প্রকাশ: ০১ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
সিলেট বিভাগের মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা আবারও আলোচনায় এসেছে। বহু বছর ধরে কার্যত পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকা মৌলভীবাজারের শমশেরনগর বিমানবন্দর পুনরায় চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক ঘোষণার পর নতুন করে আশাবাদী হয়ে উঠেছেন স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী, পর্যটনসংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তা এবং প্রবাসী পরিবারগুলো। বিশেষ করে সিলেট অঞ্চলের বিকল্প আঞ্চলিক বিমান যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে ওঠার সম্ভাবনাকে ঘিরে জনমনে তৈরি হয়েছে নতুন আগ্রহ।
জাতীয় সংসদে তারকা চিহ্নিত এক প্রশ্নের জবাবে বেসামরিক বিমান পরিবহণ ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম জানিয়েছেন, দেশের বন্ধ ও কম ব্যবহৃত বিমানবন্দরগুলোর সম্ভাবনা পুনরায় যাচাই করছে সরকার। এই উদ্যোগের আওতায় মৌলভীবাজারের শমশেরনগর বিমানবন্দরকে পুনরুজ্জীবিত করার পরিকল্পনাও বিবেচনায় রয়েছে। সরকারের এই অবস্থানকে দেশের আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থা উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বর্তমানে বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দর, নেভিগেশন সেবা প্রদানকারী অবকাঠামো, বিমান বাহিনীর ঘাঁটি এবং স্বল্প দূরত্বে উড্ডয়ন-অবতরণের সুবিধাসহ মোট ১৭টি বিমানবন্দর রয়েছে বলে সংসদে জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নির্মিত কয়েকটি পুরোনো এসটিওএল বিমানবন্দর বর্তমানে বন্ধ বা সীমিত ব্যবহারে রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মৌলভীবাজারের শমশেরনগর, ঠাকুরগাঁও, লালমনিরহাট, ঈশ্বরদী, কুমিল্লা ও পটুয়াখালী বিমানবন্দর। তবে কুমিল্লা বিমানবন্দরে বাণিজ্যিক ফ্লাইট পরিচালিত না হলেও বিদেশি উড়োজাহাজের নেভিগেশন সেবা দেওয়া হচ্ছে।
শমশেরনগর বিমানবন্দরকে ঘিরে মানুষের আগ্রহের পেছনে রয়েছে এর ঐতিহাসিক গুরুত্বও। ব্রিটিশ আমলে প্রতিষ্ঠিত এই বিমানবন্দর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সে সময় মিত্রবাহিনীর সামরিক কার্যক্রম পরিচালনায় এটি ব্যবহৃত হতো। স্বাধীনতার পর কিছু সময় অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট চলাচল করলেও ধীরে ধীরে বাণিজ্যিক কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিমানবন্দরটি গুরুত্ব হারায় এবং প্রয়োজনীয় উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে।
বর্তমানে বিমানবন্দরটি বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রানওয়ের মৌলিক কাঠামো এখনো সচল থাকলেও পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক বিমানবন্দর হিসেবে পরিচালনার জন্য আধুনিক যাত্রী টার্মিনাল, নিরাপত্তা অবকাঠামো, এয়ার ট্রাফিক সিস্টেম এবং প্রয়োজনীয় গ্রাউন্ড সার্ভিস সুবিধার বড় ঘাটতি রয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী ও স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তাদের ধারণা, তুলনামূলক সীমিত ব্যয়ে সংস্কার ও আধুনিকায়নের মাধ্যমে বিমানবন্দরটি পুনরায় চালু করা সম্ভব।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শমশেরনগর বিমানবন্দর চালু হলে শুধু মৌলভীবাজার নয়, পুরো সিলেট বিভাগের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। কারণ এই অঞ্চলটি দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন ও চা-শিল্প এলাকা। শ্রীমঙ্গল, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত, হাকালুকি হাওরসহ অসংখ্য পর্যটনকেন্দ্রের অবস্থান মৌলভীবাজার জেলায়। দেশি-বিদেশি পর্যটকদের জন্য সহজ ও দ্রুত যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে উঠলে পর্যটন শিল্পে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে বলে মনে করছেন উদ্যোক্তারা।