প্রকাশ: ১১ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
মৌলভীবাজারের কুলাউড়া সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে নিহত বাংলাদেশি তরুণ তারা মিয়ার (১৯) মরদেহ প্রায় ৩৬ ঘণ্টা পর পরিবারের কাছে ফিরেছে। সোমবার বিকেলে চাতলাপুর শুল্ক স্টেশন ও ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট এলাকায় বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর পতাকা বৈঠক শেষে ভারতীয় পুলিশ কুলাউড়া থানা-পুলিশের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করে। পরে প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ পরিবারের সদস্যদের কাছে তুলে দেওয়া হয়।
নিহত তারা মিয়া কুলাউড়া উপজেলার কর্মধা ইউনিয়নের মুরইছড়া বস্তির বাসিন্দা আব্দুল মালেকের ছেলে। সোমবার বিকেল ৫টার দিকে চাতলাপুর সীমান্ত এলাকায় তাঁর মরদেহ গ্রহণ করেন বড় ভাই রাজু মিয়া। দীর্ঘ অপেক্ষার পর ছোট ভাইয়ের মরদেহ হাতে পাওয়ার মুহূর্তে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে নেমে আসে শোকের ছায়া।
তারা মিয়ার মৃত্যুকে ঘিরে সীমান্তবর্তী এলাকায়ও নানা আলোচনা তৈরি হয়েছে। একদিকে পরিবারের দাবি, তাদের সন্তান চোরাকারবারের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। অন্যদিকে বিজিবির বক্তব্য, তিনি কয়েকজনের সঙ্গে সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে প্রবেশ করেছিলেন এবং সেখানে চোরাইপণ্য আনার উদ্দেশ্যে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। ফলে ঘটনার প্রকৃত পরিস্থিতি নিয়ে নানা প্রশ্নের পাশাপাশি সীমান্ত এলাকার তরুণদের ঝুঁকিপূর্ণ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়া নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
পুলিশ ও বিজিবি সূত্রে জানা যায়, রোববার ভোরে কর্মধা ইউনিয়নের মুরইছড়া বস্তির বাসিন্দা কানু মিয়ার ছেলে রেনু মিয়া (৩৬), রইস আলীর ছেলে সুমন মিয়া (১৮) ও রইস আলী এবং তারা মিয়া পৃথিমপাশা ইউনিয়নের আলীনগর সীমান্ত দিয়ে ভারতের মাগুরউলী এলাকায় প্রবেশ করেন। বিজিবির ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁরা সিগারেট, নাসির বিড়িসহ বিভিন্ন চোরাইপণ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্যে সেখানে গিয়েছিলেন।
ভারতের অভ্যন্তরে প্রবেশের পর বিএসএফের একটি টহল দলের সঙ্গে তাঁদের মুখোমুখি হওয়ার ঘটনা ঘটে। বিএসএফ সদস্যরা তাঁদের গতিরোধের চেষ্টা করলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। একপর্যায়ে বিএসএফ সদস্যরা গুলি চালালে তারা মিয়া ঘটনাস্থলেই নিহত হন। তাঁর সঙ্গে থাকা অন্যরা সেখান থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে ফিরে আসেন এবং আত্মগোপনে চলে যান বলে জানা গেছে।
ঘটনার পর তারা মিয়ার মরদেহ ভারতের পুলিশের হেফাজতে ছিল। দুই দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে যোগাযোগ ও প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর সোমবার বিকেলে মরদেহ হস্তান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়। চাতলাপুর শুল্ক স্টেশন ও ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট এলাকায় পতাকা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে ভারতীয় পুলিশ মরদেহ কুলাউড়া থানা-পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে।
মরদেহ হস্তান্তরের সময় কুলাউড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শেখ জহিরুল ইসলাম মুন্না, ত্রিপুরার ইরানি থানার ইন্সপেক্টর শ্রীকান্ত চক্রবর্তী, বিজিবির ৪৬ ব্যাটালিয়নের আলীনগর ক্যাম্পের কোম্পানি কমান্ডার সুবেদার কাজী নাসিম, বিএসএফের মাগুরউলী ক্যাম্পের কোম্পানি কমান্ডার এসি রোহিত, কুলাউড়া থানার এসআই ফরহাদ মাতব্বর এবং কর্মধা ইউনিয়ন পরিষদের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য সিলভেস্টার পাঠান উপস্থিত ছিলেন।
