প্রকাশ: ২২ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সামাজিক দায়বদ্ধতা আর মানবিক চেতনার এক অনন্য উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার কয়েকজন সচেতন মানুষ। দীর্ঘদিন ধরে ময়লা-আবর্জনা, কাদা ও পচা বৈশাখী খড়ে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়া একটি গ্রামীণ সড়ক নিজেদের উদ্যোগে পরিষ্কার করে স্থানীয় মানুষের প্রশংসায় ভাসছেন তারা। শুধু স্থানীয়ভাবেই নয়, তাদের এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক ইতিবাচক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২১ মে) সকালে শান্তিগঞ্জ উপজেলার জয়কলস ইউনিয়নের ডুংরিয়া গ্রামে শুরু হয় এই পরিচ্ছন্নতা অভিযান। সকাল ৯টার দিকে উপজেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও শান্তিগঞ্জ প্রেসক্লাবের সিনিয়র সদস্য আবুল কালাম এবং শান্তিগঞ্জ প্রেসক্লাবের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. খালেদ হাসানের যৌথ উদ্যোগে সড়ক পরিষ্কারের কাজ শুরু হয়। পরে স্থানীয় আরও কয়েকজন সচেতন ব্যক্তি এতে অংশ নেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ডুংরিয়া ঘরোয়া আগার পয়েন্ট থেকে দক্ষিণের রজনীগঞ্জ রাস্তার মোড় পর্যন্ত প্রায় ৫০০ মিটার সড়কে দীর্ঘদিন ধরে জমে ছিল বৈশাখী খড়, কাদা ও বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য। সাম্প্রতিক অতিবৃষ্টিতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে পড়ে। সড়কের বিভিন্ন স্থানে কাদা জমে যাওয়ায় পথচারীদের চলাচল প্রায় দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। বিশেষ করে স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসাগামী শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছিল।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বৃষ্টির পানিতে পচে যাওয়া খড় থেকে দুর্গন্ধ ছড়াতে শুরু করেছিল। সড়কের কিছু অংশ এতটাই পিচ্ছিল হয়ে উঠেছিল যে প্রায়ই মানুষ পড়ে গিয়ে আহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছিল। গ্রামের বয়স্ক মানুষ, নারী ও শিশুদের চলাচল সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছিল।
এমন পরিস্থিতিতে কারও নির্দেশ বা সরকারি সহায়তার অপেক্ষা না করে নিজেরাই উদ্যোগ নেন আবুল কালাম ও খালেদ হাসান। হাতে কোদাল নিয়ে তারা রাস্তায় নেমে পড়েন। ধীরে ধীরে তাদের এই কাজে অনুপ্রাণিত হয়ে এগিয়ে আসেন গ্রামের আরও অনেকে। সাবেক এনজিও কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাহান মিয়া, সমাজকর্মী জুয়েল মিয়াসহ বেশ কয়েকজন যুবক স্বেচ্ছাশ্রমে অংশ নেন। কয়েক ঘণ্টার পরিশ্রমে সড়কের ময়লা-আবর্জনা অপসারণ করা হয় এবং চলাচলের উপযোগী করে তোলা হয় পুরো রাস্তা।
এ বিষয়ে আবুল কালাম বলেন, মানুষের উপকারে আসতে পারার অনুভূতি সবসময়ই আলাদা। তিনি জানান, দীর্ঘদিন ধরে মানুষ এই সড়ক দিয়ে চলাচলে কষ্ট পাচ্ছিল। বিশেষ করে শিশু শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ দেখে তার খারাপ লাগছিল। তাই আর অপেক্ষা না করে নিজেরাই কাজ শুরু করেন। তার মতে, সমাজের ছোট ছোট সমস্যার সমাধানে স্থানীয় মানুষ এগিয়ে এলে অনেক বড় পরিবর্তন সম্ভব।
