প্রকাশ: ২৪ জুলাই ২০২৬ | সময়ের সন্ধান ডেস্ক | সময়ের সন্ধান অনলাইন
ভারতের আসাম অঞ্চলে সাম্প্রতিক বন্যার পানি ধীরে ধীরে নেমে আসতে শুরু করায় তার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নদ-নদীগুলোতে। সীমান্তঘেঁষা সিলেটের প্রধান দুই নদী সুরমা ও কুশিয়ারার পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। কয়েকটি পয়েন্টে নদীর পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি কিংবা তার ওপরে প্রবাহিত হওয়ায় স্থানীয় মানুষের মধ্যে কিছুটা উদ্বেগ তৈরি হলেও পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জানিয়েছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে বড় ধরনের বন্যার আশঙ্কা নেই। আবহাওয়ার পূর্বাভাস এবং উজানের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে সংস্থাটি বলছে, নতুন করে ভারি বৃষ্টিপাত না হলে নদীর পানি কিছুটা বাড়লেও তা ভয়াবহ বন্যার রূপ নেবে না।
সিলেটের নদ-নদীর পানির প্রবাহ মূলত ভারতের মেঘালয় ও আসাম অঞ্চল থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং বর্ষণের ওপর নির্ভরশীল। বর্ষা মৌসুমে উজানে অতিবৃষ্টি হলেই কয়েক ঘণ্টা বা এক-দুই দিনের ব্যবধানে এর প্রভাব সিলেট অঞ্চলের নদীগুলোতে দেখা যায়। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। আসামের বন্যার পানি নিম্নাঞ্চলের দিকে নেমে আসায় সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পেয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের সর্বশেষ পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) সকাল ৯টা পর্যন্ত সুরমা নদীর কানাইঘাট পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার মাত্র ৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। এর আগে একই পয়েন্টে নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করেছিল। তবে সিলেট শহরসংলগ্ন পয়েন্টে পানির উচ্চতা কিছুটা কমেছে, যা স্থানীয়দের জন্য স্বস্তির খবর।
অন্যদিকে কুশিয়ারা নদীর বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রেও ভিন্ন ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। আমলশীদ পয়েন্টে নদীর পানি বিপৎসীমার ৬ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হলেও ফেঞ্চুগঞ্জ পয়েন্টে তা বিপৎসীমার ৩৭ সেন্টিমিটার ওপরে অবস্থান করছে। শেওলা ও শেরপুর পয়েন্টে এখনো পানি বিপৎসীমার নিচে রয়েছে। একই সঙ্গে সারিগোয়াইন, পিয়াইন, লোভা ও ধলাই নদীর পানিও আগের তুলনায় কিছুটা কমেছে এবং এসব নদীর পানি এখনো বিপৎসীমা অতিক্রম করেনি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সীমান্তবর্তী নদীগুলোর পানির উচ্চতা নির্ধারণে স্থানীয় বৃষ্টিপাতের পাশাপাশি উজানের পরিস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের আসাম ও মেঘালয়ের পাহাড়ি এলাকায় টানা ভারি বর্ষণ হলে অল্প সময়ের মধ্যেই সিলেটের নদীগুলোতে পানির চাপ বেড়ে যায়। তবে বর্তমানে উজানেও বৃষ্টিপাত কমেছে এবং নতুন করে অতিভারী বৃষ্টির পূর্বাভাস না থাকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সিলেট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী দীপক রঞ্জন দাশ জানিয়েছেন, আসামে বন্যার পানি নামার কারণে সুরমা ও কুশিয়ারা নদীতে পানির প্রবাহ কিছুটা বেড়েছে। তবে বর্তমান আবহাওয়া পরিস্থিতি বিবেচনায় সিলেট, ভারতের আসাম কিংবা মেঘালয়ে নতুন করে ভারি বর্ষণের সম্ভাবনা নেই। ফলে নদীর পানি সামান্য বাড়লেও বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা নেই। তিনি জানান, পানি উন্নয়ন বোর্ড সার্বক্ষণিকভাবে নদীর পানির উচ্চতা পর্যবেক্ষণ করছে এবং পরিস্থিতির যেকোনো পরিবর্তন দ্রুত সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে জানানো হবে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই জানান, বর্ষা মৌসুম এলেই সুরমা ও কুশিয়ারার পানি বৃদ্ধি তাদের জন্য দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে নদীতীরবর্তী নিম্নাঞ্চলের মানুষ অতীতের ভয়াবহ বন্যার অভিজ্ঞতা থেকে এখনো আতঙ্ক কাটিয়ে উঠতে পারেননি। তবে এবারের পরিস্থিতিতে প্রশাসনের আশ্বাস এবং আবহাওয়ার অনুকূল পূর্বাভাস কিছুটা স্বস্তি এনে দিয়েছে।
আবহাওয়াবিদদের মতে, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নদীগুলোর পানি দ্রুত বাড়া কিংবা কমার অন্যতম কারণ হলো পাহাড়ি ঢল। উজানে বৃষ্টি কমে গেলে নদীর পানি তুলনামূলক দ্রুত স্থিতিশীল হয়ে আসে। তবে বর্ষা মৌসুম শেষ না হওয়া পর্যন্ত নদীর পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। কারণ আবহাওয়ার পরিবর্তন খুব অল্প সময়ের মধ্যেই পরিস্থিতিকে ভিন্ন দিকে নিয়ে যেতে পারে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সম্ভাব্য যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলা প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো প্রস্তুত রয়েছে। নদীর পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি পৌঁছালেও কোথাও বড় ধরনের বাঁধঝুঁকি কিংবা নদীভাঙনের খবর পাওয়া যায়নি। তবুও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিয়মিত নজরদারি অব্যাহত রাখা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দক্ষিণ এশিয়ায় বর্ষার ধরনে পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। অল্প সময়ে অতিবৃষ্টি এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের কারণে সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোতে আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি আগের তুলনায় বেড়েছে। তাই নদী ব্যবস্থাপনা, আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা এবং সীমান্তবর্তী অঞ্চলের তথ্য বিনিময় আরও কার্যকর করা প্রয়োজন। এতে সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলা সহজ হবে এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও কমানো সম্ভব হবে।
সিলেটের মানুষ এখনো সতর্ক দৃষ্টিতে নদীগুলোর পানির গতিপ্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করছেন। যদিও সরকারি সংস্থাগুলো বলছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে আতঙ্কের কোনো কারণ নেই, তবুও বর্ষা মৌসুম চলমান থাকায় নদীর পানি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। পানি উন্নয়ন বোর্ডও জানিয়েছে, আবহাওয়া ও উজানের পরিস্থিতির ওপর সার্বক্ষণিক নজর রাখা হচ্ছে এবং পরিস্থিতির পরিবর্তন হলে দ্রুত জনসাধারণকে অবহিত করা হবে।

