চট্টগ্রামের অপরাধজগতের নতুন মুখ ডেভিড ইমন

প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।

চট্টগ্রামের অপরাধজগতে গত কয়েক বছরে যে কয়েকটি নাম বারবার আলোচনায় এসেছে, তাদের মধ্যে অন্যতম মোবারক হোসেন ওরফে ডেভিড ইমন। ব্যবসায়ী, প্রবাসী ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মালিকদের কাছে বিদেশি নম্বর ব্যবহার করে চাঁদা দাবি, অস্ত্রের মহড়া, সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসী কার্যক্রম এবং একাধিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তাঁর নাম আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তে উঠে এসেছে বলে দাবি করা হয়েছে। অল্প সময়ের মধ্যেই একজন সম্ভাবনাময় ক্রিকেটার থেকে আলোচিত অপরাধী হিসেবে পরিচিতি পাওয়া এই ব্যক্তির জীবনযাত্রার পরিবর্তন এখন চট্টগ্রামের অপরাধ বিশ্লেষকদের কাছেও আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।

সম্প্রতি যশোর সীমান্ত এলাকা থেকে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার সময় ডেভিড ইমনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, তিনি সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এর আগে কয়েক দিন আগে একই সীমান্তপথ ব্যবহার করে তিনি বাংলাদেশে প্রবেশ করেছিলেন বলেও পুলিশের কাছে তথ্য রয়েছে। তাঁর গ্রেপ্তারের পর আবারও সামনে এসেছে চট্টগ্রামের সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের বিস্তার, আন্তঃসীমান্ত যোগাযোগ এবং শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নেটওয়ার্ক নিয়ে নানা প্রশ্ন।

পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক নাজিমুল হক জানিয়েছেন, ডেভিড ইমন প্রায়ই সীমান্ত ব্যবহার করে যাতায়াত করতেন বলে তাদের কাছে তথ্য রয়েছে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর কাছে দেশি ও বিদেশি—দুটি পাসপোর্ট থাকার তথ্যও তদন্তে উঠে এসেছে। বিষয়টি যাচাই-বাছাই করে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, বিদেশে অবস্থানরত শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলীর হয়ে বর্তমানে চট্টগ্রামে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় নেতৃত্ব দেওয়া দুজনের একজন হিসেবে ডেভিড ইমন কাজ করছিলেন। তাঁর বিরুদ্ধে হত্যা, চাঁদাবাজি, অস্ত্র আইনে মামলা, সন্ত্রাসী কার্যক্রম এবং সংঘবদ্ধ অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে ইতোমধ্যে ১৫টি মামলা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। এসব মামলার তদন্ত এবং বিচারিক প্রক্রিয়া এখনো চলমান রয়েছে।

তবে অপরাধের এই অন্ধকার অধ্যায়ের আগে ডেভিড ইমনের জীবনে ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি পরিচয়। চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগর এলাকার বাসিন্দা ইমন ছোটবেলা থেকেই ক্রিকেটের প্রতি গভীর অনুরাগী ছিলেন। স্থানীয় মাঠে নিয়মিত অনুশীলনের পাশাপাশি সাইকেলে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে ফটিকছড়ি কলেজ মাঠে খেলতে যেতেন। পরবর্তীতে উন্নত প্রশিক্ষণের আশায় চট্টগ্রাম নগরের অক্সিজেন এলাকায় খালার বাসায় থেকে নিয়মিত ক্রিকেট অনুশীলন শুরু করেন।

চট্টগ্রাম ব্রাদার্স একাডেমিতে প্রশিক্ষণ নেওয়ার সময় বাঁহাতি লেগ স্পিনার বা ‘চায়নাম্যান’ বোলার হিসেবে তাঁর বেশ সুনাম ছিল। শুধু বোলিং নয়, ব্যাটিংয়েও দক্ষতা দেখিয়ে কোচদের নজর কাড়েন তিনি। জাতীয় দলের ক্রিকেটার কিংবা বিদেশি দল চট্টগ্রামে এলে নেট অনুশীলনে বল করার সুযোগও পেয়েছিলেন তিনি। অনেকেই মনে করতেন, সঠিক পরিচর্যা ও ধারাবাহিক পরিশ্রম ধরে রাখতে পারলে জাতীয় পর্যায়ের ক্রিকেটেও জায়গা করে নেওয়ার সক্ষমতা ছিল তাঁর।

চট্টগ্রাম ব্রাদার্স একাডেমির সাবেক কোচ আমিনুল হক গণমাধ্যমকে বলেন, ইমন অত্যন্ত সম্ভাবনাময় একজন ক্রিকেটার ছিলেন। মাঠে তাঁর শৃঙ্খলা, বোলিংয়ের বৈচিত্র্য এবং শেখার আগ্রহ অন্যদের থেকে আলাদা ছিল। তবে ২০২০ সালের পর হঠাৎ করেই তিনি ক্রিকেট ছেড়ে দেন এবং এরপর আর অনুশীলনে দেখা যায়নি।

স্থানীয় বাসিন্দারাও একই ধরনের স্মৃতিচারণ করেছেন। তাঁদের ভাষ্য, ছোটবেলায় এলাকার গর্ব হিসেবে পরিচিত ইমন ধীরে ধীরে অপরাধের পথে জড়িয়ে পড়েন। ফটিকছড়ির কাঞ্চননগর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ও তাঁর প্রতিবেশী হান্নান চৌধুরী বলেন, একজন ভালো ক্রিকেটার হয়ে এলাকার সুনাম বাড়ানোর সুযোগ ছিল তাঁর। কিন্তু পরবর্তীতে নানা অপরাধে তাঁর নাম উঠে আসায় পুরো বিষয়টি অত্যন্ত হতাশাজনক।

