প্রকাশ: ১১ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
হাওরবেষ্টিত সুনামগঞ্জে যেন থামছেই না হামের ছোবল। জেলার প্রত্যন্ত এলাকা থেকে প্রতিদিনই জ্বর, শরীরে লালচে র্যাশ, শ্বাসকষ্ট ও নানা জটিলতা নিয়ে হাসপাতালে ছুটে আসছে শিশু। কোথাও শয্যা মিলছে না, কোথাও মেঝে ও বারান্দাতেই চলছে চিকিৎসা। এর মধ্যেই সিলেট বিভাগের চার জেলার মধ্যে সন্দেহজনক হামে সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে সুনামগঞ্জে। স্বাস্থ্য বিভাগের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, এ জেলায় সন্দেহজনক হামে ৫২ জনের মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে চলতি বছর সুনামগঞ্জে নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে ৩৫৩ জনের শরীরে, যা সিলেট বিভাগের চার জেলার মধ্যে সর্বোচ্চ।
শুধু নিশ্চিত আক্রান্তের হিসাবেই নয়, হাসপাতালমুখী সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যাও পরিস্থিতির ভয়াবহতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। সুনামগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলা থেকে প্রতিদিন শিশু রোগী আসছে জেলা সদর হাসপাতালে। তাদের অনেকেরই হাম-রুবেলা টিকা নেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন চিকিৎসাসংশ্লিষ্টরা। ফলে টিকাদানের আওতার বাইরে থাকা শিশুদের মধ্যে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সুনামগঞ্জের ভৌগোলিক বাস্তবতা এ সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে। জেলার বড় একটি অংশ হাওরাঞ্চল। বর্ষাকালে যোগাযোগব্যবস্থা অনেক জায়গায় কঠিন হয়ে পড়ে। দুর্গম গ্রাম ও হাওর এলাকার মানুষের জন্য উপজেলা কিংবা জেলা সদরে পৌঁছানোই অনেক সময় বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। ফলে টিকাদান কর্মসূচি, রোগ শনাক্তকরণ কিংবা জটিল অবস্থায় দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার ক্ষেত্রে তৈরি হচ্ছে সময়ের ব্যবধান। এই ব্যবধানই অনেক ক্ষেত্রে শিশুর জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।
সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। সরেজমিনে হাসপাতালের হাম ওয়ার্ডে রোগীর চাপের চিত্র দেখা গেছে। ওয়ার্ডের ভেতরের পাশাপাশি মেঝে ও বারান্দাতেও শিশু রোগীদের অবস্থান করতে হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেক শিশুকে নিয়ে স্বজনদের দিনের পর দিন হাসপাতালে অবস্থান করতে হচ্ছে। ধারণক্ষমতার তুলনায় রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় চিকিৎসক ও নার্সদের ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।
হাম অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। আক্রান্ত ব্যক্তির কাশি, হাঁচি বা শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়তে পারে। বিশেষ করে টিকা না নেওয়া শিশুদের মধ্যে এর সংক্রমণ দ্রুত ছড়ানোর আশঙ্কা থাকে। বাংলাদেশে চলমান হামের প্রাদুর্ভাবেও শিশুদের আক্রান্ত হওয়ার হার উল্লেখযোগ্য। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকাদানের ঘাটতি থাকলে কোনো এলাকায় হাম দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে।
হাম প্রতিরোধে সরকার বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি পরিচালনা করছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার শিশুদের টিকার আওতায় আনার পাশাপাশি নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির বাইরে থাকা শিশুদেরও শনাক্ত করে টিকা দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু সুনামগঞ্জের মাঠপর্যায়ের চিত্র বলছে, এখনো অনেক শিশু টিকাদানের বাইরে রয়েছে।
