প্রকাশ: ০৬ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
বাংলাদেশ পুলিশের প্রশাসনে বড় ধরনের রদবদলের অংশ হিসেবে সিলেট রেঞ্জে নতুন উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) নিয়োগ দিয়েছে সরকার। রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের (আরএমপি) কমিশনার মো. জিললুর রহমানকে সিলেট রেঞ্জের নতুন ডিআইজি হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বর্তমান ডিআইজি মো. মুশফেকুর রহমানকে পুলিশ সদর দপ্তরে বদলি করা হয়েছে। মঙ্গলবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ থেকে জারি করা পৃথক প্রজ্ঞাপনে এই রদবদলের তথ্য জানানো হয়।
পুলিশ প্রশাসনের এই পরিবর্তনকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে পরিচিত সিলেটে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, সীমান্ত নিরাপত্তা, পর্যটন কেন্দ্রের নিরাপত্তা ও নগরাঞ্চলের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে ডিআইজির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়। ফলে নতুন নেতৃত্বের আগমনকে কেন্দ্র করে পুলিশ প্রশাসনের ভেতরে ও বাইরে আলোচনা শুরু হয়েছে।
নতুন ডিআইজি মো. জিললুর রহমান দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ পুলিশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটে দায়িত্ব পালন করেছেন। পেশাগত দক্ষতা, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা এবং মাঠপর্যায়ের নেতৃত্বের কারণে তিনি পুলিশের ভেতরে একজন অভিজ্ঞ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত। রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, অপরাধ দমন এবং নাগরিকমুখী পুলিশিং কার্যক্রমে সক্রিয় ভূমিকা রাখার জন্য তিনি প্রশংসিত হন। এখন সিলেট রেঞ্জের দায়িত্ব পাওয়ায় এই অঞ্চলের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাপনায় নতুন গতি আসবে বলে আশা করছেন অনেকে।
অন্যদিকে, বিদায়ী ডিআইজি মো. মুশফেকুর রহমানকে পুলিশ সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে। সিলেটে দায়িত্ব পালনকালে তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। সীমান্তবর্তী এলাকায় চোরাচালান প্রতিরোধ, মাদকবিরোধী অভিযান, জঙ্গিবাদ দমন এবং সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় তার ভূমিকা প্রশাসনিক মহলে আলোচিত ছিল। দায়িত্ব পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে তিনি এখন কেন্দ্রীয় পর্যায়ে নতুন দায়িত্ব পালন করবেন।
একই দিনে জারি করা পৃথক আরেকটি প্রজ্ঞাপনে দেশের ১২ জেলায় নতুন পুলিশ সুপার (এসপি) নিয়োগসহ মোট ৩৯ জন কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়েছে। এ রদবদলকে পুলিশ প্রশাসনের চলমান পুনর্বিন্যাস ও কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, মাঠ প্রশাসনে কার্যকর সমন্বয় এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও শক্তিশালী করতেই এই পরিবর্তন আনা হয়েছে।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, মৌলভীবাজার জেলার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ বিল্লাল হোসেনকে নৌ পুলিশের পুলিশ সুপার হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে। অন্যদিকে, রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার রিয়াজুল ইসলামকে মৌলভীবাজার জেলার নতুন পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। মৌলভীবাজার একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমান্তবর্তী জেলা হওয়ায় সেখানে নতুন নেতৃত্বকে ঘিরেও স্থানীয় প্রশাসনে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
এছাড়া রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের নতুন কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন স্পেশাল ব্রাঞ্চের (এসবি) ডিআইজি মোহা. ফয়েজুল কবির। অপরদিকে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের নতুন কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ডিআইজি মো. আশিক সাঈদকে। বিদায়ী বিএমপি কমিশনার মো. শফিকুল ইসলামকে টুরিস্ট পুলিশে বদলি করা হয়েছে। পর্যটননির্ভর এলাকাগুলোর নিরাপত্তা জোরদারে টুরিস্ট পুলিশের কার্যক্রমকে আরও শক্তিশালী করতে এই পদায়ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পুলিশ প্রশাসনের উচ্চপর্যায়েও পরিবর্তন এসেছে। অতিরিক্ত ডিআইজি পর্যায়ের কর্মকর্তা সিআইডির মো. আবুল বাশার তালুকদারকে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ডিআইজি পদে পদোন্নতি পাওয়া সানা শামীনুর রহমানকে সিআইডিতে পদায়ন করা হয়েছে। প্রশাসনিক দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে অপরাধ তদন্ত কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করার লক্ষ্যেই এসব পরিবর্তন আনা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
জেলা পর্যায়েও একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে। পঞ্চগড় জেলার নতুন পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন এপিবিএন-২ এর কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমান। জয়পুরহাট জেলার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে রেলওয়ে পুলিশের কর্মকর্তা শাহনাজ বেগমকে। পাবনা জেলার নতুন পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন মো. মফিজ উদ্দিন। এছাড়া নীলফামারী, নড়াইল, সাতক্ষীরা, চাঁদপুর, ঝালকাঠি এবং ফেনী জেলাতেও নতুন পুলিশ সুপার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, প্রশাসনিক রদবদল সরকারি ব্যবস্থাপনার স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অংশ। সময়ের প্রয়োজন এবং জনস্বার্থ বিবেচনায় অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এতে প্রশাসনের কার্যক্রমে নতুন উদ্যম তৈরি হয় এবং মাঠপর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন আরও কার্যকর হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, সীমান্ত নিরাপত্তা, সাইবার অপরাধ, মাদক ও সংঘবদ্ধ অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশ প্রশাসনের ওপর চাপ বেড়েছে। ফলে অভিজ্ঞ ও দক্ষ কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে সিলেট অঞ্চলে সীমান্ত এলাকা, পর্যটন কেন্দ্র এবং নগর নিরাপত্তা—এই তিনটি বিষয়কে সমান গুরুত্ব দিয়ে কাজ করতে হবে নতুন ডিআইজিকে।
সিলেটবাসীর মধ্যেও নতুন ডিআইজিকে ঘিরে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। স্থানীয়রা আশা করছেন, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং নাগরিকবান্ধব পুলিশিং কার্যক্রমে আরও গতি আসবে। একই সঙ্গে পুলিশ প্রশাসনের সেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে নতুন নেতৃত্ব কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলেও প্রত্যাশা তাদের।
রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে জননিরাপত্তা বিভাগের উপ-সচিব স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, জনস্বার্থে এই রদবদল অবিলম্বে কার্যকর করা হবে। প্রশাসনিক এ পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পুলিশের কার্যক্রম আরও গতিশীল ও সমন্বিত হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


