প্রকাশ: ১১ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সুনামগঞ্জ-২ (দিরাই-শাল্লা) আসনের সংসদ সদস্য নাছির উদ্দিন চৌধুরী অসুস্থ ও শারীরিকভাবে অক্ষম থাকার সুযোগ নিয়ে তাঁর গলায় রামদা ঠেকিয়ে সম্পত্তি লিখে নেওয়ার চেষ্টা এবং ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগে আদালতে মামলা হয়েছে। নাছির উদ্দিন চৌধুরীর স্ত্রী পারভীন চৌধুরী বাদী হয়ে তাঁর স্বামীর তিন সৎভাইসহ আটজনের বিরুদ্ধে সুনামগঞ্জের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলাটি দায়ের করেন।
মামলাটি দায়েরের পর অভিযোগের বিষয়টি নিয়ে সুনামগঞ্জের রাজনৈতিক ও স্থানীয় অঙ্গনে আলোচনা তৈরি হয়েছে। বাদীপক্ষের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে নাছির উদ্দিন চৌধুরীর সম্পত্তি তাঁর স্ত্রী ও সন্তানদের কাছ থেকে বঞ্চিত করে আত্মসাতের পরিকল্পনা করা হচ্ছিল। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই অসুস্থ অবস্থায় থাকা সংসদ সদস্যকে ভয় দেখিয়ে সম্পত্তি হস্তান্তরের দলিলে স্বাক্ষর করানোর চেষ্টা করা হয়।
সোমবার সুনামগঞ্জের দিরাই জোনের আমলগ্রহণকারী আদালতে মামলাটি দায়ের করা হয়। মামলায় নাছির উদ্দিন চৌধুরীর সৎভাই মঈন উদ্দিন চৌধুরী মাসুক, মিজানুর রহমান চৌধুরী ও মোসলেহ উদ্দিন চৌধুরীকে আসামি করা হয়েছে। তাঁদের সঙ্গে আরও পাঁচজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, দিরাই উপজেলার মাতারগাঁও গ্রামের আমিরুল ইসলাম, পুরাতন কর্ণগাঁও গ্রামের ছয়ফুল চৌধুরী, তল বাউসী গ্রামের দলিল লেখক মুজিবুর রহমান, কলিয়ার কাপনের তাজুল ইসলাম এবং দিরাইয়ের মোহরার মমতাজ বেগমও মামলার আসামি।
মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০২২ সালের জানুয়ারি মাসে পারভীন আক্তার নাছির উদ্দিন চৌধুরীর দিরাইয়ের বাড়িতে গেলে তাঁকে মারধর ও শ্লীলতাহানির শিকার হতে হয়। একই সময়ে নাছির উদ্দিন চৌধুরীর বাড়ি ও অন্যান্য সম্পত্তি থেকে তাঁর দুই স্ত্রী এবং সন্তানদের বঞ্চিত করে সম্পত্তি আত্মসাতের উদ্দেশ্যে আসামিরা পরিকল্পনা করছিলেন বলে অভিযোগ করেন বাদী।
অভিযোগে আরও বলা হয়, পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ২০২২ সালের ২৫ জানুয়ারি দিরাই সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের দুই কর্মচারীকে কর্মকর্তা পরিচয়ে নাছির উদ্দিন চৌধুরীর বাড়িতে পাঠানো হয়। সেখানে অসুস্থ ও অক্ষম নাছির উদ্দিন চৌধুরীকে একটি দলিলে স্বাক্ষর করানোর চেষ্টা করা হয়। তবে তিনি এতে সম্মতি না দেওয়ায় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
বাদীপক্ষের দাবি, স্বাক্ষর করতে অস্বীকৃতি জানানোর পর নাছির উদ্দিন চৌধুরীর গলায় রামদা ঠেকিয়ে ভয় দেখানো হয়। স্বাক্ষর না করলে তাঁকে গলা কেটে হত্যার হুমকি দেওয়া হয় বলেও মামলার অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। একজন অসুস্থ ব্যক্তিকে এভাবে ভয়ভীতি দেখিয়ে সম্পত্তি লিখে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে—এমন অভিযোগকে কেন্দ্র করেই মামলাটি এখন তদন্তের পর্যায়ে যাচ্ছে।
মামলার বর্ণনা অনুযায়ী, ওই সময় নাছির উদ্দিন চৌধুরীর অপর স্ত্রী শেলী চৌধুরী কথাবার্তা শুনে সেখানে উপস্থিত হয়ে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেন। তখন আসামি মিজানুর রহমান চৌধুরী তাঁকেও হত্যার হুমকি দেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। একপর্যায়ে শেলী চৌধুরী ভয়ে মেঝেতে পড়ে যান বলেও মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