হাসপাতালে ভর্তি থাকা কয়েকজন শিশুর স্বজন জানিয়েছেন, টিকা দেওয়ার সময় সম্পর্কে তারা যথেষ্ট তথ্য পাননি। কেউ কেউ টিকা দিতে পারেননি, আবার কারও ক্ষেত্রে টিকাদানের বিষয়ে অনীহা বা সামাজিক কুসংস্কার কাজ করেছে। ফলে টিকাদান কর্মসূচি থাকলেও প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রতিটি শিশুকে এর আওতায় আনা কতটা সম্ভব হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
সদর উপজেলার সোনাপুর এলাকার আলমগীরের দাবি, তাদের বেদে পল্লিতে হামের সংক্রমণ ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এলাকায় ১২০ থেকে ১৩০ জন শিশু হাম আক্রান্ত হয়েছে এবং এখনো প্রায় ২৫ জন শিশু হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে। আক্রান্ত শিশুদের বেশিরভাগই টিকার আওতায় আসেনি বলে তিনি জানান।
জামালগঞ্জ থেকে সন্তানকে নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি থাকা সুহেনা জানান, কয়েক দিন ধরে তিনি মেয়েকে নিয়ে হাসপাতালে রয়েছেন। শিশুটির জ্বর, শ্বাসকষ্ট এবং খাবার গ্রহণে সমস্যা হচ্ছে। টিকার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, শিশুকে টিকা দেওয়া হয়নি এবং কখন টিকা দেওয়া হয় সে সম্পর্কেও তিনি জানতেন না। তার অভিযোগ, তাদের কাছে টিকাদানের সময়সূচি বা প্রয়োজনীয় তথ্য যথাযথভাবে পৌঁছায়নি।
হাসপাতালের একজন নার্সও জানান, ভর্তি হওয়া শিশুদের অনেকেই টিকা নেয়নি। কিছু শিশু সুস্থ হয়ে বাড়ি যাওয়ার পর আবার অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ফিরছে বলেও তিনি জানান। তার মতে, শিশুদের টিকাদান এবং অভিভাবকদের সচেতনতার ঘাটতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
হাসপাতালের মেডিকেল আবাসিক কর্মকর্তা ডা. রফিকুল ইসলাম বলেন, আগের সময়ের তুলনায় হাসপাতালে হামের রোগী বেড়েছে। ওয়ার্ডের ধারণক্ষমতার চেয়ে কয়েক গুণ রোগী ভর্তি থাকায় কাঙ্ক্ষিত সেবা দিতে চিকিৎসক ও নার্সদের সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। তবে সীমাবদ্ধতার মধ্যেও চিকিৎসক ও নার্সরা আন্তরিকভাবে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন বলে জানান তিনি।
স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিল থেকে ৮ আগস্ট পর্যন্ত সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালসহ জেলার বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সন্দেহজনক হাম নিয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন প্রায় ৩ হাজার ১০ জন রোগী। এর মধ্যে ২ হাজার ৮৫১ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। একই সময়ে জেলায় নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা ৩৫১ জন বলে স্থানীয় হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ১১ আগস্টের বিভাগীয় স্বাস্থ্য বিভাগের সর্বশেষ হিসাবে নিশ্চিত আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে ৩৫৩ জন হয়েছে।
সুনামগঞ্জে হামে মৃত্যুর উপজেলা-ভিত্তিক হিসাবেও উদ্বেগজনক চিত্র পাওয়া গেছে। স্থানীয় তথ্য অনুযায়ী, ছাতক উপজেলায় মৃত্যুর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এরপর সুনামগঞ্জ সদর, জগন্নাথপুর, শান্তিগঞ্জ, দিরাই, বিশ্বম্ভরপুর, তাহিরপুর, দোয়ারাবাজার ও জামালগঞ্জেও মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। তবে স্থানীয় ও বিভাগীয় পর্যায়ের বিভিন্ন প্রতিবেদনে সংখ্যাগত কিছু পার্থক্য থাকায় মৃত্যুর চূড়ান্ত উপজেলা-ভিত্তিক হিসাবের ক্ষেত্রে সর্বশেষ সরকারি তথ্য অনুসরণ করা জরুরি।
