প্রকাশ: ২০ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
জীবনের তাগিদে হাজারো স্বপ্ন নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কাতারে পাড়ি জমিয়েছিলেন মৌলভীবাজারের মিছবা উদ্দিন। পরিবারের দারিদ্র্য দূর করা, তিন কন্যাসন্তানের ভবিষ্যৎ গড়া এবং সংসারে স্বচ্ছলতা ফেরানোর স্বপ্ন নিয়েই প্রবাসজীবন শুরু করেছিলেন তিনি। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না। দুরারোগ্য ক্যানসার কেড়ে নিল তার জীবন। মৃত্যুর ছয় দিন পার হয়ে গেলেও প্রশাসনিক জটিলতা ও কাগজপত্রের ধীরগতির কারণে এখনো দেশে ফেরেনি তার মরদেহ। এতে শোকের পাশাপাশি চরম অনিশ্চয়তা ও উৎকণ্ঠার মধ্যে দিন কাটছে পরিবারটির।
নিহত মিছবা উদ্দিন (৫২) মৌলভীবাজার জেলার জগৎশী ইউনিয়নের বাসিন্দা এবং মনোয়ার মিয়ার ছেলে। প্রায় দেড় বছর আগে জীবিকার সন্ধানে তিনি কাতারে যান। স্থানীয়ভাবে পরিচিত শান্ত স্বভাবের এই মানুষটি সংসারের হাল ধরতেই বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন। পরিবার সূত্রে জানা গেছে, বিদেশে যাওয়ার আগে নানা কষ্ট আর ধারদেনা করে তার বিদেশযাত্রার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। আশা ছিল, কিছুদিন পরই পরিবারের অবস্থার পরিবর্তন হবে। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে এখন সেই পরিবারই প্রিয়জনের মরদেহ ফেরার অপেক্ষায় দিন গুনছে।
স্বজনরা জানান, কাতারে অবস্থানকালে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন মিছবা উদ্দিন। পরে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় তার শরীরে ক্যানসার ধরা পড়ে। দীর্ঘদিন ধরে তিনি কাতারের একটি স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। চিকিৎসকরা তাকে সুস্থ করে তুলতে চেষ্টা চালালেও শেষ পর্যন্ত জীবনযুদ্ধে হার মানেন তিনি। গত শুক্রবার (১৫ মে) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
কিন্তু মৃত্যুর পর থেকেই নতুন করে শুরু হয়েছে আরেকটি দুঃসহ অধ্যায়। পরিবারের অভিযোগ, প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে নিয়োগকারী কোম্পানির ধীরগতি এবং কিছু আনুষ্ঠানিক জটিলতার কারণে এখনো মরদেহ দেশে পাঠানো সম্ভব হয়নি। এতে একদিকে যেমন পরিবারের সদস্যরা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন, অন্যদিকে আর্থিক অনিশ্চয়তাও তাদের ঘিরে ধরেছে।
নিহতের স্ত্রী ও তিন কন্যাসন্তান এখন দিশেহারা। স্বামীর মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর থেকেই কান্নায় ভেঙে পড়েছেন স্ত্রী। সন্তানরা বাবার মরদেহ শেষবারের মতো দেখতে চাইলেও কবে মরদেহ দেশে ফিরবে, তা নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না কেউ। প্রতিবেশীরা বলছেন, পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে পরিবারটি এখন মানবেতর পরিস্থিতির মুখোমুখি।
জগৎশী এলাকায় মিছবা উদ্দিনের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই শোকের ছায়া নেমে আসে। স্থানীয় মসজিদ, চায়ের দোকান এবং বিভিন্ন সামাজিক আড্ডায় এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু এই প্রবাসীর করুণ মৃত্যু। এলাকাবাসী বলছেন, বিদেশে থাকা প্রবাসীরা পরিবার ও দেশের অর্থনীতির জন্য অসামান্য অবদান রাখলেও বিপদের সময় অনেক পরিবারকে অসহায় অবস্থার মধ্যে পড়তে হয়।
স্বজনরা দ্রুত মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর এবং কাতারে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তাদের দাবি, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দ্রুত সম্পন্ন করে মরদেহ দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হোক, যাতে পারিবারিকভাবে দাফন সম্পন্ন করা যায়।
এ বিষয়ে কাতার জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মাহবুবুর রহমান চৌধুরী বাবু জানান, ঘটনাটি জানার পর থেকেই তারা মরদেহ দ্রুত দেশে পাঠানোর বিষয়ে কাজ করছেন। তিনি বলেন, প্রবাসীদের যেকোনো সংকটে সংগঠনটি পাশে থাকার চেষ্টা করে। মিছবা উদ্দিনের ক্ষেত্রেও আইনি ও প্রশাসনিক সহায়তার জন্য সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।
তিনি আরও জানান, কাতারে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রম উইংয়ের কর্মকর্তা নুরুল ইসলামের সঙ্গেও তারা যোগাযোগ করেছেন। দূতাবাসের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়াগুলো দ্রুত সম্পন্ন করার জন্য দূতাবাসও কাজ করছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের অনেক সময় চিকিৎসা, বীমা, শ্রম অধিকার এবং মৃত্যুর পর মরদেহ দেশে পাঠানো নিয়ে নানা জটিলতায় পড়তে হয়। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের শ্রমিকদের পরিবার এসব পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়ে। ফলে প্রবাসীদের সুরক্ষা এবং জরুরি সহায়তা ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন তারা।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসীদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতি বছর লাখ লাখ শ্রমিক বিদেশে গিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা পাঠিয়ে দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে ভূমিকা রাখছেন। কিন্তু তাদের জীবনের নিরাপত্তা, চিকিৎসা সুবিধা এবং মৃত্যুর পর মরদেহ ফেরত আনার বিষয়গুলো এখনও অনেক ক্ষেত্রে জটিল ও সময়সাপেক্ষ হয়ে দাঁড়ায়।
মিছবা উদ্দিনের মৃত্যুর ঘটনায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সচেতন মহলও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা বলছেন, একজন প্রবাসীর মরদেহ দিনের পর দিন বিদেশে পড়ে থাকা অত্যন্ত কষ্টদায়ক ও মানবিকভাবে বিব্রতকর। এ ধরনের ঘটনায় দ্রুত সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
এখন পুরো পরিবার অপেক্ষা করছে একটি ফোনকলের—যে ফোনে জানানো হবে, বহু প্রতীক্ষার পর অবশেষে দেশে ফিরছে মিছবা উদ্দিনের মরদেহ। পরিবারের সদস্যদের একটাই আকুতি, প্রিয় মানুষটিকে শেষবারের মতো যেন নিজ গ্রামের মাটিতে দাফন করতে পারেন তারা।