কুলাউড়া থানার ওসি শেখ জহিরুল ইসলাম মুন্না জানান, দুই দেশের আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর চাতলাপুর স্থলবন্দর সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় পুলিশ তারা মিয়ার মরদেহ কুলাউড়া থানা-পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছে। পরবর্তী আইনি কার্যক্রম শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
তবে সন্তানের মৃত্যুর ঘটনায় ভেঙে পড়েছেন তারা মিয়ার মা আজিরুন্নেছা। তিনি দাবি করেছেন, তাঁর ছেলে কখনো চোরাকারবারের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, স্থানীয় কয়েকজন তাঁকে টাকার প্রলোভন দেখিয়ে বাড়ি থেকে নিয়ে গিয়েছিলেন। পরে তাঁরা সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে প্রবেশ করলে বিএসএফের গুলিতে তাঁর ছেলে নিহত হন।
ছেলেকে হারানোর বেদনায় আজিরুন্নেছার কণ্ঠে ছিল গভীর শোক। তিনি বলেন, ‘আমার ছেলে কখনো চোরাকারবারের সঙ্গে জড়িত ছিল না। টাকার লোভ দেখিয়ে আমার ছেলেকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যায় স্থানীয় সুমনসহ কয়েকজন। তখন বাধা দিলে ছেলে কথা শোনেনি। পরে তারা ভারতে ঢুকে পড়লে বিএসএফ আমার ছেলেকে গুলি করে মেরে ফেলল। আমার বুকটা খালি হই গেল।’
এদিকে তারা মিয়ার নিহত হওয়ার ঘটনায় বিএসএফের কাছে কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবি। ৪৬ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল সরকার আসিফ মাহমুদ জানিয়েছেন, পতাকা বৈঠকে তারা মিয়া নিহত হওয়ার ঘটনায় বিএসএফ কর্মকর্তাদের কাছে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে কড়া প্রতিবাদ জানানো হয়েছে।
তিনি আরও জানান, সম্প্রতি সীমান্তবর্তী এলাকায় কিছু উঠতি বয়সী তরুণ ও যুবক বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছেন। এসব কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে নিয়ে বিজিবির পক্ষ থেকে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। ভবিষ্যতেও এ ধরনের কার্যক্রম অব্যাহত রাখার পাশাপাশি সীমান্ত এলাকায় বিজিবির টহল আরও বাড়ানো হবে।
সীমান্তবর্তী অঞ্চলে জীবিকার সংকট, সহজে অর্থ উপার্জনের প্রলোভন এবং চোরাকারবারিদের প্রভাবের কারণে তরুণদের একটি অংশ ঝুঁকিপূর্ণ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। সীমান্তের অপরাধ দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতার পাশাপাশি স্থানীয় পরিবার ও জনপ্রতিনিধিদের সচেতন ভূমিকার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তারা মিয়ার মৃত্যু সেই বাস্তবতাকেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে। সীমান্তে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অবৈধভাবে যাতায়াতের পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে, এই ঘটনা তার একটি মর্মান্তিক উদাহরণ হয়ে থাকল। একই সঙ্গে সীমান্তে গুলির ঘটনা যাতে আর কোনো পরিবারের সন্তানকে এভাবে প্রাণ হারাতে না হয়, সে জন্য দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় ও দায়িত্বশীল আচরণের প্রয়োজনীয়তাও সামনে এসেছে।
তারা মিয়ার মরদেহ পরিবারের কাছে ফিরলেও তাঁর আকস্মিক মৃত্যুতে স্বজনদের যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়। এখন পরিবারের সদস্যদের একটাই প্রত্যাশা—ঘটনার প্রকৃত কারণ যথাযথভাবে অনুসন্ধান করা হোক এবং সীমান্তে এমন প্রাণহানির পুনরাবৃত্তি রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হোক।

