প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
বর্ষা মৌসুমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলায় সম্ভাব্য যেকোনো দুর্যোগ মোকাবেলায় সর্বোচ্চ প্রস্তুতির ঘোষণা দিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। আগাম সতর্কতা, সমন্বিত পরিকল্পনা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দেওয়ার লক্ষ্যে উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও প্রস্তুতি বিষয়ক এক গুরুত্বপূর্ণ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় প্রশাসনের কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, স্বাস্থ্য বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিরা অংশ নিয়ে দুর্যোগ মোকাবেলায় সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) দুপুরে শাল্লা উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে উপজেলা সম্মেলন কক্ষে এ প্রস্তুতি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পিয়াস চন্দ্র দাস। সভার মূল উদ্দেশ্য ছিল সম্ভাব্য বন্যা কিংবা অন্য যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলায় সরকারি প্রস্তুতি পর্যালোচনা, সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর দায়িত্ব নির্ধারণ এবং স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত সহায়তা নিশ্চিত করার কৌশল নির্ধারণ করা।
সভায় উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা দেবব্রত আইচ মজুমদার, শাল্লা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) রোকিবুজ্জামান, বীর মুক্তিযোদ্ধা বলরাম দাস, সিরাজুল ইসলাম সিরাজ, সাবেক উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান গনেন্দ্র চন্দ্র সরকার, উপজেলা বিএনপির প্রথম যুগ্ম আহ্বায়ক আব্দুল আউয়াল, উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা বুলবুল আহমদ, সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা তাপস কুমার রায়, শাল্লা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুস সাত্তার মিয়া, আটগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল নোমান, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল ইসলাম জাহিদ এবং স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীরা বক্তব্য রাখেন। এছাড়াও সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ সভায় উপস্থিত ছিলেন।
সভায় বক্তারা বলেন, দেশের কয়েকটি অঞ্চলে ইতোমধ্যে বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে এবং সরকার ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। সেই বাস্তবতা বিবেচনায় শাল্লা উপজেলাতেও আগাম প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে, যাতে যেকোনো পরিস্থিতিতে দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়।
বক্তারা জানান, এখন পর্যন্ত শাল্লা উপজেলার কোথাও বন্যার কারণে ক্ষয়ক্ষতির কোনো খবর পাওয়া যায়নি। তবে ভাটি অঞ্চল হিসেবে সুনামগঞ্জের বিভিন্ন এলাকা বর্ষা মৌসুমে আকস্মিক বন্যার ঝুঁকিতে থাকে। এ কারণে সম্ভাব্য দুর্যোগের আগেই সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তারা বলেন, দুর্যোগ মোকাবেলায় আগাম পরিকল্পনা থাকলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।
সভায় উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, সম্ভাব্য বন্যা পরিস্থিতি মোকাবেলায় নির্ধারিত ফ্লাড সেন্টারগুলো প্রস্তুত রাখা হয়েছে। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রী, শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি, ওষুধসহ জরুরি উপকরণ মজুত রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রয়োজন হলে দ্রুত দুর্গত মানুষের কাছে এসব সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে প্রস্তুত থাকতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া স্বাস্থ্য বিভাগকে সম্ভাব্য রোগব্যাধি মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ প্রশাসনকেও প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণের কথা জানানো হয়েছে। খাদ্য বিভাগ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং স্বেচ্ছাসেবকদের সমন্বয়ে একটি কার্যকর যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়েও আলোচনা হয়।
সভায় বক্তারা স্থানীয় জনগণের সহযোগিতার ওপরও বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। তারা বলেন, উপজেলার যেকোনো এলাকায় বন্যা বা অন্য কোনো দুর্যোগের কারণে মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হলে দ্রুত উপজেলা প্রশাসনকে জানাতে হবে। সময়মতো তথ্য পাওয়া গেলে প্রশাসনের পক্ষে দ্রুত উদ্ধার, ত্রাণ বিতরণ এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা করা সহজ হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পিয়াস চন্দ্র দাস বলেন, প্রশাসনের লক্ষ্য শুধু দুর্যোগের পর সহায়তা দেওয়া নয়, বরং আগাম প্রস্তুতির মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি যতটা সম্ভব কমিয়ে আনা। তিনি জানান, মাঠপর্যায়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে এবং পরিস্থিতির পরিবর্তন হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা দ্রুত গ্রহণ করা হবে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়ছে। তাই স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, স্বাস্থ্য বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং সাধারণ মানুষের সমন্বিত উদ্যোগই দুর্যোগ মোকাবেলার সবচেয়ে কার্যকর উপায়। সচেতনতা বৃদ্ধি, আগাম প্রস্তুতি এবং দ্রুত তথ্য আদান-প্রদান নিশ্চিত করা গেলে প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
সভার শেষদিকে উপস্থিত সবাই দুর্যোগ মোকাবেলায় সম্মিলিতভাবে কাজ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। একই সঙ্গে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। শাল্লাবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উপজেলা প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বলেও সভায় পুনর্ব্যক্ত করা হয়।