সুনামগঞ্জের জেলা সিভিল সার্জন ডা. জসীম উদ্দিন জানিয়েছেন, কম বয়সী যেসব শিশু মারা গেছে তাদের অনেকেই টিকা পায়নি। পাশাপাশি কিছু পরিবারের মধ্যে টিকা নিয়ে অনীহা ও অসচেতনতা রয়েছে। তবে স্বাস্থ্য বিভাগ শিশুদের টিকার আওতায় আনার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলে জানান তিনি।
সুনামগঞ্জের পরিস্থিতিকে শুধু একটি জেলার স্বাস্থ্য সংকট হিসেবে দেখলে সমস্যার পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। এটি একই সঙ্গে দুর্গম অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছানো, টিকাদানের আওতা নিশ্চিত করা, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়ানোর প্রশ্ন। কারণ একটি শিশুকে সময়মতো টিকার আওতায় আনা গেলে তাকে হাম থেকে সুরক্ষিত রাখা সম্ভব; আবার আক্রান্ত হলে দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আনাও জীবন বাঁচানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
হাসপাতালের ওপর চাপ কমাতেও উপজেলা পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণ ও প্রাথমিক চিকিৎসা সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। গুরুতর রোগীকে দ্রুত জেলা সদর হাসপাতালে পাঠানোর পাশাপাশি সন্দেহজনক রোগীদের সংক্রমণ ছড়ানো থেকে রক্ষা করতে যথাযথ ব্যবস্থাপনা দরকার। একই জায়গায় বিপুলসংখ্যক হাম আক্রান্ত শিশুকে অন্য রোগীদের সঙ্গে রাখলে সংক্রমণের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
সুনামগঞ্জের হামের চিত্রে সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিকটি হলো আক্রান্তদের বড় একটি অংশ শিশু। একটি শিশুর অসুস্থতার সঙ্গে একটি পরিবারের স্বাভাবিক জীবনও থমকে যায়। প্রত্যন্ত এলাকা থেকে নৌকা, যানবাহন কিংবা নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে যখন অভিভাবকরা অসুস্থ সন্তানকে হাসপাতালে নিয়ে আসেন, তখন তাদের প্রত্যাশা থাকে দ্রুত চিকিৎসা ও নিরাপদ পরিবেশ। কিন্তু হাসপাতালে অতিরিক্ত রোগীর চাপ, শয্যার সংকট ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা সেই প্রত্যাশাকে কঠিন করে তুলছে।
সিলেট বিভাগে নিশ্চিত হাম আক্রান্তের হিসাবে সুনামগঞ্জ বর্তমানে সবচেয়ে এগিয়ে। ১১ আগস্টের স্বাস্থ্য বিভাগের প্রতিবেদনে জেলায় ৩৫৩ জন নিশ্চিত আক্রান্তের তথ্য পাওয়া গেছে। সন্দেহজনক হামে মৃত্যুর সংখ্যাও চার জেলার মধ্যে সর্বোচ্চ—৫২ জন।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথও স্পষ্ট। প্রতিটি শিশুকে টিকার আওতায় আনা, প্রত্যন্ত অঞ্চলে টিকাদান কার্যক্রম আরও জোরদার করা, অভিভাবকদের সচেতন করা, হাসপাতালের সক্ষমতা বাড়ানো এবং আক্রান্তদের দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে। হামের মতো প্রতিরোধযোগ্য একটি রোগে যেন আর কোনো পরিবার সন্তান হারানোর শোক না পায়, সে জন্য সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি সমাজের প্রতিটি স্তরে সচেতনতা ও দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন।
সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলের প্রতিটি শিশুর কাছে স্বাস্থ্যসেবার সুরক্ষা পৌঁছে দেওয়াই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। আর সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় টিকাদান কর্মসূচির শতভাগ বাস্তবায়ন, দুর্গম এলাকায় বিশেষ নজরদারি এবং হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি এখন সময়ের দাবি।


