প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেটের বহুল আলোচিত শিশু ফাহিমা ধর্ষণচেষ্টা ও হত্যা মামলার প্রধান আসামি জাকির হোসেনকে আদালতে হাজির করার সময় বৃহস্পতিবার আদালত চত্বরে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, আদালত ভবনের দিকে নেওয়ার সময় ক্ষুব্ধ কয়েকজন ব্যক্তি জাকিরকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে মারধরের চেষ্টা করেন। তবে পুলিশের বক্তব্য ভিন্ন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, সেখানে কোনো হামলার ঘটনা ঘটেনি; কেবল সাময়িক ধাক্কাধাক্কির পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, যা দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা হয়।
বৃহস্পতিবার সকাল ১০টার দিকে সিলেট নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে শুনানির জন্য জাকির হোসেনকে সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে প্রিজন ভ্যানে করে আদালতে আনা হয়। আদালত প্রাঙ্গণে পৌঁছানোর পরপরই সেখানে উপস্থিত লোকজনের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়। নিহত শিশুটির স্বজন এবং স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা আগে থেকেই আদালত চত্বরে অবস্থান করছিলেন। তাঁদের উপস্থিতির মধ্যেই আসামিকে আদালতের ভেতরে নেওয়ার সময় পরিস্থিতি হঠাৎ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রিজন ভ্যান থেকে নামিয়ে জাকিরকে আদালত ভবনের দিকে নিয়ে যাওয়ার সময় কয়েকজন ক্ষুব্ধ ব্যক্তি তাঁর দিকে তেড়ে যান এবং শারীরিকভাবে আক্রমণের চেষ্টা করেন। এ সময় আদালত এলাকায় চিৎকার-চেঁচামেচি ও হট্টগোল শুরু হয়। দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিতে এগিয়ে আসেন। তাঁরা আসামিকে নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যে নিয়ে আদালতের ভেতরে প্রবেশ করান। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ লাঠিচার্জও করে বলে প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি।
তবে এ ঘটনার বিষয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছে সিলেট মহানগর পুলিশ। মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (গণমাধ্যম) মো. মনজুরুল আলম সাংবাদিকদের বলেন, আসামিকে পর্যাপ্ত নিরাপত্তার মধ্যেই আদালতে আনা হয়েছিল। আদালত প্রাঙ্গণে কিছু মানুষের ভিড়ের কারণে সামান্য ধাক্কাধাক্কির পরিস্থিতি তৈরি হয়। তবে এটিকে হামলা বলা ঠিক হবে না। তিনি বলেন, দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা তাৎক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন এবং জাকিরকে নিরাপদে আদালতের ভেতরে নিয়ে যান।
ঘটনার পর আদালত এলাকায় নিরাপত্তা আরও জোরদার করা হয়। অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয় এবং বিচার কার্যক্রম চলাকালে আদালত প্রাঙ্গণে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
এদিকে হামলার অভিযোগের বিষয়ে নিহত শিশু ফাহিমার পরিবারের পক্ষ থেকেও ভিন্ন বক্তব্য এসেছে। শিশুটির এক চাচা দাবি করেন, তাঁরা আসামির ওপর হামলায় জড়িত ছিলেন না। বরং তাঁরা রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীর ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করতে আদালতে এসেছিলেন। তাঁর অভিযোগ, রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আসামিপক্ষের প্রতি সহানুভূতিশীল আচরণ করছেন বলে তাঁদের মনে হয়েছে। এতে পরিবারটির মধ্যে ন্যায়বিচার পাওয়া নিয়ে উদ্বেগ ও শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
শিশু ফাহিমা হত্যা মামলাটি সিলেটসহ সারা দেশে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। চলতি বছরের ১১ মে রাতে চার বছর বয়সী শিশুটিকে ধর্ষণচেষ্টা ও হত্যার অভিযোগে প্রতিবেশী জাকির হোসেনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গ্রেপ্তারের পর থেকেই তিনি সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারে আছেন।
মামলার তদন্ত শেষে ঘটনার এক মাস পাঁচ দিন পর পুলিশ আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয়। অভিযোগপত্রে জাকির হোসেনের বিরুদ্ধে ধর্ষণচেষ্টা ও হত্যার অভিযোগ আনা হয়। একই সঙ্গে তাঁর দুই ভাই জয়নাল আহমদ ও আবুল কালামের বিরুদ্ধে মরদেহ গুমে সহযোগিতা করার অভিযোগ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার পর জাকির প্রথমে শিশুটির মরদেহ একটি ডোবায় ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করেন। তবে মরদেহ পানিতে ডুবে না যাওয়ায় সেটি ডোবার পাশেই ফেলে রেখে চলে যান। পরে স্থানীয় লোকজন মরদেহ দেখতে পেয়ে পুলিশকে খবর দেন। পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায়।
গ্রেপ্তারের পর জাকির প্রথমে পুলিশের কাছে এবং পরে আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন। তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য এবং জবানবন্দির ভিত্তিতেই পুলিশ অভিযোগপত্র প্রস্তুত করে আদালতে জমা দেয়।
এর আগে ১২ মে সিলেট মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে উপ-কমিশনার (উত্তর) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম মামলার প্রাথমিক তদন্তের তথ্য তুলে ধরেন। তিনি জানান, ঘটনার দিন সকালে শিশুটিকে একটি দোকান থেকে সিগারেট এনে দিতে পাঠানো হয়েছিল। সিগারেট এনে দেওয়ার পর জাকির শিশুটিকে নিজের ঘরে ডেকে নেন। সে সময় তাঁর স্ত্রী বাড়িতে ছিলেন না। তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ঘরের দরজা বন্ধ করে শিশুটিকে ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়।
তবে পুলিশ সে সময়ও জানিয়েছিল, ধর্ষণের অভিযোগটি চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত হওয়ার জন্য স্বাস্থ্য পরীক্ষার প্রতিবেদন গুরুত্বপূর্ণ। তদন্তের বিভিন্ন ধাপ সম্পন্ন হওয়ার পরই আদালতে পূর্ণাঙ্গ অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়।
শিশু ফাহিমার মৃত্যুর ঘটনায় সিলেটজুড়ে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল। বিভিন্ন সামাজিক ও মানবাধিকার সংগঠন দ্রুত বিচার এবং দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানিয়ে কর্মসূচি পালন করে। মামলাটি বর্তমানে সিলেট নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন রয়েছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বিচারাধীন মামলার আসামির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। একই সঙ্গে ভুক্তভোগী পরিবারের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাও বিচার ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। আদালত প্রাঙ্গণে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার ঘটনা বিচারিক প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই বিচারিক কার্যক্রম চলাকালে আদালতের নিরাপত্তা এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমানে মামলার বিচার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। আদালতের পরবর্তী নির্দেশনা এবং সাক্ষ্যগ্রহণের মাধ্যমে মামলাটি এগিয়ে যাবে। এদিকে আদালত চত্বরে সৃষ্ট উত্তেজনাকর পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে পুলিশের ভূমিকা, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং নিহত শিশুর পরিবারের অভিযোগ—সব মিলিয়ে ঘটনাটি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলছে, আইন ও সংবিধান অনুযায়ী বিচারিক প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে এবং মামলার নিষ্পত্তি আদালতের মাধ্যমেই হবে।


