প্রকাশ: ১১ আগস্ট ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেট বিভাগে হামের পরিস্থিতি এখনো উদ্বেগজনক। প্রতিদিনই নতুন করে আক্রান্ত শনাক্ত হওয়ার পাশাপাশি সন্দেহজনক হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন বহু মানুষ। এর মধ্যে শিশুদের সংখ্যাই বেশি। গত ২৪ ঘণ্টায় সিলেটে সন্দেহজনক হামের উপসর্গ নিয়ে আরও এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে ২৪ জনের শরীরে নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে। ফলে চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১১ আগস্ট পর্যন্ত সিলেট বিভাগে নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৭৬ জনে। সন্দেহজনক ও নিশ্চিত হাম—দুই হিসাব মিলিয়ে এ পর্যন্ত মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২৮ জনে।
সিলেট বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয়ের ১১ আগস্টের প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। স্বাস্থ্য বিভাগের দৈনিক হিসাব অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে নতুন করে ৯২ জন সন্দেহভাজন হাম রোগী ভর্তি হয়েছেন। এর ফলে বর্তমানে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৯৪ জনে। হাসপাতালগুলোতে একসঙ্গে এত বিপুলসংখ্যক রোগীর চিকিৎসা চলায় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।
স্বাস্থ্য বিভাগের পরিসংখ্যান বলছে, ১ জানুয়ারি থেকে ১১ আগস্ট পর্যন্ত সিলেট বিভাগে নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে ৮৭৬ জনের। জেলার হিসাবে সবচেয়ে বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছে সুনামগঞ্জে। জেলাটিতে এ পর্যন্ত ৩৫৩ জনের শরীরে নিশ্চিত হাম পাওয়া গেছে। এরপর সিলেট জেলায় ২৮৭ জন, মৌলভীবাজারে ১২০ জন এবং হবিগঞ্জে ১১৬ জন আক্রান্ত হয়েছেন। হবিগঞ্জের নিশ্চিত আক্রান্তদের মধ্যে দুজনকে রুবেলা রোগী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
সংখ্যার দিকে তাকালে সুনামগঞ্জের পরিস্থিতি বিশেষভাবে নজর কাড়ছে। বিভাগের চার জেলার মধ্যে নিশ্চিত আক্রান্তের হিসাবে সুনামগঞ্জ একাই ৩৫০-এর বেশি রোগী নিয়ে এগিয়ে রয়েছে। এ কারণে জেলাটিতে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ, রোগী শনাক্তকরণ এবং শিশুদের সুরক্ষায় কার্যকর জনস্বাস্থ্য পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তবে কেবল নিশ্চিত রোগীর সংখ্যা দিয়ে পুরো পরিস্থিতি বোঝা সম্ভব নয়; কারণ বিপুলসংখ্যক মানুষ এখনো হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ভর্তি হওয়া ৯২ জন সন্দেহভাজন রোগীর মধ্যে ৩১ জনকে শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে, ৩৫ জনকে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে, দুজনকে রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে, নয়জনকে মৌলভীবাজার জেলা সদর হাসপাতালে এবং ১৫ জনকে সুনামগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
বর্তমানে চিকিৎসাধীন ২৯৪ জন সন্দেহভাজন রোগীর বড় একটি অংশ রয়েছে সিলেট নগরীর হাসপাতালগুলোতে। শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে ১৩৭ জন এবং ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৭৯ জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন। রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১৪ জন, নর্থ ইস্ট হাসপাতালে ছয়জন, গোলাপগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চারজন এবং বিয়ানীবাজার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দুজন চিকিৎসাধীন আছেন। একই সময়ে সুনামগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালে ৩৪ জন, হবিগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতালে দুজন এবং মৌলভীবাজার জেলা সদর হাসপাতালে ১৬ জন সন্দেহভাজন রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন।
এই পরিসংখ্যানের মধ্যেই সবচেয়ে হৃদয়বিদারক তথ্য হলো, গত ২৪ ঘণ্টায় সন্দেহজনক হামের উপসর্গ নিয়ে আরও এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগের প্রতিবেদনে মৃত শিশুটির বয়স সাত মাস বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তার বাড়ি সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায়। শিশুটি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিল। শিশুটির মৃত্যু আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে, হামের প্রাদুর্ভাবে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে অল্পবয়সী শিশুরা।