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মতে, সড়কপথে দীর্ঘ যাত্রা ও যানজটের কারণে অনেক পর্যটক ও বিনিয়োগকারী মৌলভীবাজার অঞ্চলে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। বিমান যোগাযোগ চালু হলে ঢাকা ও দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ অনেক সহজ হবে। এতে চা-শিল্প, কৃষিপণ্য পরিবহন, হোটেল-রিসোর্ট ব্যবসা এবং স্থানীয় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা সরাসরি উপকৃত হবেন।
এছাড়া প্রবাসী অধ্যুষিত সিলেট বিভাগের জন্য বিকল্প বিমান অবকাঠামো গড়ে ওঠাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বর্তমানে ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ওপর যাত্রীচাপ ক্রমেই বাড়ছে। ভবিষ্যতে আঞ্চলিক বিমান চলাচল আরও সম্প্রসারিত হলে শমশেরনগর বিমানবন্দর সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, শুধু বিমানবন্দর চালুর ঘোষণা দিলেই হবে না, বাস্তবায়নের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। অতীতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিমানবন্দর উন্নয়নের ঘোষণা এলেও অনেক প্রকল্প শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি। তাই এবারও জনগণ বাস্তব অগ্রগতি দেখতে চায়। তারা মনে করছেন, আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি দক্ষ জনবল, নিরাপত্তা মান বজায় রাখা এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা জরুরি।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, দেশের আঞ্চলিক বিমানবন্দরগুলো পুনরুজ্জীবিত করার একটি বৃহৎ পরিকল্পনা নিয়ে কাজ চলছে। এর অংশ হিসেবে সম্ভাবনাময় বিমানবন্দরগুলোর অবকাঠামো, যাত্রী চাহিদা, অর্থনৈতিক কার্যকারিতা এবং ভবিষ্যৎ ব্যবহারের সুযোগ নিয়ে সমীক্ষা করা হচ্ছে। শমশেরনগর বিমানবন্দরও সেই তালিকায় রয়েছে। প্রাথমিকভাবে রানওয়ে সম্প্রসারণ, আধুনিক টার্মিনাল নির্মাণ এবং আন্তর্জাতিক মানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়গুলো আলোচনায় রয়েছে।
এদিকে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক উৎসাহ দেখা গেছে। অনেকেই মনে করছেন, দীর্ঘদিন পর আবারও শমশেরনগর জাতীয় পর্যায়ে আলোচনায় আসায় অঞ্চলের উন্নয়নের নতুন দ্বার খুলতে পারে। তরুণ উদ্যোক্তারা আশা করছেন, বিমানবন্দর চালু হলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং পর্যটনভিত্তিক ব্যবসায় বিনিয়োগ বাড়বে।
তবে পরিবেশবিদদের একটি অংশ বলছেন, উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নের সময় পরিবেশগত ভারসাম্যের বিষয়টি গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ মৌলভীবাজারের বিস্তীর্ণ এলাকা জীববৈচিত্র্য ও বনাঞ্চলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাই অবকাঠামো উন্নয়ন যেন পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব না ফেলে, সেদিকেও নজর রাখতে হবে।
সব মিলিয়ে বহু বছর ধরে নিস্তব্ধ হয়ে থাকা শমশেরনগর বিমানবন্দর এখন আবার সম্ভাবনার কেন্দ্রবিন্দুতে। সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবে রূপ পেলে এটি শুধু একটি বিমানবন্দর পুনরায় চালুর ঘটনা হবে না; বরং সিলেট বিভাগের অর্থনীতি, পর্যটন, যোগাযোগ ও আঞ্চলিক উন্নয়নের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।


