প্রকাশ: ২০ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
‘জনবান্ধব অটোমেটেড ভূমি ব্যবস্থাপনা, সুরক্ষিত ভূমি, সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ’—এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলায় শুরু হয়েছে তিনদিনব্যাপী ভূমিসেবা মেলা-২০২৬। ভূমি ব্যবস্থাপনাকে আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও সাধারণ মানুষের জন্য সহজলভ্য করতে সরকারের উদ্যোগের অংশ হিসেবে আয়োজিত এই মেলাকে ঘিরে স্থানীয় জনগণের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ লক্ষ্য করা গেছে।
মঙ্গলবার (১৯ মে) সকাল ১০টায় উপজেলা ভূমি অফিস প্রাঙ্গণে আনুষ্ঠানিকভাবে মেলার উদ্বোধন করা হয়। দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো শাল্লাতেও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে যুক্ত হয়ে অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। উদ্বোধনের পরপরই উপজেলা ভূমি অফিস থেকে একটি বর্ণাঢ্য র্যালি বের করা হয়। র্যালিটি উপজেলা সদরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে পুনরায় ভূমি অফিস প্রাঙ্গণে এসে শেষ হয়। পরে সেখানে জনসচেতনতামূলক সভা অনুষ্ঠিত হয়।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন শাল্লা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পিয়াস চন্দ্র দাস। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) সায়ীদ মুহাম্মদ, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শুভজিত রায়, ভ্যাটেনারি সার্জন মুকিত মিয়া, উপজেলা প্রকৌশলী আরিফ উল্যা, ইনস্ট্রাক্টর আনোয়ার হোসেন, উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক সিরাজুল ইসলাম, প্রথম যুগ্ম আহ্বায়ক আব্দুল আউয়াল, শাল্লা থানার পুলিশ প্রশাসনের কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি দপ্তরের প্রতিনিধি, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, ভূমি সংক্রান্ত সেবা নিয়ে সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি কমাতে সরকার প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। অনলাইনে নামজারি, খতিয়ান, ভূমি উন্নয়ন কর প্রদান এবং বিভিন্ন আবেদন প্রক্রিয়া চালুর ফলে মানুষ এখন আগের তুলনায় অনেক দ্রুত ও সহজে সেবা পাচ্ছেন। ভূমিসেবা মেলার মাধ্যমে এসব ডিজিটাল সেবা সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করা এবং সরাসরি সেবা প্রদানের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
সভাপতির বক্তব্যে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পিয়াস চন্দ্র দাস বলেন, ভূমি ব্যবস্থাপনাকে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে সরকার নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। তিনি বলেন, একসময় ভূমি সংক্রান্ত নানা জটিলতা ও হয়রানির অভিযোগ থাকলেও এখন ধীরে ধীরে সেই চিত্র বদলাচ্ছে। প্রযুক্তিনির্ভর সেবা চালুর ফলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়ছে এবং সাধারণ মানুষও দ্রুত সেবা পাচ্ছেন।
তিনি আরও বলেন, গ্রামের সাধারণ মানুষ যাতে দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগীর শিকার না হন, সেজন্য ভূমি অফিসগুলোকে আরও জনবান্ধব করার চেষ্টা চলছে। ভূমিসেবা মেলার মাধ্যমে মানুষ সরাসরি বিভিন্ন তথ্য জানতে পারছেন, সমস্যার সমাধান পাচ্ছেন এবং ডিজিটাল সেবা ব্যবহারের বিষয়ে ধারণা অর্জন করছেন।
মেলায় বিভিন্ন সেবামূলক স্টল স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ, অনলাইনে নামজারি আবেদন, ই-খতিয়ান সংগ্রহ, মৌজা ম্যাপ সম্পর্কে তথ্য এবং ভূমি সংক্রান্ত আইনগত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় জনগণ এসব সেবা সম্পর্কে জানতে আগ্রহ নিয়ে স্টলগুলো ঘুরে দেখেন। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে ডিজিটাল ভূমি ব্যবস্থাপনা নিয়ে কৌতূহল দেখা যায়।
শাল্লার মতো হাওরাঞ্চলে ভূমি নিয়ে বিরোধ ও জটিলতা নতুন কিছু নয়। নদীভাঙন, মৌসুমি পরিবর্তন এবং জমির সীমানা নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে প্রায়ই বিরোধ দেখা দেয়। এ কারণে ভূমি ব্যবস্থাপনাকে আধুনিক ও তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর করার বিষয়টি এখানে আরও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, আগে একটি খতিয়ান তুলতে বা নামজারি করতে অনেক সময় উপজেলা সদরে বারবার যেতে হতো। অনেকেই প্রক্রিয়া না বুঝে হয়রানির শিকার হতেন। এখন ডিজিটাল পদ্ধতির কারণে সেবাগুলো অনেক সহজ হচ্ছে। তবে গ্রামের সাধারণ মানুষকে আরও বেশি সচেতন করতে নিয়মিত প্রচারণা প্রয়োজন বলেও মনে করেন তারা।
অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া কয়েকজন শিক্ষক ও শিক্ষার্থী বলেন, ভূমি বিষয়ক জ্ঞান শুধু জমির মালিকদের জন্য নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ জমি সংক্রান্ত বিরোধ অনেক সময় সামাজিক অস্থিরতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই ভূমি আইন ও ডিজিটাল সেবার বিষয়ে সচেতনতা বাড়লে বিরোধও কমে আসবে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তিনদিনব্যাপী এই মেলায় সাধারণ মানুষের বিভিন্ন সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান দেওয়ার চেষ্টা করা হবে। পাশাপাশি ভূমি ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও আধুনিকায়নের বিষয়ে জনগণকে অবহিত করা হবে। বিশেষ করে অনলাইন সেবা গ্রহণের পদ্ধতি হাতে-কলমে শেখানোর উদ্যোগও রাখা হয়েছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বাংলাদেশে ভূমি ব্যবস্থাপনা দীর্ঘদিন ধরেই একটি জটিল খাত হিসেবে পরিচিত। জমির রেকর্ড, মালিকানা বিরোধ এবং প্রশাসনিক জটিলতা সাধারণ মানুষের ভোগান্তির বড় কারণ। তাই ভূমি ব্যবস্থাপনাকে ডিজিটাল ও স্বচ্ছ করতে সরকারের উদ্যোগ কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতে এ খাতে দুর্নীতি ও হয়রানি অনেকাংশে কমে আসতে পারে।
শাল্লার এই ভূমিসেবা মেলা শুধু একটি প্রশাসনিক আয়োজন নয়, বরং প্রযুক্তিনির্ভর সেবার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জনেরও একটি প্রচেষ্টা বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। এখন দেখার বিষয়, এই উদ্যোগ কতটা কার্যকরভাবে মানুষের দৈনন্দিন ভূমিসংক্রান্ত সমস্যার সমাধান দিতে পারে।


