প্রকাশ: ২২ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেটে পারিবারিক বিরোধকে কেন্দ্র করে মহানগর যুবদলের এক নেতার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ ওঠায় রাজনৈতিক অঙ্গনসহ স্থানীয় এলাকায় ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে। অভিযুক্ত নেতা সিলেট মহানগর যুবদলের সহ-সভাপতি সৈয়দ আবু শাহিন আজাদ (খোকন)। তার বিরুদ্ধে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং বাড়ি দখলের হুমকির অভিযোগ তুলেছেন তারই জন্মদাত্রী মা সাহেনা বেগম। অভিযোগটি সিলেট মহানগর বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের কাছে লিখিতভাবে জমা দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
বুধবার (২০ মে) অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সিলেট মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসান কয়েস লোদী। অভিযোগকারী সাহেনা বেগম সিলেট নগরীর সুবিদবাজার বনকলাপাড়া এলাকার বাসিন্দা। তিনি মরহুম বীর মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ তছির আহমদের স্ত্রী। দীর্ঘদিন ধরে পারিবারিক কলহের জেরে তাদের পরিবারে অশান্তি বিরাজ করছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
অভিযোগপত্রে সাহেনা বেগম দাবি করেন, তার বড় ছেলে শাহিন আজাদ খোকন দীর্ঘদিন ধরে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে আসছেন। শুধু মানসিক নির্যাতন নয়, শারীরিকভাবে হেনস্তার অভিযোগও তিনি উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, বাড়ির মালিকানা ও পারিবারিক সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের জেরে খোকন প্রায়ই বাড়িতে এসে হুমকি-ধমকি দেন এবং পরিবারকে আতঙ্কের মধ্যে রাখেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েকবার সন্ত্রাসী বাহিনী নিয়ে বাড়িতে এসে ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হয়েছে এবং বাড়ি দখলের চেষ্টা চালানো হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, পরিবারের অন্য দুই ছেলের বিরুদ্ধেও বিভিন্ন সময়ে মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। এতে পুরো পরিবার চরম মানসিক চাপে রয়েছে। সাহেনা বেগম তার লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করেন, একজন রাজনৈতিক সংগঠনের দায়িত্বশীল পদে থেকে শাহিন আজাদ খোকনের এমন আচরণ শুধু পারিবারিক পরিবেশ নষ্ট করছে না, বরং দলের ভাবমূর্তিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিষয়টি নতুন নয়। কয়েক বছর ধরেই পরিবারটির মধ্যে সম্পত্তি ও পারিবারিক কর্তৃত্ব নিয়ে দ্বন্দ্ব চলছে। এলাকাবাসীর একটি অংশের দাবি, বিরোধের বিষয়টি একাধিকবার স্থানীয়ভাবে মীমাংসার চেষ্টা হলেও স্থায়ী সমাধান হয়নি। ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উত্তেজনা আরও বেড়েছে।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন শাহিন আজাদ খোকন। তিনি বলেন, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। পারিবারিক কিছু বিরোধ থাকলেও সেটিকে রাজনৈতিকভাবে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা চলছে বলে তিনি দাবি করেন। তার ভাষায়, “এলাকাবাসী পুরো বিষয়টি জানেন। ৭ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির নেতারাও অবগত আছেন। এখানে দীর্ঘদিনের পারিবারিক মামলা ও জটিলতা রয়েছে। একটি পক্ষ ইচ্ছাকৃতভাবে আমাকে হেয় করার চেষ্টা করছে।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পরিবারভিত্তিক বিরোধ যখন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে, তখন তা দলীয় ভাবমূর্তির ওপরও প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ প্রকাশ্যে এলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সাধারণ মানুষের মধ্যে দ্রুত প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। অনেকেই মনে করছেন, অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে দ্রুত সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া না হলে বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
সিলেট মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসান কয়েস লোদী বলেছেন, অভিযোগটি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। তিনি জানান, যেহেতু অভিযোগকারী একজন মা এবং অভিযোগের বিষয়বস্তু অত্যন্ত স্পর্শকাতর, তাই বিষয়টি খতিয়ে দেখতে মহানগর যুবদল নেতৃবৃন্দকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, “এটি মূলত পারিবারিক সমস্যা হলেও অভিযোগের গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা জানার চেষ্টা করা হবে।”
রাজনৈতিক অঙ্গনে এমন অভিযোগ নতুন নয়। অতীতেও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতাদের বিরুদ্ধে পারিবারিক সহিংসতা, সম্পত্তি বিরোধ কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব ঘটনা দলীয় তদন্তের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে এবং পরবর্তীতে আর প্রকাশ্যে খুব বেশি আলোচনা হয় না। কিন্তু বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যাপক প্রসারের কারণে যেকোনো অভিযোগ দ্রুত জনমনে আলোচনার জন্ম দিচ্ছে।
মানবাধিকারকর্মীদের মতে, পারিবারিক সহিংসতা কিংবা বয়স্ক মায়ের নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগকে কখনোই হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়। পরিবারের ভেতরে সহিংসতা সামাজিক অবক্ষয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। বিশেষ করে সমাজে প্রভাবশালী বা রাজনৈতিকভাবে পরিচিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ উঠলে তদন্ত আরও নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ হওয়া প্রয়োজন।
স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, এই ঘটনার প্রভাব কেবল পারিবারিক পরিসরে সীমাবদ্ধ থাকবে না। সামনে রাজনৈতিক কর্মসূচি ও সাংগঠনিক কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে বিষয়টি সিলেট মহানগর যুবদলের অভ্যন্তরেও আলোচনার জন্ম দিতে পারে। একই সঙ্গে দলীয় নেতৃত্বের জন্যও এটি একটি পরীক্ষার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে— তারা অভিযোগকে কতটা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেন এবং সাংগঠনিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে কী ধরনের পদক্ষেপ নেন।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ঘটনাটি নিয়ে নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। কেউ কেউ অভিযোগকারীর পাশে দাঁড়িয়ে দ্রুত বিচার দাবি করছেন, আবার অনেকে এটিকে পারিবারিক বিরোধ বলে আখ্যা দিয়ে যাচাই-বাছাই ছাড়া মন্তব্য না করার আহ্বান জানিয়েছেন। রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে ঘটনাটি সাধারণ মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে।
সব মিলিয়ে, সিলেট মহানগর যুবদলের এই নেতাকে ঘিরে ওঠা অভিযোগ এখন স্থানীয় রাজনীতি ও সামাজিক অঙ্গনে আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে। অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং পরবর্তী সাংগঠনিক পদক্ষেপের দিকে এখন নজর সবার।


