প্রকাশ: ০১ জুলাই ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
গণতন্ত্রের চর্চায় জনপ্রতিনিধিরা যখন জনগণের সেবক হিসেবে নিজেদের নিয়োজিত করেন, তখন তাদের প্রতিটি পদক্ষেপই হয় স্বচ্ছ এবং জবাবদিহিমূলক। তবে বর্তমান ডিজিটাল যুগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের জনপ্রিয়তাকে পুঁজি করে জনপ্রতিনিধিদের আর্থিক উপার্জনের প্রবণতা এক নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সম্প্রতি তথ্য যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান ‘ডিসমিসল্যাব’-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, বাংলাদেশের অন্তত ১৩ জন সংসদ সদস্য তাদের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে মেটার কনটেন্ট মনিটাইজেশন প্রোগ্রামের মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করছেন। অথচ মেটার নিজস্ব নীতিমালা অনুযায়ী, নির্বাচিত কোনো জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক প্রার্থী কিংবা সরকারি কর্মকর্তারা এই কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন না। এই সংবাদ প্রকাশের পর থেকেই রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক এবং উঠেছে গুরুতর ‘স্বার্থের সংঘাত’ বা ‘কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট’-এর প্রশ্ন।
ঘটনাটির সূত্রপাত হয় গত ৪ মার্চ, যখন কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহ নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে কনটেন্ট পোস্ট করে অর্থ উপার্জনের বিষয়টি প্রকাশ্যে আনেন। নিজের মোবাইল ফোন উঁচিয়ে তিনি দর্শকদের দেখান, কীভাবে তার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে ডলার আয় হচ্ছে। এমনকি তিনি জানান যে, মার্চের কেবল প্রথম দুই দিনেই তার অ্যাকাউন্ট থেকে ১২৯ ডলার আয় হয়েছে। এই ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। এরপরই ডিসমিসল্যাব ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী জনপ্রতিনিধিদের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট নিয়ে ব্যাপক অনুসন্ধান চালায়। এতে বেরিয়ে আসে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য—শুধু হাসনাত আব্দুল্লাহ নন, আরও ১২ জন সংসদ সদস্য এবং বর্তমান মন্ত্রিসভার তিন গুরুত্বপূর্ণ সদস্যও এই মনিটাইজেশন কর্মসূচিতে সক্রিয় রয়েছেন।
মেটার ‘পার্টনার মনিটাইজেশন পলিসি’ অত্যন্ত স্পষ্ট। তাদের নীতি অনুযায়ী, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক প্রার্থী, সরকারি কর্মকর্তা বা কোনো রাজনৈতিক দল সরাসরি মনিটাইজেশনের মাধ্যমে বাণিজ্যিক সুবিধা নিতে পারে না। কারণ, জনপ্রতিনিধিরা যখন ফেসবুকের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করেন, তখন সেটি জনগণের কাছে তাদের কাজের নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। তবে ডিসমিসল্যাবের অনুসন্ধান বলছে, মেটার এই নীতি সব ক্ষেত্রে কঠোরভাবে কার্যকর হয়নি। বরং অবাক করার মতো বিষয় হলো, অনেক সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পরপরই এই কর্মসূচিতে যুক্ত হয়েছেন। যেমন, লালমনিরহাট-১ আসনের সংসদ সদস্য হাসান রাজীব প্রধানের অ্যাকাউন্ট ৪ ফেব্রুয়ারি এবং চাঁদপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য এস কে ফরিদ আহমেদের অ্যাকাউন্ট ১১ ফেব্রুয়ারি, অর্থাৎ নির্বাচনের ঠিক আগের দিন মেটার মনিটাইজেশন প্রোগ্রামে অন্তর্ভুক্ত হয়।
তালিকায় থাকা মন্ত্রিসভার তিন সদস্য হলেন বাণিজ্য, শিল্প, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির; বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত এবং ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন। তাদের মতো উচ্চপদস্থ সরকারি ব্যক্তিরা যখন ফেসবুকের বাণিজ্যিক পলিসির সুবিধা গ্রহণ করেন, তখন সেটি প্রশাসনের জবাবদিহিতা ও সুশাসনের ক্ষেত্রে বড় ধরনের প্রশ্নচিহ্ন তৈরি করে। পটুয়াখালী-২ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মো. শফিকুল ইসলাম মাসুদের ভেরিফাইড ফেসবুক পেজে ১৭ লাখের বেশি অনুসারী রয়েছে। তার পেজটি ২০১৮ সাল থেকেই মনিটাইজেশন প্রোগ্রামের সাথে যুক্ত বলে জানা গেছে। যখন তাকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়, তখন তিনি জানিয়েছেন যে তার আইটি টিম এটি পরিচালনা করে এবং তিনি ফেসবুক থেকে কোনো আয় করেন না বলে দাবি করেন। তবে মনিটাইজেশন আর্কাইভের তথ্য ভিন্ন কথা বলছে।
