প্রকাশ: ২২ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
বিদেশে কর্মসংস্থানের স্বপ্ন দেখিয়ে প্রতারণা, জিম্মিদশা, পাসপোর্ট আটকে রাখা এবং মানবিক সংকটে পড়া বাংলাদেশিদের নিয়ে উদ্বেগ নতুন নয়। মধ্যপ্রাচ্য থেকে শুরু করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে কাজের প্রলোভনে গিয়ে অনেক বাংলাদেশিই দালালচক্রের ফাঁদে পড়ে চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। সাম্প্রতিক সময়ে কম্বোডিয়া ও ইরাকে বাংলাদেশি নাগরিকদের ঘিরে ঘটে যাওয়া দুটি পৃথক ঘটনার পর আবারও সামনে এসেছে বিদেশে শ্রমবাজারে নিরাপত্তাহীনতা ও প্রতারণার ভয়াবহ চিত্র। তবে এসব ঘটনার মধ্যে কিছুটা স্বস্তির খবরও এসেছে— প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর হস্তক্ষেপে কম্বোডিয়ায় আটকে পড়া এক বাংলাদেশি নারী দেশে ফেরার সুযোগ পেয়েছেন এবং ইরাকে সাত প্রবাসী ফিরে পেয়েছেন তাদের জব্দ হওয়া পাসপোর্ট।
সরকারি সূত্র এবং সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, কম্বোডিয়ায় আটকে পড়া ওই বাংলাদেশি নারীর বয়স ৩৪ বছর। উন্নত বেতন ও কম্পিউটারভিত্তিক কাজের আশ্বাসে একটি ট্রাভেল এজেন্সির মাধ্যমে ২০২৫ সালের আগস্টে তাকে কম্বোডিয়ায় পাঠানো হয়। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পরই তার জীবনের বাস্তবতা সম্পূর্ণ বদলে যায়। অভিযোগ রয়েছে, দেশটিতে পৌঁছানোর পরপরই তার পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া হয় এবং তাকে একটি স্ক্যাম সেন্টারে আটকে রাখা হয়। সেখানে তাকে বাধ্য করা হয় বিভিন্ন ধরনের অনলাইন প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর বিভিন্ন প্রতিবেদনে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কম্বোডিয়া, মিয়ানমার ও লাওসের কিছু অঞ্চলে গড়ে ওঠা স্ক্যাম সেন্টার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। এসব কেন্দ্রে বিদেশি নাগরিকদের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে নিয়ে গিয়ে জোরপূর্বক অনলাইন প্রতারণা, আর্থিক জালিয়াতি এবং সাইবার অপরাধে ব্যবহার করার অভিযোগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই তাদের ওপর মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের ঘটনাও সামনে এসেছে।
উদ্ধার হওয়া বাংলাদেশি নারীও একই ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হন বলে জানা গেছে। তিনি একাধিকবার পালানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। প্রতিনিয়ত নজরদারির মধ্যে থেকে ভয় ও আতঙ্কে দিন কাটছিল তার। অবশেষে ২০২৬ সালের ২০ মে সুযোগ বুঝে দালালদের চোখ ফাঁকি দিয়ে স্ক্যাম সেন্টার থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন তিনি। অচেনা শহরে আত্মগোপনে থেকে তিনি বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর সঙ্গে সরাসরি হোয়াটসঅ্যাপ কলে যোগাযোগ করেন এবং দেশে ফিরতে সাহায্য চান।
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, বিষয়টি জানার পর মন্ত্রী দ্রুত ব্যাংককে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রম কাউন্সিলরের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। দূতাবাসের কর্মকর্তারা ভিডিও কলে ওই নারীর অবস্থান নিশ্চিত করেন। পরে কম্বোডিয়ায় অবস্থানরত বাংলাদেশি কমিউনিটির সহযোগিতায় নমপেন শহর থেকে তাকে উদ্ধার করা হয়। বর্তমানে কম্বোডিয়া সরকারের সহায়তায় ট্রাভেল পাস ইস্যুর প্রক্রিয়া চলছে এবং আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে বলে দূতাবাস সূত্রে জানা গেছে।
এই ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেকেই বিদেশগামী শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে আরও কঠোর নজরদারির দাবি জানিয়েছেন। বিশেষ করে ভুয়া চাকরির বিজ্ঞাপন ও অননুমোদিত ট্রাভেল এজেন্সির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন সচেতন মহল।
