প্রকাশ: ১১ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
দীর্ঘদিনের ভোগান্তি, অব্যবস্থাপনা এবং অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে চলা সিলেট-ঢাকা যোগাযোগ ব্যবস্থায় অবশেষে আশার আলো দেখছেন সিলেটবাসী। দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই রুটে সরাসরি একটি বিশেষ ট্রেন চালুর ঘোষণা দিয়েছে সরকার। সড়ক ও রেলপথ মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম জানিয়েছেন, নতুন লোকোমোটিভ ও কোচ দেশে পৌঁছানোর পর আগামী ৬ থেকে ৯ মাসের মধ্যেই ঢাকা-সিলেট রুটে বিশেষ ট্রেন চালুর উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হবে।
শনিবার রাজধানীর ফার্মগেটে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় তিনি এ ঘোষণা দেন। সভাটিতে বিএনপি, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। সেখানে সিলেট জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক আব্দুল আহাদ খান জামাল সিলেটবাসীর দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের বিষয়টি তুলে ধরেন। বিশেষ করে সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের সম্প্রসারণ কাজের ধীরগতি এবং রেলপথের নাজুক পরিস্থিতি নিয়ে তিনি মন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
তার বক্তব্যে তিনি উল্লেখ করেন, সিলেট-ঢাকা মহাসড়কে প্রায় প্রতিদিন দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়। উন্নয়ন কাজ বছরের পর বছর ধরে চললেও কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। এতে ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী, শিক্ষার্থী ও রোগীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়ছেন। একই সঙ্গে সিলেট-ঢাকা রেলপথেও প্রায়ই শিডিউল বিপর্যয়, যান্ত্রিক ত্রুটি ও দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটছে। ফলে অনেক যাত্রী বাধ্য হয়ে সড়কপথ ব্যবহার করছেন, যেখানে ভোগান্তি আরও বেশি।
এই বাস্তবতা তুলে ধরে আব্দুল আহাদ খান জামাল মন্ত্রীর কাছে জানতে চান, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের কাজ দ্রুত শেষ করা এবং এই রুটে একটি সরাসরি ট্রেন চালুর বিষয়ে সরকারের কোনো পরিকল্পনা রয়েছে কি না। জবাবে সড়ক ও রেলপথ মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম আশাব্যঞ্জক বার্তা দেন। তিনি বলেন, নতুন লোকোমোটিভ ও কোচ সংগ্রহের প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে এগিয়ে চলছে। এগুলো দেশে পৌঁছানোর পর সরকার সিলেট-ঢাকা রুটে একটি বিশেষ ট্রেন চালু করবে।
মন্ত্রী বলেন, “আমাদের লোকোমোটিভ আসছে, কোচ আসছে। আমি অঙ্গীকার করছি, আগামী ৬ থেকে ৯ মাসের মধ্যে আমরা এগুলো চালু করতে সক্ষম হবো। তখন অবশ্যই ঢাকা-সিলেট রুটে সরাসরি একটি বিশেষ ট্রেন চালু করা হবে।”
তার এই ঘোষণার পর উপস্থিত সিলেটবাসীর মধ্যে উচ্ছ্বাস দেখা যায়। দীর্ঘদিন ধরে একটি দ্রুত, নির্ভরযোগ্য ও আরামদায়ক ট্রেন সার্ভিসের দাবি জানিয়ে আসছিলেন সিলেট অঞ্চলের মানুষ। বিশেষ করে প্রবাসী অধ্যুষিত অঞ্চল হওয়ায় সিলেট-ঢাকা রুটে প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক যাত্রী চলাচল করেন। ঈদ, ছুটি কিংবা উৎসবের সময় এই চাপ আরও কয়েকগুণ বেড়ে যায়। কিন্তু বিদ্যমান ট্রেনসংখ্যা ও সেবার মান সেই তুলনায় যথেষ্ট নয় বলে অভিযোগ রয়েছে দীর্ঘদিনের।
