প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়ায় বড় পদক্ষেপ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একীভূত পাঁচ ব্যাংক নিয়ে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীদের অর্থ পরিশোধে রোববার পাঁচ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তারল্য সহায়তা দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এই অর্থের জোগান দেওয়ার পর সোমবার থেকে আবেদন করা গ্রাহকদের আমানতের মূল টাকা ফেরত দেওয়ার কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
ব্যাংক খাতে দীর্ঘদিনের আস্থার সংকটের মধ্যে এই অর্থ ফেরত কার্যক্রমকে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ, একদিকে বিপুলসংখ্যক আমানতকারী দীর্ঘ অপেক্ষার পর নিজেদের সঞ্চয়ের অর্থ হাতে পাওয়ার প্রত্যাশায় রয়েছেন, অন্যদিকে এত বড় অঙ্কের অর্থ একসঙ্গে পরিশোধের ক্ষেত্রে ব্যাংকের তারল্য ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক সক্ষমতাও যাচাই হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রাথমিক কার্যক্রমে বড় ধরনের কোনো জটিলতার খবর পাওয়া যায়নি।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ১ সেপ্টেম্বর থেকে রোববার পর্যন্ত প্রায় ৭৫ হাজার গ্রাহক তাদের আমানতের অর্থ ফেরত পাওয়ার জন্য আবেদন করেছেন। এসব আবেদনের বিপরীতে মোট প্রায় ৩ হাজার ৯২৫ কোটি টাকা উত্তোলনের দাবি এসেছে। অর্থাৎ, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দেওয়া পাঁচ হাজার কোটি টাকার বিশেষ সহায়তা দিয়ে প্রাথমিক পর্যায়ের আবেদনের বড় একটি অংশ মেটানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।
গ্রাহকদের আবেদনের চাপ থেকেই বোঝা যায়, দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা অর্থ ফেরত পাওয়ার জন্য আমানতকারীদের মধ্যে কতটা আগ্রহ ও প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। অনেকের কাছে এই অর্থ শুধু ব্যাংক হিসাবের একটি সংখ্যা নয়; পারিবারিক ব্যয়, চিকিৎসা, সন্তানের পড়াশোনা, ব্যবসা কিংবা দৈনন্দিন জীবনের জরুরি প্রয়োজন মেটানোর জন্য জমিয়ে রাখা সঞ্চয়। ফলে টাকা ফেরতের কার্যক্রম শুরু হওয়ায় অনেক আমানতকারীর মধ্যে স্বস্তি ফিরছে।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়েছে সংকটে পড়া পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করে। ব্যাংকগুলো হলো এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক। দীর্ঘ সময় ধরে এসব ব্যাংকের আমানতকারীদের একটি অংশ নিজেদের অর্থ প্রয়োজন অনুযায়ী তুলতে পারছিলেন না। ব্যাংকগুলোর আর্থিক দুর্বলতা, পরিচালনাগত সমস্যা এবং আস্থার সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
এর পরিপ্রেক্ষিতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক দুর্বল ব্যাংকগুলোকে একীভূত করে নতুন কাঠামোর আওতায় আনার উদ্যোগ নেয়। নতুন ব্যাংক গঠনের অন্যতম বড় উদ্দেশ্য ছিল আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষা এবং ব্যাংক খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনা। সেই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই এখন পর্যায়ক্রমে গ্রাহকদের মূল আমানত ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, একীভূত পাঁচ ব্যাংককে বিভিন্ন সময়ে মোট ৪৭ হাজার ৮৪ কোটি টাকার বিশেষ সহায়তা দেওয়া হয়েছিল। সুদসহ সেই দায়ের পরিমাণ বর্তমানে প্রায় ৫২ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। এর বাইরে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার জন্য নতুন করে পাঁচ হাজার কোটি টাকা সরবরাহ করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দৃষ্টিতে, এই অর্থ সরবরাহের ফলে সাময়িকভাবে মূল্যস্ফীতির ওপর কিছুটা চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকলেও ব্যাংক খাতে সামগ্রিক স্থিতিশীলতা এবং আমানতকারীদের আস্থা পুনর্গঠনের স্বার্থে পদক্ষেপটি প্রয়োজনীয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, গ্রাহকদের আমানত ফেরত দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীদের অর্থ পরিশোধ করা হবে। তাই গ্রাহকদের আতঙ্কিত হয়ে তাড়াহুড়ো করার প্রয়োজন নেই বলেও তিনি আশ্বস্ত করেছেন।
অর্থ ফেরতের প্রক্রিয়ায় আবেদন যাচাইয়ের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। গ্রাহকদের সংশ্লিষ্ট শাখা বা উপশাখায় গিয়ে নির্ধারিত নিয়মে আবেদন করতে হয়েছে। আবেদনে হিসাবের মোট জমার পরিমাণ, কত টাকা উত্তোলন করতে চান এবং অর্থ উত্তোলনের কারণ উল্লেখ করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। আবেদন যাচাইয়ের পর পাওনা অর্থ পরিশোধের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
