মৌলভীবাজারে বৃষ্টিতে ডুবছে ৮৯৭ হেক্টর ফসল বোরো ধান

প্রকাশ: ০১ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।

টানা পাঁচ দিনের ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে মৌলভীবাজারের হাওরাঞ্চলে দেখা দিয়েছে নতুন শঙ্কা। জেলার হাকালুকি ও কাউয়াদীঘি হাওর এলাকার বিস্তীর্ণ কৃষিজমি পানিতে তলিয়ে গেছে। কৃষকদের চোখের সামনে পানির নিচে ডুবে যাচ্ছে পাকা ও আধাপাকা বোরো ধান। কৃষি বিভাগের হিসাবে, এ পর্যন্ত অন্তত ৮৯৭ হেক্টর জমির ফসল নিমজ্জিত হয়েছে। তবে স্থানীয় কৃষকদের দাবি, প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে। টানা বৃষ্টি, বজ্রপাতের আশঙ্কা এবং পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়ায় অনেক কৃষক এখনো মাঠে নেমে ধান কাটতে পারছেন না। ফলে উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠায় দিন কাটছে হাওরপাড়ের মানুষের।

মৌলভীবাজারের হাওরাঞ্চল মূলত কৃষিনির্ভর এলাকা। এখানকার মানুষের জীবিকা ও অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি বোরো ধান। সারা বছরের স্বপ্ন, শ্রম ও বিনিয়োগ নির্ভর করে এই এক মৌসুমের ফসলের ওপর। কিন্তু মৌসুমের শেষ দিকে এসে টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢল সেই স্বপ্নে বড় ধাক্কা দিয়েছে। বিশেষ করে হাকালুকি হাওর ও কাউয়াদীঘি হাওরের বিভিন্ন নিচু এলাকায় দ্রুত পানি বাড়তে শুরু করায় অনেক জমির ধান পুরোপুরি তলিয়ে গেছে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক জালাল উদ্দিন জানিয়েছেন, এ বছর জেলায় মোট ৬২ হাজার ৪০০ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২৭ হাজার ৩৫৫ হেক্টর জমি রয়েছে হাওরাঞ্চলে। তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত প্রায় ৮৫ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে। তবে টানা বৃষ্টিতে ৮৯৭ হেক্টর জমির ফসল পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে এবং বৃষ্টি কমে গেলে দ্রুত বাকি ধান কাটার কাজ শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

তবে মাঠপর্যায়ের কৃষকদের অভিজ্ঞতা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে। তাদের অভিযোগ, কাশিমপুর পাম্প হাউস সঠিকভাবে পরিচালিত না হওয়ায় পানি দ্রুত নিষ্কাশন করা সম্ভব হয়নি। অনেক কৃষক দাবি করেছেন, সেচ পাম্প নিয়মিত সচল থাকলে অন্তত কিছু জমির ফসল রক্ষা করা যেত। পানি নিষ্কাশনের ধীরগতির কারণে হাওরের পানি দ্রুত বেড়ে গিয়ে ফসল ডুবে যায় বলে অভিযোগ তাদের।

যদিও পানি উন্নয়ন বোর্ড এসব অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেছে। পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী খালেদ বিন ওয়ালিদ বলেন, কাশিমপুর পাম্প হাউসের পাম্পগুলো সচল রয়েছে এবং পরিস্থিতি মোকাবিলায় কাজ করছে। তিনি জানান, কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে নদ-নদীর পানি স্বাভাবিকভাবেই বেড়েছে। বিশেষ করে হাকালুকি হাওরে পানি জমলে জুড়ী নদীর পানিও দ্রুত বাড়ে। বর্তমানে জুড়ী নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হলেও জেলার অন্যান্য নদীর পানি এখনো নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে জানান তিনি।

স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শুধু বোরো ধান নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সবজি ক্ষেত ও আউশ ধানের বীজতলাও। অনেক কৃষক আগাম আউশ মৌসুমের প্রস্তুতি হিসেবে বীজতলা তৈরি করেছিলেন। কিন্তু অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় সেই বীজতলাও নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে। ফলে সামনে আরও বড় ক্ষতির আশঙ্কা করছেন তারা।

হাওরপাড়ের কৃষক আব্দুল মজিদ বলেন, কয়েকদিন আগেও তিনি আশা করেছিলেন সব ধান ঘরে তুলতে পারবেন। কিন্তু হঠাৎ টানা বৃষ্টিতে পরিস্থিতি বদলে গেছে। যেসব জমির ধান এখনো কাটা হয়নি, সেগুলো পানির নিচে চলে গেছে। তিনি বলেন, বজ্রপাতের ভয়েও অনেক শ্রমিক মাঠে নামতে চাইছেন না। ফলে সময়মতো ধান কাটা যাচ্ছে না।

আরেক কৃষক রতন দাস বলেন, ধান কেটে ঘরে তুললেও সমস্যা শেষ হচ্ছে না। রোদ না থাকায় অনেক জায়গায় কাটা ধান শুকানো যাচ্ছে না। ভেজা ধানে অঙ্কুর গজানোর আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে। তিনি বলেন, কয়েকদিনের মধ্যেই পরিস্থিতির উন্নতি না হলে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বেন তারা।