ঘটনার সময় নাছির উদ্দিন চৌধুরীর সমর্থক ওয়াকিব হাসান তাঁকে দেখতে তাঁর বাড়িতে এসেছিলেন বলে মামলায় দাবি করা হয়েছে। তিনি সেখানে কথিত ঘটনাটি দেখতে পান। পরে মঈন উদ্দিন চৌধুরী ও তাঁর ভাইয়েরা ভয়ভীতি দেখিয়ে ওয়াকিব হাসানকে বাড়ি থেকে বের করে দেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
মামলাটি গ্রহণ করে আদালত বিষয়টি তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। আমলগ্রহণকারী আদালতের বিচারক মো. জসিম মামলাটি গ্রহণ করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ বা সিআইডিকে অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন। আদালতের পেশকার মুহিত লাল চন্দ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। বাদীপক্ষে মামলাটি পরিচালনা করেন আইনজীবী কাওছার আলম।
তবে মামলায় ওঠা অভিযোগের বিষয়ে আসামিপক্ষের বক্তব্যও সামনে এসেছে। নাছির উদ্দিন চৌধুরীর সৎভাই মঈন উদ্দিন চৌধুরী মাসুক অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, দলিল রেজিস্ট্রির ক্ষেত্রে সাব-রেজিস্ট্রারই দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর দাবি, নাছির উদ্দিন চৌধুরীর বোন ও স্ত্রী বিষয়টি জানতেন। তিনি মামলাটি দায়েরের বিষয়ে অবগত নন বলেও জানান। তবে মামলা সম্পর্কে জানার পর তিনি আইনিভাবেই বিষয়টি মোকাবিলা করবেন বলে জানিয়েছেন।
ফলে মামলাটি এখন আদালতের নির্দেশে তদন্তের দিকে এগোচ্ছে। অভিযোগের সত্যতা, ঘটনার প্রকৃত পরিস্থিতি এবং সম্পত্তি হস্তান্তরের সঙ্গে কারা কীভাবে জড়িত ছিলেন—এসব বিষয় তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়ার কথা। একই সঙ্গে মামলায় উল্লিখিত দলিল, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং ঘটনার সময় উপস্থিত থাকার দাবি করা সাক্ষীদের বক্তব্যও তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
একজন জনপ্রতিনিধিকে ঘিরে এমন গুরুতর অভিযোগ ওঠায় বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই জনমনে কৌতূহল তৈরি করেছে। বিশেষ করে অসুস্থ অবস্থায় থাকা একজন ব্যক্তিকে ভয় দেখিয়ে সম্পত্তি লিখে নেওয়ার অভিযোগের বিষয়টি পারিবারিক বিরোধের গণ্ডি ছাড়িয়ে আইন ও নৈতিকতার প্রশ্নও সামনে এনেছে। তবে আদালতে মামলা দায়ের হওয়া মানেই অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে—এমনটি নয়। তদন্ত ও পরবর্তী বিচারিক প্রক্রিয়ায় অভিযোগের সত্যতা যাচাই হওয়ার পরই ঘটনার প্রকৃত চিত্র পরিষ্কার হবে।
এদিকে স্থানীয় পর্যায়ে মামলাটি নিয়ে নানা আলোচনা চললেও আইনগত প্রক্রিয়ায় বিষয়টির নিষ্পত্তি হবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন। অভিযোগকারী পক্ষ যেমন ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা করছে, তেমনি আসামিপক্ষও আইনিভাবে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরার কথা জানিয়েছে। এখন আদালতের নির্দেশিত তদন্ত প্রতিবেদন এবং পরবর্তী আইনি কার্যক্রমের দিকেই নজর থাকবে সংশ্লিষ্টদের।
সুনামগঞ্জের এই মামলাটি শেষ পর্যন্ত কোন দিকে গড়ায়, তদন্তে কী তথ্য উঠে আসে এবং অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আদালতের পরবর্তী সিদ্ধান্ত কী হয়—তা সময়ের সঙ্গে স্পষ্ট হবে। আপাতত আদালতের নির্দেশে তদন্ত শুরু হওয়ায় দীর্ঘদিনের কথিত সম্পত্তি বিরোধ ও ঘটনার নেপথ্যের বিষয়গুলো আনুষ্ঠানিক তদন্তের আওতায় এসেছে।


