প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
দীর্ঘ সাত বছর প্রবাসজীবনের কঠোর পরিশ্রম শেষে পরিবারের কাছে ফেরার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছিলেন মৌলভীবাজারের ফখরুল ইসলাম। প্রিয়জনদের সঙ্গে পুনর্মিলনের অপেক্ষায় ছিলেন তিনি, আর পরিবারও অধীর আগ্রহে গুনছিল দিন। কিন্তু সেই প্রতীক্ষার অবসান ঘটল এক হৃদয়বিদারক ঘটনায়। দেশে ফেরার পথে বিমানের মধ্যেই গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। জীবন বাঁচাতে বিমানটি জর্জিয়ায় জরুরি অবতরণ করানো হলেও শেষ পর্যন্ত চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। পরিবারের সদস্যদের কাছে তাই আনন্দের প্রত্যাবর্তন পরিণত হয়েছে গভীর শোকের সংবাদে।
স্বজনদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত সোমবার (১৩ জুলাই) জর্জিয়ার একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান ফখরুল ইসলাম। তিনি মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা পৌর শহরের মহুবন্দ গ্রামের বাসিন্দা এবং আব্দুল অকিদের ছেলে। দীর্ঘদিন ধরে ইতালিতে বসবাস ও কর্মরত ছিলেন তিনি। দেশে ফিরে পরিবার-পরিজনের সঙ্গে সময় কাটানোর পাশাপাশি ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের স্বপ্ন নিয়েই তিনি বাংলাদেশগামী বিমানে উঠেছিলেন।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, প্রায় সাত বছর আগে জীবিকার সন্ধানে ইতালিতে পাড়ি জমান ফখরুল ইসলাম। সেখানে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। প্রবাসে থেকেও পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন এবং দেশে ফিরে নতুনভাবে জীবন শুরু করার পরিকল্পনা করেছিলেন। তার ফেরার খবরকে ঘিরে পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশীদের মধ্যেও আনন্দের আবহ তৈরি হয়েছিল।
জানা গেছে, ইতালি থেকে তুর্কি এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে বাংলাদেশে ফিরছিলেন তিনি। যাত্রাপথে হঠাৎ বিমানের মধ্যেই গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। তার শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হলে বিমানের ক্রুরা জরুরি চিকিৎসাসেবা দেওয়ার চেষ্টা করেন। একই সঙ্গে পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় বিমানটির নির্ধারিত রুট পরিবর্তন করে জর্জিয়ায় জরুরি অবতরণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বিমান অবতরণের পর ফখরুল ইসলামকে দ্রুত স্থানীয় একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকরা তাকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখে চিকিৎসা শুরু করেন। তবে সব ধরনের চিকিৎসা প্রচেষ্টা সত্ত্বেও তাকে আর বাঁচানো সম্ভব হয়নি। চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার মৃত্যুর খবর পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে মৌলভীবাজারে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে নেমে আসে শোকের ছায়া।
ফখরুল ইসলামের মামা লাল মিয়া জানান, সোমবার রাতেই তারা জর্জিয়া থেকে মৃত্যুর সংবাদ পান। এমন একটি খবরের জন্য পরিবার মোটেও প্রস্তুত ছিল না। দীর্ঘদিন পর পরিবারের সবাই যাকে বরণ করে নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, সেই মানুষটির মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রস্তুতি নিতে হবে—এ বাস্তবতা তারা এখনো মেনে নিতে পারছেন না।
তিনি আরও জানান, বর্তমানে জর্জিয়া ও বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। এ বিষয়ে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলোর সহযোগিতা কামনা করেছেন পরিবারের সদস্যরা। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সম্পন্ন হলে মরদেহ দেশে আনা সম্ভব হবে বলে তারা আশা করছেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ফখরুল ইসলাম ছিলেন শান্ত, ভদ্র ও পরিশ্রমী একজন মানুষ। প্রবাসে থেকেও তিনি পরিবারের দায়িত্ব পালনে কখনো অবহেলা করেননি। তার উপার্জনের ওপর নির্ভর করেই পরিবারের অনেক প্রয়োজন মেটানো হতো। হঠাৎ তার মৃত্যুতে শুধু পরিবার নয়, পুরো এলাকায় শোকের আবহ বিরাজ করছে।
প্রবাসজীবন বাংলাদেশের লাখো মানুষের জন্য অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিলেও এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে নানা ধরনের ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তা। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, মানসিক চাপ, পরিবার থেকে বছরের পর বছর দূরে থাকা এবং স্বাস্থ্যগত নানা জটিলতা অনেক সময় প্রবাসীদের জীবনে বড় ধরনের সংকট তৈরি করে। দেশে ফেরার পথে বা কর্মস্থলে অসুস্থ হয়ে মৃত্যুর মতো ঘটনাও মাঝেমধ্যে ঘটছে, যা প্রতিবারই স্বজনদের জন্য গভীর বেদনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দীর্ঘ ভ্রমণের আগে প্রবাসীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং শারীরিক অবস্থার বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে জরুরি চিকিৎসাসেবা আরও কার্যকরভাবে নিশ্চিত করা এবং বিদেশে মৃত্যুবরণকারী বাংলাদেশিদের মরদেহ দ্রুত দেশে আনার প্রক্রিয়া সহজ ও দ্রুততর করার দিকেও গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
প্রবাসী বাংলাদেশিদের কল্যাণে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠনও বলছে, বিদেশে কোনো বাংলাদেশি অসুস্থ বা মৃত্যুবরণ করলে দ্রুত কনস্যুলার সহায়তা, প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া এবং মরদেহ দেশে পাঠানোর বিষয়ে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। এতে শোকাহত পরিবারের দুর্ভোগ অনেকাংশে কমানো সম্ভব হবে।
ফখরুল ইসলামের মৃত্যুর ঘটনায় মৌলভীবাজারের বড়লেখা এলাকায় গভীর শোকের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা তার পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন। সবাই এখন অপেক্ষা করছেন, যত দ্রুত সম্ভব যেন তার মরদেহ দেশে পৌঁছে স্বজনদের শেষ বিদায়ের সুযোগ করে দেওয়া হয়। পরিবারের একমাত্র প্রত্যাশা, বহু বছরের প্রবাসজীবন শেষে অন্তত নিজের জন্মভূমির মাটিতেই যেন চিরনিদ্রায় শায়িত হতে পারেন ফখরুল ইসলাম।