জেলাভিত্তিক মৃত্যুর হিসাবও পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরছে। সন্দেহজনক হামের উপসর্গ নিয়ে এ পর্যন্ত সিলেটে ৪২ জন, হবিগঞ্জে ১৬ জন, মৌলভীবাজারে ১২ জন এবং সুনামগঞ্জে ৫২ জনের মৃত্যু হয়েছে। অর্থাৎ চার জেলায় সন্দেহজনক হামের উপসর্গে মোট মৃত্যু হয়েছে ১২২ জনের। এর বাইরে নিশ্চিত হাম রোগে সিলেটে চারজন, মৌলভীবাজারে একজন এবং সুনামগঞ্জে একজনের মৃত্যু হয়েছে। হবিগঞ্জে নিশ্চিত হাম রোগে মৃত্যুর তথ্য নেই। দুই ধরনের মৃত্যুর হিসাব একত্র করলে বিভাগে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়ায় ১২৮ জনে।
তবে স্বাস্থ্য বিভাগের প্রতিবেদনে ‘সন্দেহজনক’ ও ‘নিশ্চিত’ রোগীর হিসাব আলাদাভাবে রাখা হচ্ছে—এ বিষয়টি সংবাদে স্পষ্টভাবে বিবেচনা করা জরুরি। সন্দেহজনক রোগী বলতে সাধারণত হামের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ উপসর্গ থাকা রোগীদের বোঝানো হয়, আর পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত রোগী আলাদা হিসাবে যুক্ত হন। ফলে সন্দেহজনক রোগীর সংখ্যা সরাসরি নিশ্চিত হাম আক্রান্তের সংখ্যার সমান নয়।
বাংলাদেশে চলমান হামের প্রাদুর্ভাবে শিশুদের ঝুঁকির বিষয়টিও বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। হামের সংক্রমণ অত্যন্ত দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং শিশুদের ক্ষেত্রে জটিলতা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিশেষ করে টিকাদানের আওতার বাইরে থাকা শিশুদের সংক্রমণের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। এ কারণে নিয়মিত টিকাদান এবং স্বাস্থ্য বিভাগের নির্ধারিত কর্মসূচিতে শিশুদের অন্তর্ভুক্ত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
হামের সংক্রমণ মোকাবিলায় চিকিৎসার পাশাপাশি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। আক্রান্ত রোগীদের দ্রুত শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসার আওতায় আনা, সন্দেহভাজন রোগীদের যথাযথ পর্যবেক্ষণ করা এবং হাসপাতালগুলোতে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি। একই সঙ্গে যেসব এলাকায় আক্রান্তের সংখ্যা বেশি, সেসব এলাকায় স্বাস্থ্য বিভাগের নজরদারি আরও বাড়ানো প্রয়োজন।
বর্তমানে ২৯৪ জন সন্দেহভাজন রোগী বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এর সঙ্গে গত ২৪ ঘণ্টায় ৯২ জনের নতুন করে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া এবং ২৪ জনের নিশ্চিত হাম শনাক্ত হওয়ার তথ্য দেখাচ্ছে, সিলেট বিভাগে সংক্রমণের প্রবাহ এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। এর মধ্যে আরও একটি শিশুর মৃত্যু পরিস্থিতির গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
অভিভাবকদের জন্যও এই সময়ে বাড়তি সতর্কতা জরুরি। শিশুর জ্বর, কাশি, সর্দি, চোখ লাল হওয়া কিংবা শরীরে র্যাশের মতো উপসর্গ দেখা দিলে বিষয়টিকে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি শিশুর টিকাদান সম্পন্ন হয়েছে কি না, সেটিও নিশ্চিত করা দরকার। হামের বিষয়ে কোনো গুজব বা যাচাইহীন তথ্যের ওপর নির্ভর না করে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য বিভাগের পরামর্শ অনুসরণ করা উচিত।
সিলেটের চার জেলার পরিসংখ্যান বলছে, সংকটটি কোনো একটি জেলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সুনামগঞ্জে নিশ্চিত আক্রান্তের সংখ্যা সর্বোচ্চ হলেও সিলেট, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রোগী শনাক্ত হয়েছেন। ফলে বিভাগজুড়ে সমন্বিত নজরদারি, রোগী শনাক্তকরণ, চিকিৎসা এবং প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম অব্যাহত রাখার প্রয়োজন রয়েছে।
সিলেটে হামের বিস্তার এবং মৃত্যুর ধারাবাহিকতা এখন জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় সতর্কবার্তা। প্রতিদিনের পরিসংখ্যান শুধু কিছু সংখ্যা নয়—এর পেছনে রয়েছে অসুস্থ শিশু, উদ্বিগ্ন পরিবার এবং চিকিৎসকদের ওপর বাড়তে থাকা চাপ। তাই আক্রান্তদের যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সংক্রমণ প্রতিরোধ, টিকাদান এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া এখন সবচেয়ে জরুরি।
হামের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই স্বাস্থ্য বিভাগ, স্থানীয় প্রশাসন, চিকিৎসক, অভিভাবক এবং সাধারণ মানুষ—সব পক্ষের সম্মিলিত সচেতনতা ও দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন। সিলেটে প্রতিটি শিশুর নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে এখনই কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করাই সময়ের দাবি।


