প্রকাশ: ২৪ জুলাই ২০২৬ | সময়ের সন্ধান ডেস্ক | সময়ের সন্ধান অনলাইন
বাংলাদেশের পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে কোনো শুল্ক আরোপ করেনি বলে মন্তব্য করেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি বলেছেন, সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে যে শুল্কসংক্রান্ত আলোচনা চলছে, সেটিকে ‘নতুন শুল্ক’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না। বরং আগে কার্যকর থাকা শুল্কের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর আইনগত প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে সেটি পুনঃস্থাপন বা রিপ্লেসমেন্ট করা হচ্ছে। তাই শুল্ক পরিস্থিতিতে বাস্তবিক অর্থে কোনো পরিবর্তন ঘটেনি বলে দাবি করেন তিনি।
শুক্রবার সিলেটে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে বাণিজ্যমন্ত্রী এ মন্তব্য করেন। তিনি সিলেট সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে চা শ্রমিকদের জন্য আয়োজিত দিনব্যাপী বিনামূল্যে মেডিক্যাল ক্যাম্প, পরিবার পরিকল্পনা, মা ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা এবং চক্ষু চিকিৎসা ক্যাম্পের উদ্বোধন শেষে বিভিন্ন সমসাময়িক বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দেন।
যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি নিয়ে সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদন প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, আগে যে শুল্ক কার্যকর ছিল, সেটি আইনি বাধ্যবাধকতার কারণে নির্দিষ্ট সময় শেষে মেয়াদোত্তীর্ণ হবে। এরপর একই ধরনের নতুন আদেশ কার্যকর হবে। ফলে এটি নতুন করে শুল্ক আরোপ নয়, বরং আগের ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা। তার ভাষায়, ‘এটিকে নতুন শুল্ক না বলে রিপ্লেসমেন্ট বা পুনঃস্থাপন বলা অধিকতর সঠিক।’
তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় রাত ১২টার পরও কার্যত আগের শুল্ক কাঠামোই বহাল থাকবে। কেবল প্রশাসনিক ও আইনি কাঠামোর কারণে এর নাম বা কার্যকরী আদেশে পরিবর্তন আসবে। তাই বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের অযথা উদ্বিগ্ন হওয়ার প্রয়োজন নেই বলেও তিনি ইঙ্গিত দেন।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশসহ যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদারের পণ্যের ওপর ১০ থেকে ১২ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত নতুন শুল্ক কার্যকর হতে পারে। এসব প্রতিবেদন প্রকাশের পর দেশের রপ্তানি খাত, বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্প ও ব্যবসায়ী মহলে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। তবে সরকারের পক্ষ থেকে বাণিজ্যমন্ত্রীর এই বক্তব্য পরিস্থিতি সম্পর্কে ভিন্ন ব্যাখ্যা তুলে ধরেছে।
মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির (ইউএস ট্রেড রিপ্রেজেন্টেটিভ) কার্যালয়ের সাম্প্রতিক বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশসহ প্রায় ৬০টি বাণিজ্যিক অংশীদারের কাছ থেকেই যুক্তরাষ্ট্র তার মোট আমদানির প্রায় ৯৯ দশমিক ৪ শতাংশ সংগ্রহ করে। ফলে এসব দেশের ওপর কার্যকর যেকোনো শুল্কনীতি বৈশ্বিক বাণিজ্যে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশ্লেষকদের মতে, শুল্ক কাঠামোয় সামান্য পরিবর্তনও রপ্তানিকারক দেশগুলোর প্রতিযোগিতা সক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তবে চূড়ান্ত প্রভাব নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট পণ্যের ধরন, শুল্কের বাস্তব প্রয়োগ এবং বাজার পরিস্থিতির ওপর।
বাণিজ্যমন্ত্রী আরও জানান, সরকার আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবে কাজ করছে এবং দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার বিষয়ে সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে।
সাংবাদিকদের আরেক প্রশ্নের জবাবে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রসঙ্গেও কথা বলেন বাণিজ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কিছুটা বাড়লেও এই মুহূর্তে দেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই। পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং জনগণের স্বার্থ বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
এর আগে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, দেশের চা-বাগান অঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে সরকার বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। তিনি বলেন, চা শ্রমিকদের জন্য নিয়মিত মেডিক্যাল ক্যাম্প চালু করা গেলে শহরে না গিয়েও তারা নিজ এলাকাতেই প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা পাবেন, যা তাদের সময় ও অর্থ উভয়ই সাশ্রয় করবে।
তিনি আরও বলেন, চা-বাগান এলাকার মানুষের জন্য স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি পরিবার পরিকল্পনা, মাতৃস্বাস্থ্য ও শিশুসেবার মতো মৌলিক সেবাগুলো সহজলভ্য করা সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের মাধ্যমে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবার মান উন্নয়ন সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী, সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রেজাউল হাসান কয়েস লোদী, সংসদ সদস্য এমরান আহমদ চৌধুরী, সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. জিয়াউর রহমান চৌধুরী, মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এমদাদ হোসেনসহ প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বৈশ্বিক বাণিজ্যে শুল্কনীতি পরিবর্তনের খবর প্রকাশিত হলে রপ্তানিকারক দেশগুলোর মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ সৃষ্টি হয়। তবে কোনো সিদ্ধান্তের প্রকৃত প্রভাব মূল্যায়নের আগে সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারি ব্যাখ্যা, যুক্তরাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক নীতিপত্র এবং বাস্তব প্রয়োগের বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রপ্তানি খাতের গুরুত্বপূর্ণ অবদান থাকায় এ ধরনের আন্তর্জাতিক নীতিগত পরিবর্তন ব্যবসায়ী ও শিল্প উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
এদিকে সরকার বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারের পরিবর্তন, বৈশ্বিক বাণিজ্যনীতি এবং রপ্তানি খাতের স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে। একই সঙ্গে দেশের রপ্তানিকারকদের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা ধরে রাখতে সরকার নীতিগত সহায়তা প্রদানেও সচেষ্ট থাকবে।


