প্রকাশ: ২২ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেটে কয়েকদিনের টানা বৃষ্টির পর আবহাওয়ায় পরিবর্তনের আভাস মিলতে শুরু করেছে। বৃষ্টিপাত কিছুটা কমে যাওয়ায় আবারও বাড়ছে গরমের তীব্রতা। দিনের বেলায় রোদের প্রখরতা এবং বাতাসে আর্দ্রতার মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় নগরজীবনে নেমে এসেছে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, আগামী ২৪ ঘণ্টায় তাপমাত্রা প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে। একইসঙ্গে কোথাও কোথাও বজ্রসহ বৃষ্টিপাত এবং ভারী বর্ষণের সম্ভাবনাও রয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২১ মে) সন্ধ্যায় সিলেট আবহাওয়া অফিস থেকে প্রকাশিত পূর্বাভাসে জানানো হয়, গত দুই দিনের মতো শুক্রবারও সিলেট অঞ্চলে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা প্রায় ৩৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের আশেপাশে থাকতে পারে। যদিও বিচ্ছিন্নভাবে কিছু এলাকায় বৃষ্টি হতে পারে, তবুও গরমের অস্বস্তি কমার সম্ভাবনা খুব একটা নেই।
আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার সিলেটের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছিল ৩৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং সর্বনিম্ন ছিল ২৩ দশমিক ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বৃহস্পতিবারও প্রায় একই অবস্থা বিরাজ করে। এদিন সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং সর্বনিম্ন ২২ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তবে তাপমাত্রা খুব বেশি না বাড়লেও বাতাসে আর্দ্রতার মাত্রা বেশি থাকায় মানুষের মধ্যে ভ্যাপসা গরমের অনুভূতি তীব্র হয়ে উঠেছে।
নগরীর বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দুপুরের পর থেকে রাস্তাঘাটে মানুষের চলাচল কমে আসে। বিশেষ করে শ্রমজীবী মানুষ, রিকশাচালক, নির্মাণশ্রমিক ও খোলা আকাশের নিচে কাজ করা কর্মজীবীরা গরমে সবচেয়ে বেশি কষ্টে পড়েছেন। নগরীর আম্বরখানা, জিন্দাবাজার, কদমতলী ও বন্দরবাজার এলাকায় দুপুরের দিকে মানুষের মধ্যে ক্লান্তি ও অস্বস্তির চিত্র দেখা গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, কয়েকদিন আগেও টানা বৃষ্টির কারণে আবহাওয়ায় কিছুটা স্বস্তি ছিল। কিন্তু বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ার পর হঠাৎ করেই গরম বাড়তে শুরু করেছে। আকাশে মেঘ থাকলেও বাতাসে আর্দ্রতার কারণে ঘরের ভেতরেও অস্বস্তি অনুভূত হচ্ছে। অনেকেই বলছেন, সন্ধ্যার পরও গরম কমছে না, ফলে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, সিলেট অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের পরিমাণও আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। আগের ৩৬ ঘণ্টায় যেখানে বৃষ্টিপাত হয়েছিল ১০৩ দশমিক ৮ মিলিমিটার, সেখানে বুধবার সকাল ৬টা থেকে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে মাত্র ৩১ দশমিক ৩ মিলিমিটার। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, বৃষ্টিপাত কমে গেলে সাধারণত বাতাসে জমে থাকা তাপ দ্রুত বের হতে পারে না, ফলে গরমের অনুভূতি আরও বেশি তীব্র হয়ে ওঠে।
তবে পুরোপুরি শুষ্ক আবহাওয়া এখনই ফিরছে না বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অফিস। আগামী ২৪ ঘণ্টার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, সিলেট বিভাগের কিছু এলাকায় হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টিপাত হতে পারে। কোথাও কোথাও ভারী বর্ষণের সম্ভাবনাও রয়েছে। একইসঙ্গে বজ্রসহ বৃষ্টি ও বজ্রপাতের আশঙ্কা রয়েছে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মে মাসে সিলেট অঞ্চলে এমন আবহাওয়া অস্বাভাবিক নয়। বর্ষা মৌসুম পুরোপুরি শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত এই সময়টায় কখনও তীব্র গরম, আবার কখনও ভারী বর্ষণ দেখা যায়। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের কারণে আবহাওয়ার এই ওঠানামা আগের চেয়ে আরও বেশি অনিশ্চিত হয়ে উঠছে বলেও তারা মনে করছেন।
চিকিৎসকরা এই সময় গরমজনিত অসুস্থতা থেকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। অতিরিক্ত গরমে শরীরে পানিশূন্যতা, মাথা ঘোরা, ক্লান্তি এবং হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়তে পারে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের প্রতি বেশি যত্ন নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। বাইরে বের হলে পর্যাপ্ত পানি পান, ছাতা ব্যবহার এবং রোদ এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিচ্ছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
কৃষিখাতেও আবহাওয়ার এই পরিবর্তনের প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সিলেট অঞ্চলে বোরো ধান কাটা ও সংগ্রহের সময় চলছে। হঠাৎ ভারী বৃষ্টি বা বজ্রপাত হলে কৃষকরা ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন। আবার অতিরিক্ত গরমে মাঠে কাজ করাও কষ্টকর হয়ে উঠছে। ফলে কৃষকেরা আবহাওয়ার পূর্বাভাসের দিকে সতর্ক নজর রাখছেন।
পর্যটন নগরী হিসেবে পরিচিত সিলেটেও আবহাওয়ার এই পরিবর্তনের প্রভাব দেখা যাচ্ছে। ছুটির দিনে অনেক পর্যটক সিলেটের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে ঘুরতে এলেও গরমের কারণে দিনের বেলায় বাইরে অবস্থান কিছুটা কমে গেছে। তবে বিকেল ও সন্ধ্যার দিকে পর্যটন এলাকাগুলোতে মানুষের উপস্থিতি বাড়তে দেখা যায়।
বিশ্লেষকদের মতে, আবহাওয়ার এমন বৈচিত্র্যময় পরিস্থিতি এখন বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রায় নিয়মিত হয়ে উঠছে। কখনও অতিবৃষ্টি, কখনও তীব্র গরম— এই দুই চরম পরিস্থিতির মধ্যেই সাধারণ মানুষকে খাপ খাইয়ে নিতে হচ্ছে। নগরাঞ্চলে অপরিকল্পিত উন্নয়ন, সবুজায়ন কমে যাওয়া এবং জলাবদ্ধতার মতো সমস্যাও গরমের অস্বস্তি বাড়িয়ে দিচ্ছে।
সব মিলিয়ে, সিলেটে আপাতত বৃষ্টি ও গরম— দুইয়েরই প্রভাব একসঙ্গে অনুভূত হচ্ছে। একদিকে তাপমাত্রা অপরিবর্তিত থাকায় বাড়ছে ভ্যাপসা গরমের কষ্ট, অন্যদিকে বজ্রসহ বৃষ্টির সম্ভাবনা তৈরি করছে নতুন শঙ্কা। আবহাওয়া অধিদপ্তর পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন সতর্কবার্তা দেওয়া হতে পারে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।