পরিবার ও স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানা গেছে, রহমানিয়া উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করার পর কলেজে ভর্তি হলেও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা আর দেওয়া হয়নি তাঁর। এরপর ধীরে ধীরে রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততা বাড়তে থাকে। বিশেষ করে ২০২০ সালে করোনাভাইরাস মহামারির সময়ের পর তিনি ছাত্রলীগের রাজনীতিতে সক্রিয় হন এবং সংগঠনের স্থানীয় কয়েকজন নেতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয় বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।

২০২২ সালে জীবিকার উদ্দেশ্যে তিনি ওমানে যান। প্রায় এক বছর সেখানে থাকার পর দেশে ফিরে আসেন। এরপর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি আত্মগোপনে চলে যান বলে পুলিশ জানিয়েছে। ওই সময় চট্টগ্রামের বায়েজীদ বোস্তামী এলাকার আতুরার ডিপো এলাকায় অবস্থানকালে স্থানীয় অপরাধচক্রের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ আরও গভীর হয়। সেখানেই কথিত শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয় বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি।

পুলিশের ভাষ্যমতে, ৫ আগস্টের পর চট্টগ্রাম নগরের অক্সিজেন এলাকায় ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ বিদেশে অবস্থানরত শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলীর নজরে আসে। এরপর ধীরে ধীরে সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রে তাঁর প্রভাব বৃদ্ধি পেতে থাকে। ব্যবসায়ী, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিক এবং বিদেশে অবস্থানরত চট্টগ্রামের প্রবাসীদের কাছে বিদেশি নম্বর ব্যবহার করে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করার অভিযোগও তদন্তে উঠে এসেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে অপরাধচক্রগুলো শুধু স্থানীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নেই। দেশের বাইরে অবস্থানরত পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নির্দেশনায় দেশে থাকা সহযোগীরা বিভিন্ন অপরাধ সংঘটিত করছে। আধুনিক যোগাযোগ প্রযুক্তি, এনক্রিপ্টেড অ্যাপ এবং সীমান্তপথ ব্যবহার করে এসব চক্র নিজেদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ফলে তাদের শনাক্ত ও আইনের আওতায় আনা আগের তুলনায় আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, ডেভিড ইমনের ঘটনাটি কেবল একজন ব্যক্তির অপরাধজীবনের গল্প নয়; বরং এটি সমাজ, পরিবার, রাজনীতি, অপরাধচক্র এবং সীমান্তনির্ভর অপরাধ নেটওয়ার্কের জটিল বাস্তবতার প্রতিফলন। একজন সম্ভাবনাময় ক্রীড়াবিদ কীভাবে ধাপে ধাপে অপরাধজগতের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে পড়তে পারেন, সেই প্রশ্নও নতুন করে সামনে এসেছে। একই সঙ্গে তরুণদের খেলাধুলা, শিক্ষা এবং সামাজিক সম্পৃক্ততার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।

এদিকে ডেভিড ইমনের গ্রেপ্তারের পর তাঁর বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলোর তদন্ত আরও জোরদার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। পুলিশ বলছে, তাঁর কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের অন্যান্য সদস্য, অর্থের উৎস, আন্তঃসীমান্ত যোগাযোগ এবং চাঁদাবাজির নেটওয়ার্ক সম্পর্কে বিস্তারিত অনুসন্ধান চলছে। তদন্তের অগ্রগতির ওপর নির্ভর করে আরও গ্রেপ্তার এবং নতুন তথ্য সামনে আসতে পারে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

উল্লেখ্য, ডেভিড ইমনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো বর্তমানে তদন্তাধীন এবং বিভিন্ন মামলার বিচারিক কার্যক্রম চলমান। আদালতের চূড়ান্ত রায়ের আগে তাঁকে আইনগতভাবে দোষী সাব্যস্ত করা হয়নি। ফলে অভিযোগগুলোর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে নির্ধারিত হবে।

এই সপ্তাহের খবরাখবর

মৌলভীবাজারে মুক্তিযুদ্ধের প্রজন্মের ৭১ সদস্যের কমিটি ঘোষণা

প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

কানাইঘাটে এনসিপির পদযাত্রা ঘিরে টানটান উত্তেজনা

প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বন্দরবাজারের আবাসিক হোটেলে ব্যবসায়ীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার

প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সোনালী ব্যাংক ও গোয়াইনঘাট কলেজের চুক্তি স্বাক্ষর

প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বাতাসের মাঝে গান শোনা নিয়ে প্রশ্ন ববি হাজ্জাজের

প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বিষয়বস্তু

কানাইঘাটে এনসিপির পদযাত্রা ঘিরে টানটান উত্তেজনা

প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বন্দরবাজারের আবাসিক হোটেলে ব্যবসায়ীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার

প্রকাশ: ৩০ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সোনালী ব্যাংক ও গোয়াইনঘাট কলেজের চুক্তি স্বাক্ষর

প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বাতাসের মাঝে গান শোনা নিয়ে প্রশ্ন ববি হাজ্জাজের

প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

দক্ষিণ আফ্রিকায় ভয়াবহ আগুনে ৬ বাংলাদেশি নিহত

প্রকাশ: ২৮ জুলাই  ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আয়োজনে কমিশন পুরোপুরি প্রস্তুত: সিইসি

প্রকাশ:২৮ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের...

জাপানে ৭.১ মাত্রার ভয়াবহ ভূমিকম্প, সুনামি সতর্কতা

প্রকাশ: ২৮ জুলাই  ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সম্পর্কিত নিবন্ধ

জনপ্র্যিয় পেজ