বর্তমানে সিলেট-ঢাকা রুটে চলাচলকারী ট্রেনগুলোর মধ্যে পারাবত এক্সপ্রেস, জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস, উপবন এক্সপ্রেস ও কালনী এক্সপ্রেস অন্যতম। তবে যাত্রীদের অভিযোগ, অধিকাংশ ট্রেন সময়সূচি মেনে চলতে পারে না। অনেক সময় কয়েক ঘণ্টা বিলম্বে ট্রেন গন্তব্যে পৌঁছায়। রেললাইনের বিভিন্ন অংশ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ায় গতি কমিয়ে ট্রেন চালাতে হয়, যা যাত্রার সময় আরও বাড়িয়ে দেয়।
রেলওয়ের কর্মকর্তাদের মতে, সিলেট-ঢাকা রুটে নতুন ট্রেন চালু করতে হলে শুধু কোচ ও লোকোমোটিভ নয়, অবকাঠামোগত উন্নয়নও জরুরি। বিশেষ করে ডাবল লাইন সম্প্রসারণ, আধুনিক সিগন্যালিং ব্যবস্থা এবং পুরোনো রেলসেতু সংস্কারের কাজ দ্রুত সম্পন্ন করা প্রয়োজন। ইতোমধ্যে সরকার কয়েকটি উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নিয়েছে বলেও জানা গেছে।
সিলেট অঞ্চলের ব্যবসায়ী ও প্রবাসী পরিবারের সদস্যরা বলছেন, একটি বিশেষ ট্রেন চালু হলে শুধু যাত্রীসেবাই উন্নত হবে না, অর্থনৈতিক কার্যক্রমেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। রাজধানীর সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ নিশ্চিত হলে পর্যটন, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও সুবিধা বাড়বে। বিশেষ করে সিলেটের পর্যটন খাত নতুন গতি পেতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে সিলেট-ঢাকা মহাসড়কের সম্প্রসারণ কাজ নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে চলমান এই প্রকল্পের ধীরগতির কারণে যাত্রীদের দুর্ভোগ বেড়েই চলেছে। অনেক সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকতে হয়। এতে পরিবহন ব্যয় যেমন বাড়ছে, তেমনি নষ্ট হচ্ছে মূল্যবান সময়। স্থানীয়রা আশা করছেন, সরকার সড়ক ও রেল—দুই খাতেই সমান গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেবে।
মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম তার বক্তব্যে আরও বলেন, সিলেট দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। তিনি উল্লেখ করেন, “প্রধানমন্ত্রীর শ্বশুরবাড়ির এলাকা হিসেবে নয়, বরং দেশের গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল হিসেবেই সিলেট আমাদের বিশেষ গুরুত্বের জায়গা। এখানকার মানুষের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন আমাদের দায়িত্ব।”
তার এই বক্তব্য রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনেও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, দীর্ঘদিনের অবহেলার পর অবশেষে সিলেটের যোগাযোগ খাতে বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। তবে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, ঘোষণার মধ্যেই যেন সবকিছু সীমাবদ্ধ না থাকে; বাস্তবায়নও দ্রুত দৃশ্যমান হতে হবে।
পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে রেলপথের গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। পরিবেশবান্ধব ও নিরাপদ যোগাযোগব্যবস্থা হিসেবে রেলকে আধুনিকায়নের কোনো বিকল্প নেই। ঢাকা-সিলেট রুটে নতুন বিশেষ ট্রেন চালু হলে সড়কপথের ওপর চাপ কমবে এবং যাত্রীদের সময় ও খরচ দুটোই সাশ্রয় হবে।
সিলেটবাসী এখন অপেক্ষায় রয়েছেন ঘোষিত বিশেষ ট্রেনটি কবে বাস্তবে রেললাইনে নামবে। বহু প্রতীক্ষিত এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে তা শুধু একটি নতুন ট্রেন সংযোজন হবে না, বরং সিলেট অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি লাঘবে বড় একটি পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হবে।


