যক্রমেও তার সম্পৃক্ততা রয়েছে। বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির সিলেট ইউনিটের সহ-সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন তিনি।
রাজনৈতিক অঙ্গনে তার আরেকটি পরিচয় হলো, তিনি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। সিলেট-৪ আসন থেকে দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার প্রত্যাশা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তিনি মনোনয়ন পাননি। এরপর এবার সরকারি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের পরিচালক পদে তার মনোনয়ন নতুন করে রাজনৈতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
স্থানীয় পর্যায়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সরকার গঠনের পর সিলেট বিএনপির একাধিক নেতাকে সরকারি প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় সরকার সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এসব পদায়নের মধ্যে কয়েকজন এমন নেতা রয়েছেন, যারা সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির বিভিন্ন আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। দলীয় মনোনয়ন না পেলেও পরবর্তী সময়ে তাদের প্রশাসনিক ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে দেখা যাচ্ছে।
এর আগে সিলেট ওয়াসার চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাংগঠনিক সম্পাদক মিফতাহ সিদ্দিকী। সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরীকে সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সিলেট জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি আবুল কাহের চৌধুরী শামিম দায়িত্ব পেয়েছেন সিলেট জেলা পরিষদের প্রশাসক হিসেবে। একইভাবে মহানগর বিএনপির সদ্য সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসান কয়েস লোদীকে সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
এই পদায়নগুলোর মধ্যে বদরুজ্জামান সেলিমের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে তার সিলেট-৪ আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী হওয়ার বিষয়টি। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন না পেলেও রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় থাকা নেতাদের মধ্যে কয়েকজনকে পরবর্তীতে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এতে দলীয় রাজনীতির বাইরে প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
তবে সরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদে কাউকে মনোনয়ন দেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অভিজ্ঞতা, যোগ্যতা ও দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা বিবেচনা করা হয়েছে কি না—এ বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। জালালাবাদ গ্যাসের মতো একটি কৌশলগত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে গ্যাস খাত, প্রশাসন, অর্থনীতি ও করপোরেট ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে দক্ষতা এবং জনস্বার্থের প্রতি দায়বদ্ধতা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
জালালাবাদ গ্যাসের পরিচালক হিসেবে বদরুজ্জামান সেলিমের দায়িত্বের পরিধি ও কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হলে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পর্ষদে তার ভূমিকা স্পষ্ট হবে। সিলেট অঞ্চলে গ্যাস সরবরাহের ধারাবাহিকতা, গ্রাহকসেবা, শিল্প খাতের চাহিদা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়গুলোতে পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
অন্যদিকে, সিলেটের রাজনৈতিক মহলে একের পর এক বিএনপি নেতার সরকারি প্রতিষ্ঠানে পদায়নের বিষয়টি নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন প্রতিক্রিয়াও রয়েছে। দলটির নেতাকর্মীদের একটি অংশ এসব পদায়নকে রাজনৈতিক নেতাদের রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের সুযোগ হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, দীর্ঘদিন মাঠের রাজনীতিতে সক্রিয় থাকা ব্যক্তিরা প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব পেলে স্থানীয় বাস্তবতা ও জনগণের প্রত্যাশা সম্পর্কে তাদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগতে পারে।
তবে সমালোচকদের প্রশ্ন, সরকারি ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে প্রাতিষ্ঠানিক যোগ্যতা ও পেশাগত দক্ষতাকে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে জ্বালানি খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠানে পরিচালক নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও যোগ্যতার বিষয়টি স্পষ্ট থাকা প্রয়োজন বলে তারা মনে করেন।
এদিকে, বদরুজ্জামান সেলিমের পদায়নকে কেন্দ্র করে সিলেটের বিএনপির অভ্যন্তরেও আলোচনা শুরু হয়েছে। সর্বশেষ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন এমন কয়েকজন নেতার সরকারি দায়িত্ব পাওয়ার পর নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে, নির্বাচনী রাজনীতিতে মনোনয়ন না পাওয়া নেতাদের জন্য কি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব একটি বিকল্প ভূমিকা তৈরি করছে? যদিও এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো সামগ্রিক নীতিগত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
রেজাউল হাসান কয়েস লোদীর ক্ষেত্রে অবশ্য নির্বাচনী মনোনয়নের প্রসঙ্গটি কিছুটা ভিন্ন। তিনি সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের তালিকায় ছিলেন না বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে আগামী সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে তার নাম আলোচনায় রয়েছে। এরই মধ্যে তাকে সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে বদরুজ্জামান সেলিমের জালালাবাদ গ্যাসের পরিচালক পদে মনোনয়ন সিলেটের রাজনীতিতে সরকারি প্রতিষ্ঠানে বিএনপি নেতাদের পদায়নের আলোচনাকে আরও সামনে নিয়ে এসেছে। একদিকে দলীয় রাজনীতিতে সক্রিয় ব্যক্তিদের রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে আসা যেমন নতুন প্রত্যাশা তৈরি করছে, অন্যদিকে এসব নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।
এখন বদরুজ্জামান সেলিমের নতুন দায়িত্ব পালনের দিকে নজর থাকবে সিলেটবাসীর। গ্যাস সরবরাহের মতো জনজীবনের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত একটি খাতের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে তার অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্ব কতটা কার্যকর হয়, সেটিই শেষ পর্যন্ত তার পদায়নের মূল্যায়নের প্রধান মানদণ্ড হয়ে উঠবে। সরকারের পক্ষ থেকেও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের কার্যক্রমে দক্ষতা, নিরপেক্ষতা ও জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রত্যাশা রয়েছে।