ব্যাংকিং ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের মতে, বিপুলসংখ্যক আবেদন একসঙ্গে নিষ্পত্তি করতে গেলে সময় লাগতে পারে। এ কারণে আবেদন করার পর সঙ্গে সঙ্গে সব গ্রাহক টাকা হাতে নাও পেতে পারেন। আবেদন গ্রহণের সময়ক্রম, যাচাই-বাছাই এবং শাখাভিত্তিক অর্থ সরবরাহের ওপর ভিত্তি করে পর্যায়ক্রমে অর্থ ফেরত দেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে প্রথম দফায় আবেদন করা গ্রাহকদের অর্থ পরিশোধ শুরু হওয়ায় পরবর্তী আবেদনকারীদের মধ্যেও প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘোষিত ব্যবস্থার আওতায় ব্যক্তি আমানতকারীরা চলতি ও সঞ্চয়ী হিসাবের মূল অর্থ এবং মেয়াদি আমানতের মূল টাকা উত্তোলনের সুযোগ পাবেন। তবে এই বিশেষ সুবিধার আওতায় সংশ্লিষ্ট আমানতের বিপরীতে অর্জিত বা প্রাপ্য মুনাফা তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যাবে না। কোনো গ্রাহক মেয়াদি আমানতের মূল অর্থ তুলে নিলে সংশ্লিষ্ট আমানতকে পূর্ণ ও চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হবে। অন্যদিকে, হিসাব চালু রাখা হলে চুক্তি অনুযায়ী প্রযোজ্য হারে মুনাফা পাওয়ার সুযোগ থাকবে।
এর আগে ২৫ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছিল, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীদের অর্থ ফেরতের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ‘হেয়ারকাট’ থাকবে না। অর্থাৎ, নির্ধারিত ব্যবস্থার আওতায় আমানতের মূল অর্থ কমিয়ে দেওয়ার নীতি নেওয়া হয়নি। ১ সেপ্টেম্বর থেকে ব্যক্তি আমানতকারীদের প্রয়োজন অনুযায়ী মূল আমানত উত্তোলনের সুযোগ দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়। এরপর থেকেই ব্যাংকের শাখা ও উপশাখাগুলোতে আবেদন জমা দেওয়ার কার্যক্রম শুরু হয়।
প্রথম কয়েক দিনে আবেদনকারীর সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে। এক পর্যায়ে প্রতিদিন হাজার হাজার গ্রাহক অর্থ ফেরতের আবেদন করেন। এতে বিভিন্ন শাখায় গ্রাহকদের উপস্থিতিও বাড়ে। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আবেদন গ্রহণ ও যাচাইয়ের কাজ পরিকল্পিতভাবে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অর্থ সহায়তা পাওয়ার পর এখন গ্রাহকদের দাবির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পর্যায়ক্রমে অর্থ সরবরাহের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকার ২০ হাজার কোটি টাকা দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে। বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকার অংশ আমানতকারীদের শেয়ারের মাধ্যমে দেওয়ার কাঠামো রাখা হয়েছে। পাশাপাশি আমানত বীমা তহবিল থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা ব্যবহার করে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর আমানতকারীদের সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা পর্যন্ত ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে।
তবে পুরো অর্থ ফেরতের বিষয়টি একদিনে সম্পন্ন হওয়ার নয়। এজন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক পর্যায়ক্রমিক একটি কাঠামো নির্ধারণ করেছে। ঘোষিত স্কিমের বাইরে ব্যক্তি আমানতকারীদের কাছ থেকেও প্রয়োজন অনুযায়ী আবেদন নেওয়া হচ্ছে। ফলে আমানতকারীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা এবং ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী আবেদন ও যাচাই সম্পন্ন করা।
বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আমানত ফেরতের কার্যক্রম শুধু একটি ব্যাংকের গ্রাহকদের অর্থ পরিশোধের বিষয় নয়; এর সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের সামগ্রিক আস্থা ও স্থিতিশীলতার প্রশ্নও জড়িত। দীর্ঘদিন কোনো ব্যাংকের আমানতকারীরা নিজেদের অর্থ নিয়ে অনিশ্চয়তায় থাকলে তা পুরো আর্থিক ব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই দ্রুত কিন্তু সুশৃঙ্খলভাবে অর্থ ফেরত দেওয়ার পাশাপাশি ব্যাংকটির ভবিষ্যৎ আর্থিক সক্ষমতা নিশ্চিত করাও জরুরি।
বর্তমানে পাঁচ হাজার কোটি টাকার বিশেষ সহায়তা পাওয়ার পর সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো বিপুলসংখ্যক আবেদন যথাযথভাবে যাচাই করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অর্থ পরিশোধ করা। একই সঙ্গে ব্যাংকের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং আমানতকারীদের নিয়মিত তথ্য জানানোও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তার পর টাকা ফেরতের কার্যক্রম শুরু হলেও এই প্রক্রিয়ার সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবে কতটা নির্বিঘ্নে এবং ধারাবাহিকভাবে গ্রাহকদের অর্থ পরিশোধ করা যায় তার ওপর।
সব মিলিয়ে, বাংলাদেশ ব্যাংকের পাঁচ হাজার কোটি টাকার বিশেষ সহায়তা সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীদের জন্য অর্থ ফেরতের প্রক্রিয়ায় একটি বড় অগ্রগতি। প্রায় ৭৫ হাজার গ্রাহকের প্রায় ৩ হাজার ৯২৫ কোটি টাকা ফেরতের আবেদন এরই মধ্যে জমা পড়েছে। এখন এই বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রত্যাশা পূরণে কার্যক্রম কতটা দ্রুত, স্বচ্ছ ও সুশৃঙ্খলভাবে এগিয়ে নেওয়া যায়, সেটিই হয়ে উঠেছে ব্যাংকটির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।


