প্রকাশ: ০১ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
মৌলভীবাজারের কুলাউড়া থানায় পুলিশ সুপারকে ঘুষ দেওয়ার চেষ্টার অভিযোগে এক যুবক ও এক নারীকে আটক করেছে পুলিশ। বৃহস্পতিবার দুপুরে ঘটে যাওয়া এ ঘটনাকে ঘিরে পুরো উপজেলাজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। পুলিশের দাবি, পারিবারিক একটি মামলার প্রভাব খাটিয়ে বিদেশগামী এক ব্যক্তির যাত্রা বন্ধ করতে পুলিশ সুপারের কাছে নগদ অর্থ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। তবে বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে ধরা পড়ে গেলে অভিযুক্ত দুজনকে টাকাসহ আটক করা হয়।
আটক ব্যক্তিরা হলেন কুলাউড়া উপজেলার রাউৎগাঁও ইউনিয়নের ভবানীপুর গ্রামের বাসিন্দা মৃত আতিকুর রহমান চৌধুরীর ছেলে ও স্থানীয় ব্যবসায়ী মইনুল ইসলাম চৌধুরী সামাদ এবং একই ইউনিয়নের আব্দুলপুর গ্রামের মৃত তাহির আলীর মেয়ে জেসমিন আক্তার।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, জেসমিন আক্তারের সঙ্গে তার সাবেক স্বামী মাহতাব মিয়ার পারিবারিক বিরোধ দীর্ঘদিনের। তাদের মধ্যে তালাকের পর বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আদালতে মামলা চলমান রয়েছে। এ নিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে উত্তেজনাও রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, পারিবারিক এই দ্বন্দ্বের জেরে একাধিকবার নানা অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগ সামনে এসেছে। এরই ধারাবাহিকতায় সাম্প্রতিক সময়ে বিদেশে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন মাহতাব মিয়া। আর সেই যাত্রা বন্ধ করতেই প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করা হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছে।
ঘটনার দিন কুলাউড়া থানায় সিলেট রেঞ্জের ডিআইজি মো. মুশফেকুর রহমানের দ্বি-বার্ষিক পরিদর্শন চলছিল। থানায় উপস্থিত ছিলেন মৌলভীবাজারের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ বিল্লাল হোসেন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (কুলাউড়া সার্কেল) মো. আজমল হোসেন এবং কুলাউড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ মনিরুজ্জামান মোল্যা। এ সময়ই জেসমিন আক্তার ও সামাদ থানায় এসে পুলিশ সুপারের সঙ্গে দেখা করেন।
পুলিশ সূত্রের দাবি, জেসমিন আক্তার তার সাবেক স্বামীর বিদেশ যাওয়া ঠেকাতে প্রশাসনিক সহযোগিতা চেয়ে বিষয়টি উপস্থাপন করেন। একপর্যায়ে সামাদ চৌধুরী একটি খামের মাধ্যমে পুলিশ সুপারের হাতে টাকা দেওয়ার চেষ্টা করেন। অভিযোগ রয়েছে, জেসমিনের কাছ থেকে নেওয়া মোট দুই লাখ টাকার মধ্যে সামাদ নিজে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা সরিয়ে রেখে ৪০ হাজার টাকা পুলিশ সুপারের হাতে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।
মৌলভীবাজারের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ বিল্লাল হোসেন বলেন, কয়েকদিন ধরে জেসমিন আক্তার তার সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করছিলেন। বৃহস্পতিবার সকালে তিনি মৌলভীবাজারে দেখা করতে চাইলে তাকে কুলাউড়া থানায় আসতে বলা হয়, কারণ সেদিন থানায় ডিআইজি’র পরিদর্শন কার্যক্রম ছিল। তিনি জানান, পরিদর্শন শেষে ওই নারী ও তার সঙ্গে থাকা যুবক সমস্যার কথা বলতে আসেন। কথোপকথনের একপর্যায়ে সামাদ একটি খাম তার হাতে দেন। খাম খুলে তিনি টাকার বান্ডিল দেখতে পান এবং সঙ্গে সঙ্গে উপস্থিত পুলিশ সদস্যদের তাদের আটক করার নির্দেশ দেন।
ঘটনার পরপরই থানাজুড়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। খবরটি দ্রুত স্থানীয়দের মধ্যে ছড়িয়ে পড়লে কুলাউড়া শহর ও আশপাশের এলাকায় ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। অনেকে ঘটনাটিকে প্রশাসনের কঠোর অবস্থানের উদাহরণ হিসেবে দেখছেন। আবার কেউ কেউ বলছেন, পারিবারিক দ্বন্দ্ব ও ব্যক্তিগত স্বার্থের সংঘাত কখনো কখনো মানুষকে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দেয়।
কুলাউড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মুহাম্মদ মনিরুজ্জামান মোল্যা জানান, এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেছে। আটক দুজনকে শুক্রবার আদালতে পাঠানো হবে। তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার বিস্তারিত বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তার সামনে প্রকাশ্যে ঘুষ দেওয়ার চেষ্টা অত্যন্ত গুরুতর বিষয়। এটি শুধু আইনগত অপরাধ নয়, বরং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও নৈতিকতার বিরুদ্ধেও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তাদের মতে, এ ধরনের ঘটনায় দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া জরুরি, যাতে প্রকৃত ঘটনা স্পষ্ট হয় এবং ভবিষ্যতে কেউ এমন কাজ করার সাহস না পায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পারিবারিক বিরোধ, বিদেশযাত্রা এবং আইনি জটিলতা নিয়ে দেশে প্রায়ই নানা ধরনের প্রতারণা ও প্রভাব খাটানোর চেষ্টা দেখা যায়। অনেক ক্ষেত্রে দালালচক্র বা সুবিধাভোগীরা মানুষকে ভুল পথে পরিচালিত করে। ফলে সাধারণ মানুষ আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি আইনি জটিলতায়ও জড়িয়ে পড়েন। তাই প্রশাসনিক বিষয়ে যেকোনো পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে সচেতন থাকা এবং আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ঘটনাটি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। অনেকেই পুলিশ সুপারের তাৎক্ষণিক পদক্ষেপের প্রশংসা করেছেন। তারা মনে করছেন, সরকারি দায়িত্ব পালনকালে এ ধরনের স্বচ্ছ অবস্থান জনমনে আস্থা বাড়াতে সহায়ক হবে।
সব মিলিয়ে কুলাউড়ার এই ঘটনা শুধু একটি ঘুষ দেওয়ার অভিযোগেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং এটি স্থানীয়ভাবে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, পারিবারিক দ্বন্দ্ব এবং আইনের শাসন নিয়ে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এখন মামলার তদন্ত ও আদালতের কার্যক্রমের দিকেই নজর রয়েছে সবার।