এদিকে টানা বর্ষণে জেলার শহরাঞ্চলেও ভোগান্তি বেড়েছে। মৌলভীবাজার শহরের বিভিন্ন খাল-নালা উপচে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। নিচু এলাকার অনেক বাসাবাড়ি, দোকানপাট ও সড়কে পানি উঠে গেছে। কোথাও কোথাও হাঁটুসমান পানি জমে মানুষের চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে। ব্যবসায়ীরাও ক্ষতির মুখে পড়ছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

আবহাওয়া অফিস ও স্থানীয় সূত্র জানায়, কয়েকদিন ধরে মৌলভীবাজারে মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাত হচ্ছে। ঝড়ো হাওয়ার সঙ্গে বজ্রপাতের আশঙ্কাও রয়েছে। আবহাওয়ার এই বৈরী পরিস্থিতি কৃষকদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। কারণ হাওরাঞ্চলে শেষ সময়ের বৃষ্টি মানেই ফসলহানির ঝুঁকি।

কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, সাম্প্রতিক বৃষ্টিতে নতুন করে আরও প্রায় সাড়ে ৩০০ হেক্টর জমির ফসল আক্রান্ত হয়েছে। তবে বৃষ্টি কমে গেলে পানি দ্রুত নেমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে দ্রুত ফসল কাটার কাজ সম্পন্ন করার জন্য কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, হাওরাঞ্চলে প্রতি বছরই প্রাকৃতিক দুর্যোগ কৃষকদের জীবনে অনিশ্চয়তা তৈরি করে। কখনো আগাম বন্যা, কখনো অতিবৃষ্টি কিংবা পাহাড়ি ঢল—সব মিলিয়ে কৃষকরা চরম ঝুঁকির মধ্যে থাকেন। তাই শুধু সাময়িক সহায়তা নয়, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে হাওর রক্ষা বাঁধ, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং আধুনিক কৃষি অবকাঠামো উন্নয়ন জরুরি বলে মনে করছেন তারা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে হাওরাঞ্চলের আবহাওয়ার ধরন বদলে যাচ্ছে। ফলে মৌসুমের স্বাভাবিক চক্রও অস্থির হয়ে উঠছে। এতে কৃষকদের ক্ষতির ঝুঁকি বাড়ছে। তাই কৃষি ও পানি ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণের পাশাপাশি দুর্যোগ মোকাবিলায় স্থানীয় পর্যায়ে প্রস্তুতি জোরদার করার তাগিদ দিয়েছেন তারা।

সব মিলিয়ে মৌলভীবাজারের হাওরাঞ্চলে এখন উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠার পরিবেশ বিরাজ করছে। কৃষকের ঘরে ওঠার অপেক্ষায় থাকা সোনালি ধান এখন পানির নিচে। অনেকের বছরের একমাত্র ভরসা এই ফসল। তাই দ্রুত আবহাওয়ার উন্নতি এবং সরকারি সহায়তার আশায় দিন গুনছেন হাওরপাড়ের মানুষ।

এই সপ্তাহের খবরাখবর

হবিগঞ্জে ডিজেল বিক্রিতে অনিয়ম, দুই ব্যবসায়ীর জরিমানা

প্রকাশ: ০১ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

এসপিকে ঘুষ দিতে গিয়ে কুলাউড়ায় আটক ২

প্রকাশ: ০১ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

শাল্লায় বৃষ্টি-ঝড়ে বিপর্যস্ত হাওর ও জনজীবন, বিদ্যুৎ ও নেটওয়ার্ক বন্ধ

প্রকাশ: ০১ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

শান্তিগঞ্জে কৃষকদের কাছ থেকে ধান কিনবে সরকার

প্রকাশ: ০১ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

দিরাইয়ে আগুনে ছাই ৬ দোকান, নিঃস্ব ব্যবসায়ীরা

প্রকাশ: ০১ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বিষয়বস্তু

হবিগঞ্জে ডিজেল বিক্রিতে অনিয়ম, দুই ব্যবসায়ীর জরিমানা

প্রকাশ: ০১ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

এসপিকে ঘুষ দিতে গিয়ে কুলাউড়ায় আটক ২

প্রকাশ: ০১ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

শান্তিগঞ্জে কৃষকদের কাছ থেকে ধান কিনবে সরকার

প্রকাশ: ০১ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

দিরাইয়ে আগুনে ছাই ৬ দোকান, নিঃস্ব ব্যবসায়ীরা

প্রকাশ: ০১ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

তাহিরপুরে শুক্রবার ৮ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকবে না

প্রকাশ: ০১ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

বাসিয়া নদীতে সেতুর অপেক্ষায় আট গ্রামের মানুষ

প্রকাশ: ০১ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

শমশেরনগর বিমানবন্দর ঘিরে নতুন স্বপ্ন

প্রকাশ: ০১ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক ।...

সম্পর্কিত নিবন্ধ

জনপ্র্যিয় পেজ