খালেদ হাসান বলেন, প্রায় এক মাস ধরে রাস্তাটি খুব খারাপ অবস্থায় ছিল। বৈশাখী খড় পচে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছিল এবং কাদার কারণে মানুষ স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারছিল না। তিনি জানান, প্রথমে দু’জন মিলে কাজ শুরু করলেও পরে অনেকেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন। এতে কাজ আরও সহজ হয়ে যায়।
তিনি আরও বলেন, সমাজের ভালো কাজের জন্য কারও মুখাপেক্ষী হয়ে বসে থাকা উচিত নয়। একজন উদ্যোগ নিলে অন্যরা সাহস পায় এবং সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনের পরিবেশ তৈরি হয়। তার ভাষায়, “সব দায়িত্ব সরকারের নয়, আমাদেরও দায়িত্ব রয়েছে নিজের সমাজকে পরিষ্কার ও সুন্দর রাখা।”
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাস্তা পরিষ্কারের পর এখন মানুষ অনেক স্বস্তিতে চলাচল করতে পারছেন। বিশেষ করে শিক্ষার্থীরা আগের তুলনায় নিরাপদে স্কুল ও মাদ্রাসায় যেতে পারছে। গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দারাও এই উদ্যোগের প্রশংসা করেছেন। অনেকেই মনে করছেন, এমন মানবিক উদ্যোগ অন্য এলাকাগুলোর জন্যও অনুকরণীয় হতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এই ঘটনা ইতিবাচক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। স্থানীয় কয়েকজন তরুণ পরিচ্ছন্নতা অভিযানের ছবি ও ভিডিও অনলাইনে শেয়ার করলে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। অনেকেই মন্তব্য করেছেন, উন্নত সমাজ গঠনে নাগরিক দায়িত্ববোধই সবচেয়ে বড় শক্তি। কেউ কেউ আবার বলেছেন, ছোট ছোট উদ্যোগই একসময় বড় সামাজিক পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি করে।
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, গ্রামীণ সমাজে পারস্পরিক সহযোগিতা ও স্বেচ্ছাশ্রমের সংস্কৃতি একসময় খুব শক্তিশালী ছিল। সময়ের পরিবর্তনে সেই চর্চা অনেকটাই কমে গেলেও এখনও কিছু মানুষ ব্যক্তিগত উদ্যোগে সমাজের কল্যাণে কাজ করে চলেছেন। এমন উদ্যোগ সামাজিক বন্ধনকে শক্তিশালী করে এবং মানুষকে দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়তা করে।
পরিবেশ সচেতন ব্যক্তিরাও বলছেন, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ শুধু সৌন্দর্যের জন্য নয়, জনস্বাস্থ্য রক্ষার জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাস্তার পাশে জমে থাকা ময়লা-আবর্জনা ও পচা বর্জ্য নানা ধরনের রোগের কারণ হতে পারে। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে এসব বর্জ্য দ্রুত দুর্গন্ধ ও জীবাণুর উৎসে পরিণত হয়। তাই স্থানীয় পর্যায়ে নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা জরুরি।
সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে বর্ষা মৌসুমে যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রায়ই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। গ্রামীণ সড়কগুলো কাদা ও পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যায়। ফলে স্থানীয় জনগণের দুর্ভোগ বেড়ে যায়। এমন বাস্তবতায় ডুংরিয়া গ্রামের এই স্বেচ্ছাশ্রমভিত্তিক উদ্যোগকে অনেকেই আশার প্রতীক হিসেবে দেখছেন।
সব মিলিয়ে, সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার এই ছোট্ট উদ্যোগ বড় একটি বার্তা দিয়েছে— সমাজ পরিবর্তনের জন্য সবসময় বড় বাজেট বা সরকারি প্রকল্পের প্রয়োজন হয় না; দরকার আন্তরিকতা, সচেতনতা এবং মানুষের জন্য কিছু করার মানসিকতা। ডুংরিয়া গ্রামের কয়েকজন মানুষের সেই মানবিক প্রয়াস এখন অনেকের কাছেই অনুপ্রেরণার গল্প হয়ে উঠেছে।