এই বিতর্কের কেন্দ্রে থাকা হাসনাত আব্দুল্লাহর অ্যাকাউন্ট থেকে মনিটাইজেশন সরিয়ে নেওয়া হলেও তার সাথে সম্পৃক্ত আরও দুটি পেজ ‘হাসনাত ফর কুমিল্লা-৪’ এবং ‘জবাবদিহিতা’ এখনো মনিটাইজেশনের জন্য যোগ্য হিসেবে রয়ে গেছে। ১২ লাখ অনুসারীর নির্বাচনী প্রচারের পেজটি কেন এখনো মনিটাইজড, তা নিয়ে নানা গুঞ্জন চলছে। ডিসমিসল্যাব তাদের অনুসন্ধানে আরও দেখতে পেয়েছে যে, এই সংসদ সদস্যদের ভিডিওগুলো দেখার সময় ব্যবহারকারীরা মাঝেমধ্যেই বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন দেখতে পান। ভিডিওর আগে, মাঝে বা নিচে বিভিন্ন স্বনামধন্য ব্র্যান্ডের পণ্যের বিজ্ঞাপন প্রদর্শিত হচ্ছে। গবেষণায় দেখা গেছে যে, ১৩টি অ্যাকাউন্টের মধ্যে ১২টি থেকেই বিজ্ঞাপন পরিবেশন করা হচ্ছে। এমনকি গোপালগঞ্জ-৩ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য এস এম জিলানীর ভিডিওতে হরলিক্স এবং যশোর-৬ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মো. মোক্তার আলীর ভিডিওতে রুচি সসের বিজ্ঞাপন চলতে দেখা গেছে।
বিষয়টি কেবল ভেরিফাইড অ্যাকাউন্টের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ডিসমিসল্যাব মেটার পার্টনার-পাবলিশার তালিকায় বাংলাদেশি সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীদের নামে খোলা আরও অন্তত ২২টি আনভেরিফাইড ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খুঁজে পেয়েছে। এর মধ্যে অনেকেরই অগণিত অনুসারী রয়েছে এবং এগুলোর মাধ্যমে নিয়মিত রাজনৈতিক বিজ্ঞাপন বা নির্বাচনী প্রচারণা চালানো হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, রাজনীতিবিদরা নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া তথ্যে এই আইডিগুলোর কথা উল্লেখ করলেও পরবর্তীতে এগুলো দিয়ে অনৈতিকভাবে অর্থ উপার্জন করছেন। এটি ‘রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা, ২০২৫’-এর সরাসরি লঙ্ঘন হতে পারে বলে অনেক আইনি বিশেষজ্ঞ মনে করছেন।
‘হোয়াট টু ফিক্স’-এর নির্বাহী পরিচালক ভিক্টোরিয়া রিও এ প্রসঙ্গে বলেন, মনিটাইজেশনের জন্য কোনো অ্যাকাউন্ট অনুমোদন করার আগে মেটার উচিত অত্যন্ত কঠোর ও সূক্ষ্ম যাচাই-বাছাই করা। বিশেষ করে যখন কোনো অ্যাকাউন্ট রাজনীতিক বা জনপ্রতিনিধিদের সাথে সম্পর্কিত বলে প্রতীয়মান হয়, তখন তাদের সতর্ক হওয়া উচিত ছিল। মেটার বিজনেস পার্টনার যোগ্যতা যাচাইয়ের বর্তমান প্রক্রিয়াটি যে ত্রুটিপূর্ণ, তা এই ঘটনার মাধ্যমেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। রিও আরও বলেন, মেটার উচিত অ্যাকাউন্টের চারপাশের সামগ্রিক প্রমাণগুলো বিবেচনা করে তবেই বাণিজ্যিক সুবিধা প্রদান করা।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান অত্যন্ত জোরালো ভাষায় এই পরিস্থিতিকে ‘স্বার্থের সংঘাত’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি মনে করেন, যারা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন, যারা প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মের ওপর নীতি প্রণয়ন বা নিয়ন্ত্রণের ভূমিকা রাখতে পারেন, তারাই যদি সেই প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ব্যবসায়িক সুবিধা গ্রহণ করেন, তবে সেখানে জবাবদিহিতা ও সুশাসনের অভাব প্রকট হয়ে ওঠে। কারণ, ফেসবুকের পলিসি বা ডেটা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যখনই কোনো জাতীয় সিদ্ধান্তের প্রয়োজন হয়, তখন এই জনপ্রতিনিধিদের অবস্থানের নিরপেক্ষতা বজায় রাখা অসম্ভব হয়ে পড়বে।
জনগণের প্রতিনিধিরা জনগণের টাকায় বেতন ও সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করেন। তাদের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত জনসেবা নিশ্চিত করা। যখন তারা ফেসবুকের মতো একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের আর্থিক মডেলের অংশীদার হয়ে পড়েন, তখন তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে জনগণের মনে আস্থার সংকট তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। এখন প্রশ্ন উঠেছে, মেটা কর্তৃপক্ষ কেন এমন একটি পরিস্থিতির দিকে চোখ বন্ধ করে রেখেছে? ডিসমিসল্যাব এ বিষয়ে মেটার কাছে ব্যাখ্যা চাইলেও এখন পর্যন্ত কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। তবে সাধারণ নাগরিকরা আশা করছেন, মেটা কর্তৃপক্ষ অতি দ্রুত তাদের মনিটাইজেশন নীতিমালা পুনর্বিবেচনা করবে এবং বাংলাদেশে সংসদ সদস্যদের ভেরিফাইড বা আনভেরিফাইড অ্যাকাউন্টগুলোতে মনিটাইজেশন সুবিধা বন্ধ করে একটি স্বচ্ছ ডিজিটাল পরিবেশ ফিরিয়ে আনবে। একজন জনপ্রতিনিধির কাছে জাতি সর্বোচ্চ নৈতিক মানদণ্ড আশা করে, আর সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটানোই এখন সময়ের দাবি।