অন্যদিকে একই সময়ে ইরাকেও বাংলাদেশি শ্রমিকদের নিয়ে বেশ কয়েকটি অভিযোগ সামনে আসে। অভিযোগের ভিত্তিতে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশ দূতাবাসকে তদন্তের নির্দেশ দেন। তদন্তে গিয়ে দূতাবাসের কর্মকর্তারা একটি কোম্পানির কাছে সাত বাংলাদেশি শ্রমিকের পাসপোর্ট জব্দ থাকার সত্যতা পান। পরবর্তীতে দূতাবাসের হস্তক্ষেপে সেই সাতজন তাদের পাসপোর্ট ফেরত পান।
পাসপোর্ট ফিরে পাওয়ার পর ওই প্রবাসীরা জানান, তারা ইরাকেই কাজ চালিয়ে যেতে চান এবং নিজেদের উদ্যোগে কাজের ব্যবস্থাও করেছেন। তবে পাসপোর্ট আটকে রাখার ঘটনায় তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেন। আন্তর্জাতিক শ্রম আইন অনুযায়ী, কোনো নিয়োগকর্তা কর্মীদের পাসপোর্ট জব্দ করে রাখতে পারেন না। মানবাধিকার সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরেই মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে শ্রমিকদের পাসপোর্ট আটকে রাখার ঘটনাকে শ্রম অধিকার লঙ্ঘনের অন্যতম বড় উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করে আসছে।
এদিকে আরও দুটি অভিযোগ আসে বাংলাদেশি দুই শ্রমিক রিজু মিয়া ও আইলান মিয়াকে নিয়ে। তাদের পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করেন, দালালচক্রের মাধ্যমে ইরাকে গিয়ে তারা নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এবং ঠিকমতো খাবারও পাচ্ছেন না। বিষয়টি জানার পর মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে ইরাকে বাংলাদেশ দূতাবাস তদন্ত শুরু করে।
দূতাবাসের কর্মকর্তারা বাগদাদের আরাসাত এলাকায় একটি ভাড়া করা ভবনে গিয়ে ওই দুই বাংলাদেশিকে খুঁজে পান। তদন্তে শারীরিক নির্যাতনের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ না মিললেও তাদের অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে থাকার বিষয়টি উঠে আসে। পরবর্তীতে দূতাবাসের সহায়তায় এবং সংশ্লিষ্ট রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে গত ৭ মে তাদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখনও দালালচক্র ও অনিয়ন্ত্রিত রিক্রুটিং ব্যবস্থার বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। গ্রামের সাধারণ মানুষ অনেক সময় মোটা অঙ্কের টাকা খরচ করে বিদেশে পাড়ি জমান, কিন্তু গন্তব্য দেশে গিয়ে তারা প্রতারণা, বেতন বঞ্চনা কিংবা মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হন। এ কারণে বিদেশগামী কর্মীদের জন্য সচেতনতা বৃদ্ধি, অনুমোদিত এজেন্সির তালিকা প্রকাশ এবং দূতাবাসগুলোর মনিটরিং আরও জোরদার করার দাবি উঠেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমান বিশ্বে মানবপাচার ও সাইবার জালিয়াতি নতুন রূপে বিস্তার লাভ করছে। বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় তথাকথিত স্ক্যাম সেন্টারগুলো আন্তর্জাতিক উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। সেখানে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের তরুণ-তরুণীদের চাকরির প্রলোভনে নিয়ে গিয়ে আটকে রাখার অভিযোগ ক্রমেই বাড়ছে। ফলে বিদেশে যাওয়ার আগে চাকরির প্রকৃতি, নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠান এবং ভিসার বৈধতা যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।
সব মিলিয়ে কম্বোডিয়া ও ইরাকের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো আবারও প্রমাণ করেছে, বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ যেমন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেয়, তেমনি অসতর্কতা ও দালালচক্রের প্রতারণা জীবনে ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। একই সঙ্গে এই ঘটনাগুলো প্রবাসীদের সুরক্ষায় রাষ্ট্রীয় তৎপরতা এবং কূটনৈতিক উদ্যোগের গুরুত্বও নতুনভাবে সামনে নিয়ে এসেছে।


