প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেটের বিয়ানীবাজারে মাত্র ছয় হাজার টাকার বকেয়া পাওনা নিয়ে বিরোধের জেরে এক ব্যবসায়ীকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত প্রধান দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব-৯)। ঘটনার মাত্র ৭২ ঘণ্টার মধ্যেই পৃথক অভিযানে তাদের আটক করা হয়। এ ঘটনায় স্থানীয় এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। একটি সামান্য আর্থিক বিরোধ কীভাবে প্রাণঘাতী সহিংসতায় রূপ নিতে পারে, সেই প্রশ্নও নতুন করে সামনে এসেছে।
র্যাব জানিয়েছে, বুধবার (১৫ জুলাই) ভোর থেকে সকাল পর্যন্ত সিলেট জেলার গোলাপগঞ্জ উপজেলার দুটি স্থানে পৃথক অভিযান চালিয়ে মামলার এজাহারভুক্ত প্রধান দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রথম অভিযানটি সকাল আনুমানিক ৬টার দিকে লক্ষ্যনাবন্ধ ইউনিয়নের ফুলসাইন এলাকায় এবং দ্বিতীয় অভিযানটি সকাল ৯টার দিকে কানাগাঁও উত্তর বাদেপাশা এলাকায় পরিচালিত হয়।
গ্রেপ্তার হওয়া দুই ব্যক্তি হলেন আইনুল ইসলাম (২২) ও শাহীনুর ইসলাম (৩০)। তারা দুজনেই সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলার বিবিরাই এলাকার বাসিন্দা এবং মনিয়া মিয়ার ছেলে। তাদের বিরুদ্ধে বিয়ানীবাজার থানায় দায়ের করা হত্যা মামলায় সরাসরি সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে।
র্যাব-৯ সূত্রে জানা গেছে, নিহত আলী হোসেন (৩৮) বিয়ানীবাজার উপজেলার বিবিরাই এলাকার বাসিন্দা ছিলেন। তিনি স্থানীয় বিবিরাই বাজারে দীর্ঘদিন ধরে জ্বালানি তেলসহ বিভিন্ন পণ্যের ব্যবসা পরিচালনা করতেন। একই এলাকার বাসিন্দা হওয়ায় অভিযুক্তরা নিয়মিত তার দোকান থেকে নগদ ও বাকিতে পণ্য কিনতেন।
তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ঘটনার প্রায় এক সপ্তাহ আগে শাহীনুর ইসলাম আলী হোসেনের দোকান থেকে ছয় হাজার টাকার ডিজেল বাকিতে নেন। পরে গত ১১ জুলাই রাত আনুমানিক ৮টার দিকে তিনি আবারও জ্বালানি তেল কিনতে দোকানে গেলে ব্যবসায়ী আলী হোসেন আগের বকেয়া টাকা পরিশোধের অনুরোধ জানান। অভিযোগ অনুযায়ী, এ কথা বলতেই শাহীনুর ইসলাম ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন এবং অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ শুরু করেন।
র্যাবের ভাষ্যমতে, একপর্যায়ে শাহীনুর ইসলামের ডাকে আরও কয়েকজন ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। এরপর অভিযুক্তরা সংঘবদ্ধভাবে আলী হোসেনকে মারধর করেন। তাকে শরীরের বিভিন্ন স্থানে এলোপাতাড়ি কিল-ঘুষি ও শারীরিকভাবে আঘাত করা হয়। হামলার সময় তাকে হত্যার হুমকিও দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। গুরুতর আহত অবস্থায় অভিযুক্তরা ঘটনাস্থল ত্যাগ করলে স্থানীয় লোকজন দ্রুত আলী হোসেনকে উদ্ধার করে বিয়ানীবাজার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
ঘটনার পর নিহতের ভাই বাদী হয়ে বিয়ানীবাজার থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলাটি দায়েরের পর থেকেই র্যাব-৯ ছায়া তদন্ত শুরু করে এবং অভিযুক্তদের অবস্থান শনাক্তে গোয়েন্দা তৎপরতা জোরদার করে। প্রযুক্তিগত তথ্য, স্থানীয় সূত্র এবং গোপন সংবাদের ভিত্তিতে তাদের অবস্থান নিশ্চিত হওয়ার পর বুধবার ভোরে অভিযান পরিচালনা করা হয়।
র্যাব জানিয়েছে, গ্রেপ্তার হওয়া দুই আসামি বিয়ানীবাজার থানায় দায়ের করা হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত এক ও দুই নম্বর আসামি। তাদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ৩০২/৩৪ ধারায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। অভিযান শেষে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য তাদের বিয়ানীবাজার থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে।
র্যাব-৯-এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মিডিয়া) কে এম শহিদুল ইসলাম সোহাগ বলেন, হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই আসামিদের গ্রেপ্তারে র্যাবের গোয়েন্দা কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছিল। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা এবং গোপন সংবাদের ভিত্তিতে দুই আসামিকে সফলভাবে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে। তিনি জানান, পরবর্তী আইনি কার্যক্রম পরিচালনার জন্য তাদের সংশ্লিষ্ট থানার কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে র্যাবের গোয়েন্দা নজরদারি ও অপরাধবিরোধী অভিযান অব্যাহত থাকবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, আলী হোসেন এলাকায় একজন পরিচিত ব্যবসায়ী ছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে তিনি ব্যবসা পরিচালনা করলেও এ ধরনের মর্মান্তিক পরিণতির কথা কেউ কল্পনাও করেননি। তারা মনে করছেন, সামান্য অর্থনৈতিক বিরোধকে কেন্দ্র করে সহিংসতার ঘটনা সমাজে উদ্বেগজনক প্রবণতার ইঙ্গিত বহন করে। তাদের দাবি, এ ঘটনায় জড়িত অন্য কেউ থাকলে তাকেও দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
আইনশৃঙ্খলা বিশ্লেষকদের মতে, ব্যক্তিগত বিরোধ, আর্থিক লেনদেন কিংবা ক্ষুদ্র ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব অনেক সময় সংযমের অভাবে ভয়াবহ অপরাধে রূপ নেয়। এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে সামাজিক সচেতনতা, বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দ্রুত পদক্ষেপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের মধ্যেও আইনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ এবং সহিংসতার পরিবর্তে আইনি পথ অনুসরণের মানসিকতা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন তারা।
এদিকে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এলাকায় শোকের পাশাপাশি ক্ষোভও বিরাজ করছে। নিহতের স্বজনরা সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে মামলার সব আসামিকে গ্রেপ্তার এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মামলার বাকি অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে এবং তদন্তে নতুন তথ্য পাওয়া গেলে সে অনুযায়ী পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।


