প্রকাশ: ২২ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
হবিগঞ্জ সদর উপজেলায় দুই শিশুর সামান্য ঝগড়াকে কেন্দ্র করে ভয়াবহ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েছে দুটি গ্রামের মানুষ। কয়েক ঘণ্টার উত্তেজনা ও ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনায় অন্তত অর্ধশতাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে রয়েছেন হবিগঞ্জ সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জাহিদুল হকসহ পুলিশের কয়েকজন সদস্যও। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। ঘটনার পর পুরো এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে।
বৃহস্পতিবার (২১ মে) বিকেলে হবিগঞ্জ সদর উপজেলার সুলতানশী ও শরীফপুর গ্রামের মধ্যবর্তী এলাকায় এই সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। স্থানীয় সূত্র ও পুলিশ জানায়, বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে সুলতানশী গ্রামের ফারুক মিয়ার ছেলে এবং শরীফপুর গ্রামের আরেক ফারুক মিয়ার শিশু কন্যার মধ্যে খেলাধুলাকে কেন্দ্র করে কথা কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে বিষয়টি দুই পরিবারের অভিভাবকদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। প্রথমে তর্ক-বিতর্ক হলেও পরে তা দ্রুত উত্তেজনায় রূপ নেয়।
স্থানীয়রা জানান, দুই পরিবারের সদস্যদের বাগবিতণ্ডার খবর অল্প সময়ের মধ্যেই দুই গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে। পরে উভয় গ্রামের লোকজন দেশীয় অস্ত্র নিয়ে ঘটনাস্থলে জড়ো হন। মুহূর্তেই শুরু হয় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও সংঘর্ষ। ইটপাটকেল নিক্ষেপের পাশাপাশি লাঠিসোঁটা ও ধারালো অস্ত্র ব্যবহারের ঘটনাও ঘটে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন।
সংঘর্ষের সময় পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। দোকানপাট দ্রুত বন্ধ হয়ে যায় এবং সাধারণ মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছোটাছুটি শুরু করেন। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, কয়েক ঘণ্টা ধরে থেমে থেমে সংঘর্ষ চলতে থাকে। পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে সাধারণ মানুষ ঘর থেকে বের হতেও ভয় পাচ্ছিলেন।
খবর পেয়ে হবিগঞ্জ সদর মডেল থানার পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। তবে সংঘর্ষ থামাতে গিয়ে পুলিশের সদস্যরাও হামলার শিকার হন। এ সময় ওসি জাহিদুল হক, উপ-পরিদর্শক ধ্রুবেশ চক্রবর্তী এবং এসআই সোহেল মাহমুদ আহত হন। পুলিশের কয়েকটি যানবাহনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
আহতদের মধ্যে গুরুতর অবস্থায় অন্তত ২০ জনকে হবিগঞ্জ সদর আধুনিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। আহতদের মধ্যে রয়েছেন দুলাল, মকসুদ আলী, ইমরান মিয়া, কিসমত আলী, রিপন মিয়া, ফয়েজ মিয়া, আমির আলী, সাব্বির মিয়া, রোকন মিয়া, জাহির মিয়া ও মোয়াজসহ আরও অনেকে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, আহতদের অধিকাংশের শরীরে ধারালো অস্ত্র ও ইটপাটকেলের আঘাত রয়েছে। কেউ কেউ মাথা ও হাতে গুরুতর জখম হয়েছেন। হাসপাতালে আহতদের স্বজনদের ভিড় দেখা যায় এবং পুরো পরিবেশ ছিল উদ্বেগপূর্ণ।
হবিগঞ্জ সদর মডেল থানার ওসি জাহিদুল হক বলেন, শিশুদের ঝগড়াকে কেন্দ্র করে দুই গ্রামবাসীর মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে এবং বর্তমানে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। তিনি জানান, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে টহল জোরদার করা হয়েছে এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয় প্রবীণরা বলছেন, তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে গ্রামাঞ্চলে সংঘর্ষের ঘটনা নতুন নয়। অনেক সময় সামান্য বিষয়ও সামাজিক ও পারিবারিক বিরোধের কারণে বড় আকার ধারণ করে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় পূর্বের দ্বন্দ্ব বা আধিপত্য বিস্তারের মানসিকতা থাকলে ছোট ঘটনা দ্রুত সহিংসতায় রূপ নেয়।
সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করছেন, সামাজিক সহনশীলতা কমে যাওয়া এবং বিরোধ মীমাংসার সংস্কৃতি দুর্বল হয়ে পড়ার কারণেও এ ধরনের ঘটনা বাড়ছে। আগে গ্রামের মুরব্বি ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা দ্রুত হস্তক্ষেপ করে বিরোধ থামানোর চেষ্টা করতেন। কিন্তু এখন অনেক ক্ষেত্রেই উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার আগেই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হয় না।
মানবাধিকারকর্মীদের মতে, শিশুদের ঝগড়াকে কেন্দ্র করে অর্ধশতাধিক মানুষ আহত হওয়ার ঘটনা সমাজে উদ্বেগজনক বার্তা দিচ্ছে। তারা বলছেন, সহিংসতা কোনো সমস্যার সমাধান নয়। বরং সামাজিক সংলাপ, সচেতনতা ও স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত সমঝোতার উদ্যোগ বাড়ানো প্রয়োজন।
ঘটনার পর দুই গ্রামের মানুষের মধ্যে এখনও উত্তেজনা বিরাজ করছে। যেকোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে পুলিশ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানা গেছে।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ঘটনাটি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, কীভাবে শিশুদের সাধারণ ঝগড়া এত বড় সংঘর্ষে রূপ নিতে পারে। কেউ কেউ গ্রামাঞ্চলে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও শক্তিশালী করার আহ্বান জানিয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এমন ঘটনা শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়, বরং এটি সামাজিক মূল্যবোধেরও একটি প্রতিচ্ছবি। পরিবার ও সমাজে সহনশীলতা, ধৈর্য এবং আলোচনার সংস্কৃতি জোরদার না হলে ভবিষ্যতেও ছোটখাটো বিরোধ বড় ধরনের সহিংসতায় রূপ নিতে পারে।
সব মিলিয়ে, হবিগঞ্জ সদর উপজেলার এই সংঘর্ষ আবারও দেখিয়ে দিল, সামান্য বিরোধও কীভাবে বড় সহিংসতায় রূপ নিতে পারে। এখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে প্রশাসনের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের দায়িত্বশীল ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।


