সন্ধ্যা সাতটায় দোকান বন্ধ: বিপাকে সিলেটে ব্যবসায়ীরা

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।

সিলেটের প্রাণকেন্দ্র জিন্দাবাজার থেকে শুরু করে আম্বরখানা, মদিনা মার্কেট কিংবা বন্দরবাজার—বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামলেই যে চঞ্চলতা ও কোলাহলমুখর দৃশ্য তৈরি হতো, তা এখন কেবলই স্মৃতি। বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের লক্ষ্যকে সামনে রেখে সরকার ঘোষিত সন্ধ্যা সাতটার মধ্যে দোকানপাট ও শপিংমল বন্ধের নতুন নির্দেশনায় স্থবিরতা নেমে এসেছে বাণিজ্যিক নগরী সিলেটে। সরকারি এই সিদ্ধান্তের নেপথ্যে জাতীয় স্বার্থে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের বিষয়টি থাকলেও, মাঠপর্যায়ে এর প্রতিফলন ঘটাতে গিয়ে চরম আর্থিক সংকটের মুখে পড়েছেন অসংখ্য ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী। দিনশেষে ব্যবসার মূল সময়টুকু যখন শুরু হয়, ঠিক তখনই পুলিশের কঠোর হস্তক্ষেপে দোকানপাট বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন তারা, যা তাদের স্বপ্ন ও জীবিকার ওপর এক বিশাল কালো ছায়া ফেলেছে।

সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের (এসএমপি) পক্ষ থেকে গত সোমবার গণবিজ্ঞপ্তি প্রচারের মাধ্যমে নগরীর সকল ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে সন্ধ্যা সাতটার মধ্যে বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়। বিদ্যুতের চাহিদা কমাতে এবং জাতীয় পর্যায়ে সাশ্রয় নীতি বাস্তবায়নে সরকার এই উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। তবে প্রশাসনের এই আদেশ কার্যকর করার প্রক্রিয়ায় সিলেটে একধরণের অসামঞ্জস্যতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা ব্যবসায়ীদের ক্ষোভ ও হতাশাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, প্রশাসনের পক্ষ থেকে নির্দেশনা থাকলেও তার প্রয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে। বিশেষ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, হোটেল-রেস্তোরাঁ এবং ফার্মেসির মতো জরুরি সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোকে এই নিষেধাজ্ঞার বাইরে রাখার কথা থাকলেও, অনেক ক্ষেত্রে উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে। পুলিশি অভিযানের সময় খাবারের দোকানগুলোকেও বাধ্য হয়ে দোকান বন্ধ করতে হচ্ছে, যা জনদুর্ভোগের পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের বড় ধরণের লোকসানের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

নগরীর অভিজাত এলাকাগুলোতে সন্ধ্যার পরই মূলত কেনাকাটার আসল আমেজ তৈরি হয়। সারাদিনের ব্যস্ততা শেষে মানুষ যখন পরিবার নিয়ে কেনাকাটায় বের হয়, তখন ঘড়ির কাঁটা সন্ধ্যা সাতটা অতিক্রম করতে শুরু করে। বিশেষ করে বর্তমানে দিন ছোট হওয়ার ফলে সন্ধ্যা নামতেই সাতটা বেজে যাচ্ছে। ফলে অধিকাংশ ক্রেতার পক্ষে এই সংক্ষিপ্ত সময়ে কেনাকাটা সম্পন্ন করা অসম্ভব হয়ে পড়ছে। ব্যবসায়ীদের মতে, তাদের ব্যবসার প্রধান সময়টিই সন্ধ্যা সাতটার পরে শুরু হয়। এখনকার এই সময়সীমায় দোকান বন্ধ রাখা মানে হলো দিনভর দোকান খুলে বসে থাকার পর অলস সময়ের অবসান ঘটিয়ে ঠিক যখন আয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়, তখনই ঝাঁপ বন্ধ করে দেওয়া। লতিফ সেন্টারের মতো গুরুত্বপূর্ণ মার্কেটগুলোর ক্রোকারিজ ব্যবসায়ীরা বলছেন, দিনের বেলায় ক্রেতাদের উপস্থিতি থাকে নগণ্য, কিন্তু সন্ধ্যার পর জিন্দাবাজার বা বন্দরবাজার এলাকায় যে প্রাণচাঞ্চল্য দেখা যেত, তা এখন কার্যত বিলুপ্ত।

এই পরিস্থিতির ওপর আলোকপাত করতে গিয়ে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার আব্দুল কুদ্দুস চৌধুরী জানিয়েছেন, সরকারের উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশনা মেনেই গণবিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে এবং তা বাস্তবায়নে পুলিশ বদ্ধপরিকর। আইনের শাসনের জায়গা থেকে পুলিশ তাদের দায়িত্ব পালন করছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তবে এই কঠোরতার বিপরীতে ব্যবসায়ীদের দীর্ঘশ্বাসের করুণ গল্পগুলো আলাদাভাবে বলার মতো। মিঠাই বা টেস্টি ট্রিটের মতো প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপকালে জানা যায়, শুধুমাত্র খাবার বিক্রির অভিযোগে ঈদের ঠিক আগমুহূর্তে সেলসম্যানদের থানায় নিয়ে যাওয়ার মতো ঘটনাও ঘটছে। অথচ সরকারি গেজেটে বা বিজ্ঞপ্তিতে খাবারের দোকানগুলোকে নিষেধাজ্ঞার বাইরে রাখা হয়েছে। এই বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ীরা কার কথা শুনবেন এবং কোন পথে চলবেন, তা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় ভুগছেন।

