প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
দীর্ঘদিনের অবহেলা, কচুরিপানার দখল, আবর্জনার স্তূপ এবং অপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার কারণে সিলেট নগরের দক্ষিণ সুরমার খোজারখলা এলাকার ঐতিহ্যবাহী একটি পুকুর ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলেছিল তার অস্তিত্ব ও সৌন্দর্য। একসময় স্থানীয় মানুষের নিত্যপ্রয়োজন, পরিবেশের ভারসাম্য এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এই জলাধার এখন পরিণত হয়েছে পরিবেশ দূষণ ও জনস্বাস্থ্য ঝুঁকির অন্যতম উৎসে। তবে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অবশেষে সেই পুকুরটি পুনরুদ্ধারে উদ্যোগ নিয়েছে সিলেট সিটি কর্পোরেশন (সিসিক)। প্রশাসনের এ উদ্যোগে নতুন করে আশার আলো দেখছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী দক্ষিণ সুরমার খোজারখলা সমাজকল্যাণ সংঘের পেছনে অবস্থিত পুকুরটি সরেজমিনে পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনের সময় তিনি পুকুরটির বর্তমান বেহাল অবস্থা দেখে দ্রুত সংস্কার ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে অল্প সময়ের মধ্যে পুকুরটিকে জনসাধারণের ব্যবহারের উপযোগী করে তোলার নির্দেশনা দেন।
পরিদর্শন শেষে সিসিক প্রশাসক বলেন, একসময় এই পুকুর স্থানীয় মানুষের দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। বিভিন্ন গৃহস্থালি কাজে ব্যবহার থেকে শুরু করে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায়ও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে পুকুরটি কচুরিপানা, ময়লা-আবর্জনা ও আগাছায় ভরে গেছে। এর ফলে এটি এখন আর কোনো উপকারে আসছে না; বরং পরিবেশ দূষণ এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য নতুন করে ঝুঁকি তৈরি করছে। তিনি বলেন, একটি গুরুত্বপূর্ণ জলাধারকে এভাবে ধ্বংস হতে দেওয়া যায় না। তাই দ্রুত এটি পরিষ্কার করে পুনরায় ব্যবহার উপযোগী করা হবে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বহু বছর ধরে পুকুরটির কোনো সংস্কার হয়নি। ধীরে ধীরে পুরো জলাধার কচুরিপানায় ঢেকে যায় এবং আশপাশের মানুষ সেখানে বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য ফেলতে শুরু করেন। ফলে পুকুরের পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ হয়ে দুর্গন্ধ ছড়াতে থাকে। বর্ষা মৌসুমে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। পচা পানি ও ময়লার কারণে আশপাশে মশার উপদ্রব বেড়ে যায়, যা স্থানীয়দের জন্য স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
তারা আরও জানান, পুকুরটির চারপাশে কোনো নিরাপত্তা বেষ্টনী না থাকায় শিশুদের দুর্ঘটনার আশঙ্কাও দীর্ঘদিন ধরে ছিল। অনেক অভিভাবক সন্তানদের ওই এলাকার কাছেও যেতে দেন না। ফলে একসময় এলাকার প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত জলাধারটি ধীরে ধীরে পরিত্যক্ত স্থানে পরিণত হয়েছে।
সিটি কর্পোরেশনের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম ধাপে পুকুর থেকে কচুরিপানা, আগাছা ও আবর্জনা অপসারণ করা হবে। এরপর প্রয়োজনীয় খননকাজের মাধ্যমে জলাধারের ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি করা হবে। পাশাপাশি পুকুরের চারপাশে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ, পরিবেশবান্ধব সৌন্দর্যবর্ধন এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থাও গ্রহণ করা হবে।
সিসিক প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, নগরীর প্রতিটি জলাধার সংরক্ষণ করা সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দাবি। জলাধারগুলো শুধু সৌন্দর্য নয়, বরং জলাবদ্ধতা নিরসন, ভূগর্ভস্থ পানির ভারসাম্য রক্ষা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং নগর পরিবেশ উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তিনি বলেন, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণে সিটি কর্পোরেশন ধারাবাহিকভাবে কাজ করছে এবং খোজারখলা পুকুরের সংস্কার সেই বৃহত্তর উদ্যোগেরই একটি অংশ।
তিনি স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রতিও আহ্বান জানান, পুকুর ও এর আশপাশে যেন কেউ ময়লা-আবর্জনা না ফেলেন। শুধু প্রশাসনের উদ্যোগ নয়, নাগরিকদের সচেতন অংশগ্রহণও একটি জলাধারকে দীর্ঘদিন সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
পরিবেশবিদদের মতে, নগরায়ণের ফলে দেশের বিভিন্ন শহরে প্রাকৃতিক জলাধারের সংখ্যা দ্রুত কমে যাচ্ছে। অনেক পুকুর ভরাট হয়ে যাচ্ছে কিংবা অব্যবস্থাপনার কারণে ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। এর ফলে জলাবদ্ধতা, পরিবেশ দূষণ এবং নগরবাসীর জীবনযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। তাই বিদ্যমান জলাধারগুলো সংরক্ষণ এবং পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ সময়োপযোগী ও প্রয়োজনীয়।
তাদের মতে, একটি পুকুর কেবল পানির আধার নয়; এটি একটি এলাকার পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পরিকল্পিতভাবে সংস্কার করা হলে খোজারখলা পুকুরও স্থানীয় মানুষের জন্য একটি উপকারী জলাধার এবং পরিবেশবান্ধব উন্মুক্ত স্থানে পরিণত হতে পারে।
পুকুর পরিদর্শনের সময় সিসিকের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী শামসুল হক উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও এলাকাবাসীও প্রশাসকের সঙ্গে মতবিনিময় করেন এবং দ্রুত সংস্কারকাজ শুরু করার দাবি জানান।
এর আগে একই দিন সিসিক প্রশাসক খোজারখলা ই-ব্লক এলাকা এবং আল ফালাহ মসজিদ পরিদর্শন করেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ই-ব্লকের সড়ক প্রশস্তকরণ ও সংস্কারের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশ দেন। পরিদর্শনকালে মসজিদের ভারপ্রাপ্ত মোতওয়াল্লী ইফতেখার হোসেন, কোষাধ্যক্ষ আব্দুল বাসিত, ২৫ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি ইকবাল কামাল, সাধারণ সম্পাদক মোশাহিদ আহমদ, সাংগঠনিক সম্পাদক ফয়েজ উদ্দিন শিপুসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও এলাকাবাসী উপস্থিত ছিলেন।
স্থানীয়দের আশা, সিটি কর্পোরেশনের ঘোষিত উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়িত হলে বহু বছরের অবহেলায় হারিয়ে যাওয়া খোজারখলা পুকুর আবারও তার স্বাভাবিক রূপ ফিরে পাবে। একই সঙ্গে এটি শুধু একটি জলাধার হিসেবেই নয়, বরং পরিবেশ সংরক্ষণ, জনস্বাস্থ্য উন্নয়ন এবং নগরবাসীর জন্য একটি নিরাপদ ও উপযোগী উন্মুক্ত স্থান হিসেবে নতুন পরিচয় লাভ করবে।

