প্রকাশ: ২০ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জ উপজেলায় আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির সম্প্রসারণ, পুষ্টিনির্ভর কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘পার্টনার কংগ্রেস’ সভা। কৃষিকে প্রযুক্তিনির্ভর ও টেকসই রূপ দেওয়ার প্রত্যয়ে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে অংশ নেন কৃষক, কৃষি উদ্যোক্তা, জনপ্রতিনিধি, প্রশাসনের কর্মকর্তা এবং স্থানীয় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
মঙ্গলবার (১৯ মে) দুপুরে আজমিরীগঞ্জ উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উদ্যোগে এ সভার আয়োজন করা হয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের “প্রোগ্রাম অন এগ্রিকালচারাল অ্যান্ড রুরাল ট্রান্সফরমেশন ফর নিউট্রিশন, এন্টারপ্রেনরশিপ অ্যান্ড রেসিলিয়েন্স ইন বাংলাদেশ (পার্টনার)” প্রকল্পের আওতায় অনুষ্ঠিত এই সভাকে কেন্দ্র করে কৃষকদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ দেখা যায়।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন আজমিরীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম রেজাউল করিম। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন হবিগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য আবু মনসুর সাখাওয়াত হাসান (ডা. জীবন)। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন হবিগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ মো. আনোয়ারুল হক এবং জেলা কৃষি অধিদপ্তরের কর্মকর্তা ডা. শাবানা পারভীন।
এছাড়াও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন আজমিরীগঞ্জ উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. জসিম উদ্দিন চৌধুরী, আজমিরীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আকবর হোসেনসহ উপজেলার বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তারা। সভায় অংশ নেন প্রান্তিক কৃষক-কৃষাণী, কৃষি উদ্যোক্তা, সাংবাদিক, জনপ্রতিনিধি, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং সচেতন নাগরিকরা।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তার মূলভিত্তি কৃষি। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং আধুনিক প্রযুক্তির সীমিত ব্যবহার কৃষকদের জন্য নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে এবং কৃষকদের হাতে আধুনিক জ্ঞান ও প্রশিক্ষণ পৌঁছে দিতে হবে।
বক্তারা আরও বলেন, “পার্টনার” প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো কৃষকদের আধুনিক ও টেকসই কৃষি পদ্ধতির সঙ্গে যুক্ত করা। শুধু ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি নয়, বরং পুষ্টি, উদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং জলবায়ু সহনশীল কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তুলতেও এই প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। মাঠপর্যায়ে কৃষকদের বিভিন্ন ধরনের ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে, যাতে তারা কম খরচে বেশি উৎপাদন করতে পারেন এবং বাজার ব্যবস্থার সঙ্গে নিজেদের আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করতে পারেন।
সভায় বক্তারা উল্লেখ করেন, কৃষি এখন আর শুধু চাষাবাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। কৃষিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠছে নতুন নতুন উদ্যোক্তা, কৃষিভিত্তিক শিল্প এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ। তরুণদের কৃষিতে আগ্রহী করে তুলতে প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি ব্যবস্থার প্রসার জরুরি। আধুনিক কৃষিযন্ত্র, উন্নত বীজ, স্মার্ট সেচ ব্যবস্থা এবং ডিজিটাল কৃষি তথ্যসেবার মাধ্যমে কৃষকদের উৎপাদনশীলতা বাড়ানো সম্ভব বলে মত দেন তারা।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে সংসদ সদস্য আবু মনসুর সাখাওয়াত হাসান বলেন, বাংলাদেশের কৃষক এখন আর আগের মতো পিছিয়ে নেই। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং সরকারের নানা উদ্যোগের কারণে কৃষি খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। তিনি বলেন, দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষকদের আরও দক্ষ ও প্রযুক্তিবান্ধব করে তুলতে হবে। এজন্য মাঠপর্যায়ে প্রশিক্ষণ ও সহায়তা কার্যক্রম আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
তিনি আরও বলেন, হাওরাঞ্চলের কৃষকদের জন্য বিশেষ পরিকল্পনা নেওয়া জরুরি। কারণ প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং আকস্মিক বন্যার কারণে এ অঞ্চলের কৃষকরা প্রায়ই ক্ষতির মুখে পড়েন। তাই জলবায়ু সহনশীল ফসল, দ্রুত ফলনশীল জাত এবং প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি ব্যবস্থার প্রসার সময়ের দাবি।
সভাপতির বক্তব্যে ইউএনও এস এম রেজাউল করিম বলেন, কৃষিকে টেকসই ও লাভজনক করতে সরকার ধারাবাহিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে। কৃষকদের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দিতে উপজেলা প্রশাসন ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর একসঙ্গে কাজ করছে। তিনি বলেন, আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার শুধু উৎপাদন বাড়াবে না, বরং কৃষকের জীবনমান উন্নয়নেও ভূমিকা রাখবে।
কৃষি কর্মকর্তারা জানান, “পার্টনার” প্রকল্পের আওতায় কৃষকদের প্রশিক্ষণের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে নতুন প্রযুক্তি প্রদর্শনী, উন্নত বীজ বিতরণ এবং কৃষি উদ্যোক্তা তৈরির কার্যক্রমও পরিচালিত হচ্ছে। বিশেষ করে নারী কৃষকদের সম্পৃক্ততা বাড়াতে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, যাতে তারা অর্থনৈতিকভাবে আরও স্বাবলম্বী হতে পারেন।
অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া কয়েকজন কৃষক বলেন, আগের তুলনায় এখন কৃষি বিষয়ে অনেক নতুন তথ্য ও প্রযুক্তি পাওয়া যাচ্ছে। এসব প্রশিক্ষণ ও সভার মাধ্যমে তারা নতুন পদ্ধতি সম্পর্কে জানতে পারছেন, যা বাস্তবে কাজে লাগাতে পারলে উৎপাদন বাড়বে এবং খরচ কমবে। অনেকেই আশা প্রকাশ করেন, এ ধরনের কর্মসূচি নিয়মিত হলে কৃষকদের মধ্যে সচেতনতা ও আগ্রহ আরও বাড়বে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বাংলাদেশের কৃষিকে ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সক্ষম করতে হলে প্রযুক্তিনির্ভর ও গবেষণাভিত্তিক কৃষি ব্যবস্থার বিকল্প নেই। একইসঙ্গে কৃষকদের আর্থিক সহায়তা, বাজার ব্যবস্থাপনা এবং প্রশিক্ষণ কার্যক্রম আরও কার্যকর করতে হবে। তাহলেই কৃষিভিত্তিক গ্রামীণ অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে।
আজমিরীগঞ্জের এই ‘পার্টনার কংগ্রেস’ সভা তাই শুধু একটি আনুষ্ঠানিক আয়োজন নয়, বরং কৃষিকে আধুনিক ও টেকসই রূপ দেওয়ার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবেই দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।