সুপারশপগুলোও এই নতুন নিয়মের বেড়াজালে আটকা পড়েছে। স্বপ্ন, আগোরা ও ইউনিমার্টের মতো বড় বড় আউটলেটগুলোতে দেখা যাচ্ছে, তারা বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য আলোকসজ্জা কমিয়ে ফেললেও ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য বিক্রির চেষ্টা করছে। কিন্তু পুলিশি নজরদারির চাপে তাদেরও নিয়মিত সময়ের আগেই কার্যক্রম গুটিয়ে নিতে হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে সিলেটের ব্যবসায়ীরা তাদের ক্ষতির চিত্র তুলে ধরে সরকারকে বিষয়টি পুনরায় ভেবে দেখার অনুরোধ জানিয়েছেন। বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতি সিলেট জেলা শাখার মহাসচিব আব্দুর রহমান রিপন বলেন, অর্থনৈতিক মন্দা ও মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় ব্যবসায়ীরা এমনিতেই চাপের মধ্যে আছেন। এর মধ্যে যদি ব্যবসার সময়সীমা এভাবে সংকুচিত করা হয়, তবে ছোট ব্যবসায়ীরা দেউলিয়া হয়ে পড়ার উপক্রম হবে। অন্তত রাত আটটা বা নয়টা পর্যন্ত সময়সীমা বাড়ানো হলে তারা কিছুটা হলেও ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারতেন।

নগরীর রাস্তাঘাটে এখনো অনেক অননুমোদিত প্রতিষ্ঠান বা ফুটপাতের দোকান রাত পর্যন্ত খোলা থাকতে দেখা যায়, যা সাধারণ ব্যবসায়ীদের মনে ক্ষোভের জন্ম দিচ্ছে। নিয়ম যখন করা হয়েছে, তখন তা সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ করা উচিত। কিন্তু কিছু নির্দিষ্ট ব্র্যান্ডের শপ বা দোকানকে লক্ষ্য করে যখন অভিযান চালানো হয়, তখন সামগ্রিক পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, পরিবেশের ক্ষতি হোক বা বিদ্যুৎ অপচয় হোক—তারা কেউই চান না। কিন্তু জীবিকার লড়াইয়ে তারা যে পরিস্থিতির শিকার হচ্ছেন, তাতে পরিবারের ভরণপোষণ করা এবং কর্মচারীদের বেতন দেওয়া তাদের জন্য দুরূহ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিদ্যুৎ সাশ্রয় প্রয়োজন, কিন্তু তা যেন সাধারণ ব্যবসায়ীদের জীবনযাত্রাকে চরম বিপন্ন না করে তোলে।

পরিশেষে বলা যায়, জাতীয় স্বার্থে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের উদ্যোগটি প্রশংসনীয়, তবে এর বাস্তবায়ন কৌশলটি আরও মানবিক হওয়া প্রয়োজন। প্রশাসন ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব এখন প্রকট হয়ে উঠেছে। একটি সুন্দর ও ভারসাম্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সময়ের দাবি। যদি আলোচনার মাধ্যমে সময়সীমা কিছুটা বাড়িয়ে রাত আটটা বা নয়টা পর্যন্ত নির্ধারণ করা যায় এবং জরুরি সেবার ক্ষেত্রে পুলিশের অবস্থান আরও স্বচ্ছ ও সুনির্দিষ্ট করা সম্ভব হয়, তবেই ব্যবসায়ীরা ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পেতে পারেন। সিলেটে চলমান এই অচলাবস্থা নিরসনে স্থানীয় প্রশাসন ও ব্যবসায়ী নেতাদের মধ্যে দ্রুত একটি সংলাপ প্রয়োজন। নগরীর বাণিজ্যিক প্রাণসত্তা সচল রাখতে এবং হাজার হাজার ব্যবসায়ীর অন্নসংস্থান নিশ্চিত করতে এই বিষয়টি বিবেচনার দাবি রাখে। আমরা চাই দেশের স্বার্থও রক্ষিত হোক, আবার সাধারণ ব্যবসায়ীদের চোখের জলও মুছিয়ে দেওয়া হোক।

এই সপ্তাহের খবরাখবর

ছুটি প্রশ্নে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর অন্য সুর: দায়িত্ব নিয়ে ধোঁয়াশা

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

দৌলতদিয়ায় ফের পদ্মায় বাস: অল্পের জন্য বড় রক্ষা

প্রকাশ:০৫ জুন ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের...

মাল্টায় কর্মসংস্থান: বৈধ পথে সমৃদ্ধির নতুন দিগন্ত

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিলেটে চীনের অর্থায়নে হচ্ছে ১ হাজার শয্যার হাসপাতাল

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সবুজ শিল্পায়ন ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে জোর

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বিষয়বস্তু

দৌলতদিয়ায় ফের পদ্মায় বাস: অল্পের জন্য বড় রক্ষা

প্রকাশ:০৫ জুন ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের...

মাল্টায় কর্মসংস্থান: বৈধ পথে সমৃদ্ধির নতুন দিগন্ত

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিলেটে চীনের অর্থায়নে হচ্ছে ১ হাজার শয্যার হাসপাতাল

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সবুজ শিল্পায়ন ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে জোর

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

চিকিৎসায় এসে দিল্লিতে অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ গেল বাংলাদেশির

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সিলেটের উৎমা সীমান্তে বিএসএফের পুশইন প্রচেষ্টা ব্যর্থ

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সম্পর্কিত নিবন্ধ

জনপ্র্যিয় পেজ