প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলার প্রত্যন্ত এক গ্রামে যেন নীরবে বয়ে চলেছে এক পরিবারের দীর্ঘ প্রজন্মের বেদনার ইতিহাস। একই পরিবারের দুটি শাখায় জন্মের পর জন্ম ধরে দৃষ্টি প্রতিবন্ধিতার অভিশাপ বয়ে বেড়াচ্ছেন সদস্যরা। বর্তমানে ওই দুই পরিবারে ১১ জন দৃষ্টি ও শারীরিক প্রতিবন্ধী সদস্য রয়েছেন। জন্মগত দৃষ্টিশক্তিহীনতার কারণে তারা স্বাভাবিক জীবনযাপন, শিক্ষা কিংবা কর্মসংস্থানের সুযোগ থেকে বঞ্চিত। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চরম দারিদ্র্য, ভাঙাচোরা বসতঘর, মনু নদীর ভাঙন এবং সাম্প্রতিক বন্যার দুর্ভোগ। সব মিলিয়ে প্রতিটি দিন তাদের কাছে টিকে থাকার এক কঠিন সংগ্রামের নাম।
সরেজমিনে দেখা গেছে, উপজেলার কামারচাক ইউনিয়নের দক্ষিণ ইসলামপুর গ্রামের একটি জরাজীর্ণ আধাপাকা ঘরেই বসবাস করছেন পরিবারটির সদস্যরা। ঘরের টিনের চাল দিয়ে বৃষ্টির পানি পড়ে, মেঝে কাদায় ভিজে থাকে, নিরাপদভাবে থাকার মতো পরিবেশও নেই। সংসারে নিয়মিত খাবার জোগাড় করাও কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক সময় একবেলা খেয়ে আরেকবেলা না খেয়ে থাকতে হয়। নদীভাঙন ও বন্যা পরিস্থিতি এই দুর্ভোগকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। মনু নদীর বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হলেই চারপাশে পানি ঢুকে পড়ে, বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় পুরো এলাকা। তখন খাদ্য, চিকিৎসা কিংবা জরুরি সহায়তা পৌঁছানোও কঠিন হয়ে পড়ে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পরিবারের কর্তা সহোদর কামাল মুন্সি ও লাফুল মিয়ার বাবা এবং দাদা—উভয়েই জন্মগতভাবে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ছিলেন। সেই পারিবারিক ধারাবাহিকতায় জন্ম থেকেই দৃষ্টিশক্তিহীন হন কামাল মুন্সি ও লাফুল মিয়া। দুর্ভাগ্যজনকভাবে পরবর্তী প্রজন্মেও সেই প্রতিবন্ধিতা অব্যাহত রয়েছে। কামাল মুন্সির সন্তান জগলু মিয়া, ফখরুল মিয়া ও সুফি বেগম জন্ম থেকেই দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। তাদের পরবর্তী প্রজন্মে ফাইজাও দৃষ্টিশক্তিহীন। অন্যদিকে শারমিন ও সোহান শুধু দৃষ্টিপ্রতিবন্ধিতাই নয়, মানসিক প্রতিবন্ধিতার সমস্যাতেও ভুগছে।
একইভাবে লাফুল মিয়ার পরিবারেও এই বংশগত প্রতিবন্ধিতা অব্যাহত রয়েছে। তার ছেলে সারজক মিয়া, নাতি আকবর আলী এবং নাতনি আনিকা আক্তারও জন্ম থেকেই দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। ফলে একই পরিবারের দুটি শাখায় মিলিয়ে ১১ জন সদস্য বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধিতার সঙ্গে জীবনযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন। চিকিৎসকদের ভাষ্যমতে, তাদের দৃষ্টিশক্তি ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ। অর্থনৈতিক সংকটের কারণে নিয়মিত চিকিৎসাও বহু আগেই বন্ধ হয়ে গেছে।
পরিবারের সদস্যরা জানান, জীবনের সবচেয়ে বড় কষ্ট শুধু দৃষ্টিশক্তি হারানো নয়, বরং সেই সীমাবদ্ধতার কারণে সমাজের মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া। তারা কোনো কাজ করতে পারেন না, আবার শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে অনেকেই কাজের সুযোগও দিতে চান না। ফলে অন্যের সহানুভূতি, প্রতিবন্ধী ভাতা এবং স্থানীয় মানুষের সহযোগিতাই তাদের বেঁচে থাকার প্রধান অবলম্বন।
দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী সুফি বেগম বলেন, আগে মানুষের বাড়িতে ছোটখাটো কাজ করে কিছু সহযোগিতা পাওয়া যেত। কিন্তু সাম্প্রতিক বন্যার পর সেই সুযোগও বন্ধ হয়ে গেছে। চারপাশে পানি থাকায় কোথাও যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না, আবার অন্যরাও সহজে তাদের কাছে পৌঁছাতে পারছেন না। ফলে অনেক সময় একবেলা খাবার জোটে, আবার পরের বেলা না খেয়েই থাকতে হয়।
কামাল মুন্সিও একই ধরনের অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরে বলেন, জন্ম থেকেই তারা দৃষ্টিশক্তিহীন। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, তাদের চোখের আলো আর ফিরে আসবে না। অর্থের অভাবে এখন চিকিৎসার কথাও ভাবতে পারেন না। পরিবার চালানোই যেখানে কঠিন, সেখানে উন্নত চিকিৎসা তাদের কাছে অধরাই থেকে গেছে।
এই পরিবারের শিশুরাও শিক্ষার আলো থেকে অনেকটাই বঞ্চিত। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধিতা, আর্থিক সংকট এবং প্রয়োজনীয় সহায়ক ব্যবস্থার অভাবে নিয়মিত শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। পরিবারের প্রবীণ সদস্যদের আশঙ্কা, যথাযথ সহায়তা না পেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মও দারিদ্র্য ও অসহায়ত্বের একই চক্রে আটকে থাকবে।
এদিকে পরিবারটির দুরবস্থার খবর জানার পর উপজেলা প্রশাসন কিছু জরুরি সহায়তা পৌঁছে দিয়েছে। সোমবার (১৩ জুলাই) বিকেলে উপজেলা প্রশাসন ও প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) কার্যালয়ের উদ্যোগে পরিবারটির হাতে নগদ আর্থিক সহায়তা তুলে দেওয়া হয়।
রাজনগর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা আজাদুর রহমান জানান, পরিবারের ১১ জনের মধ্যে বর্তমানে ৮ জন নিয়মিত প্রতিবন্ধী ভাতা পাচ্ছেন। বাকি তিনজন প্রয়োজনীয় আবেদন করলে তাদেরও দ্রুত ভাতার আওতায় আনার ব্যবস্থা করা হবে। তিনি বলেন, সরকারি বিশেষ কোনো বরাদ্দ এলে পরিবারটিকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করা হবে।
রাজনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বিপুল সিকদার বলেন, বিষয়টি জানার পর উপজেলা প্রশাসন তাৎক্ষণিকভাবে খোঁজখবর নিয়েছে এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা পাঠিয়েছে। তিনি জানান, ভবিষ্যতেও পরিবারটির পাশে থাকার চেষ্টা করা হবে। একই সঙ্গে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে, যাতে দীর্ঘমেয়াদি সহায়তার ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়।
জনস্বাস্থ্য ও সমাজকল্যাণ বিশেষজ্ঞদের মতে, একই পরিবারের একাধিক প্রজন্মে জন্মগত দৃষ্টিপ্রতিবন্ধিতা দেখা দিলে তার পেছনে বংশগত কারণ থাকতে পারে। এ ধরনের ক্ষেত্রে জেনেটিক পরামর্শ, বিশেষায়িত চিকিৎসা, পুনর্বাসন, অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। পাশাপাশি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কর্মদক্ষতা উন্নয়ন ও বিকল্প আয়ের সুযোগ তৈরি করা গেলে তারা সমাজের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ পেতে পারেন।
দক্ষিণ ইসলামপুর গ্রামের এই পরিবারটি আজ শুধু একটি পরিবারের গল্প নয়; এটি সমাজের প্রান্তিক মানুষের সংগ্রাম, বংশগত প্রতিবন্ধিতার বাস্তবতা এবং মানবিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তার এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, প্রশাসনের সাময়িক সহায়তার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন, নিরাপদ আবাসন, চিকিৎসা এবং শিক্ষা নিশ্চিত করা গেলে হয়তো এই পরিবারের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবন কিছুটা হলেও আলোর পথে এগিয়ে যেতে পারবে।


