প্রকাশ: ০১ মে ২০২৬ । সময়ের সন্ধান ডেস্ক । সময়ের সন্ধান অনলাইন।
বর্ষা এলেই সিলেট নগরীর মানুষের মনে ফিরে আসে পুরোনো আতঙ্ক—জলাবদ্ধতা। কয়েক ঘণ্টার টানা বর্ষণেই নগরের সড়ক, অলিগলি, বাসাবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পানিতে তলিয়ে যাওয়ার দৃশ্য যেন বহু বছরের বাস্তবতা। বিশেষ করে নিম্নাঞ্চলগুলোতে হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে নাগরিক জীবন প্রায় অচল হয়ে পড়ে। দীর্ঘদিন ধরে নানা প্রকল্প গ্রহণ করা হলেও স্থায়ী সমাধান না মেলায় নগরবাসীর হতাশা ক্রমেই বেড়েছে। তবে এবার নতুন করে আশার আলো দেখছেন সিলেটবাসী। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন সিলেট সফরকে ঘিরে নগরবাসীর প্রত্যাশা—এবার হয়তো জলাবদ্ধতার অভিশাপ থেকে মুক্তির বাস্তব উদ্যোগ শুরু হতে যাচ্ছে।
আগামীকাল শনিবার সিলেট সফরকালে প্রধানমন্ত্রী জলাবদ্ধতা ও বন্যা নিয়ন্ত্রণে একটি বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। প্রায় ৪ হাজার ৬৩৫ কোটি টাকার এই প্রকল্পের আওতায় সুরমা নদীর সঙ্গে সংযুক্ত গুরুত্বপূর্ণ ছড়া ও খালে স্লুইসগেট নির্মাণ, নদীর তীর সংরক্ষণ, বন্যা প্রতিরোধী অবকাঠামো নির্মাণ এবং নদীতীর উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নিয়েছে সিলেট সিটি করপোরেশন (সিসিক)।
সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা বলছেন, সিলেট নগরীর জলাবদ্ধতার অন্যতম বড় কারণ হচ্ছে সুরমা নদীর নাব্যতা হ্রাস। বর্ষাকালে নদীর পানি স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে গেলে নগরের ছড়া ও খালগুলো দিয়ে পানি বের হওয়ার পরিবর্তে উল্টো নদীর পানি নগরে প্রবেশ করে। ফলে নগরের বিভিন্ন এলাকায় হঠাৎ করেই সৃষ্টি হয় ভয়াবহ জলাবদ্ধতা। নগরের প্রধান ছড়া ও খালগুলো অনেক স্থানে দখল, দূষণ ও অপরিকল্পিত উন্নয়নের কারণে সংকুচিত হয়ে পড়েছে। এতে বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশন সম্ভব হয় না।
সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী আলী আকবর জানিয়েছেন, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে নগরীর জলাবদ্ধতা পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হবে বলে আশা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, সুরমা নদীতে পতিত হওয়া গুরুত্বপূর্ণ তিনটি ছড়া ও খালে আধুনিক স্লুইসগেট নির্মাণ করা হবে। পাশাপাশি নদীর দুই পাড় উঁচু করা, প্রয়োজনীয় স্থানে প্রতিরক্ষা দেয়াল নির্মাণ এবং নদীতীরজুড়ে ওয়াকওয়ে তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে। শনিবার প্রধানমন্ত্রী এই প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করবেন।
তিনি আরও জানান, সিলেট নগরের দীর্ঘমেয়াদি বন্যা ও জলাবদ্ধতা নিয়ন্ত্রণে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকার একটি সমন্বিত পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে। এর প্রথম ধাপে ৪ হাজার ৬৩৫ কোটি টাকার প্রকল্প প্রস্তাব জমা দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ও বিদেশি ঋণ সহায়তার মাধ্যমে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সিসিক সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের আওতায় সুরমা নদীর দুই তীরে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ ওয়াকওয়ে নির্মাণ করা হবে। এটি একদিকে নগরীর সৌন্দর্য বৃদ্ধি করবে, অন্যদিকে নদীতীর সংরক্ষণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বৈঠাখালের কাজিরবাজার মাছবাজার ও তোপখানা এলাকার মধ্যবর্তী স্থানে, হলদিছড়ার চালিবন্দর এলাকায় এবং গোয়ালীছড়ার বোরহান উদ্দীন মাজার সংলগ্ন এলাকায় নির্মিত হবে অত্যাধুনিক স্লুইসগেট।
প্রকৌশলীরা বলছেন, বর্ষাকালে যখন সুরমা নদীর পানির উচ্চতা বেড়ে যায়, তখন এসব স্লুইসগেট বন্ধ করে দেওয়া হবে। এতে নদীর পানি আর ছড়া ও খাল দিয়ে নগরে প্রবেশ করতে পারবে না। একই সঙ্গে অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি নিয়ন্ত্রিতভাবে নিষ্কাশনের ব্যবস্থাও রাখা হবে। ফলে নগরে আকস্মিক বন্যা ও দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুল কাইয়ূম চৌধুরী জানিয়েছেন, প্রকল্পটি শুধু বন্যা ও জলাবদ্ধতা নিরসনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি সিলেট নগরীর সামগ্রিক পরিবেশ ও নান্দনিক উন্নয়নের একটি বড় পদক্ষেপ। তিনি বলেন, সুরমা নদীকে ঘিরে পরিকল্পিত উন্নয়ন হলে নগরবাসী আধুনিক নদীতীর সুবিধা পাবে। একই সঙ্গে পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা, পর্যটন সম্ভাবনা বৃদ্ধি এবং নাগরিক বিনোদনের নতুন সুযোগও তৈরি হবে।
নগরবাসীর অনেকেই মনে করছেন, এটি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে সিলেট শহরের চেহারা বদলে যেতে পারে। ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী ও চাকরিজীবীদের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ অনেকটাই কমবে। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে যেসব এলাকায় জলাবদ্ধতার কারণে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়, সেসব এলাকার মানুষ সবচেয়ে বেশি আশাবাদী হয়ে উঠেছেন।
তবে অতীত অভিজ্ঞতার কারণে অনেক নাগরিক এখনো কিছুটা সংশয়ে রয়েছেন। কারণ এর আগে জলাবদ্ধতা নিরসনে বিভিন্ন সময়ে শত শত কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হলেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি। অনেকেই অভিযোগ করেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে সমন্বয়ের অভাব, অপরিকল্পিত কাজ, খাল দখলমুক্ত না করা এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতির কারণে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়নি।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, শুধু অবকাঠামো নির্মাণ করলেই হবে না; এর সঙ্গে খাল ও ছড়াগুলো নিয়মিত খনন, দখলমুক্তকরণ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়নও জরুরি। অন্যথায় নতুন অবকাঠামোও ভবিষ্যতে অকার্যকর হয়ে পড়তে পারে। তারা মনে করেন, সুরমা নদীর নাব্যতা পুনরুদ্ধারেও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
এদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরকে কেন্দ্র করে সিলেট নগরীতে প্রশাসনিক তৎপরতা বেড়েছে। বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প, সড়ক সংস্কার এবং সৌন্দর্যবর্ধন কার্যক্রমও জোরদার করা হয়েছে। রাজনৈতিক অঙ্গনেও সফরটি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। স্থানীয় নেতাকর্মীরা আশা করছেন, প্রধানমন্ত্রীর এই সফর সিলেটের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নতুন গতি আনবে।
সিলেটবাসীর দীর্ঘদিনের একটি স্বপ্ন হচ্ছে জলাবদ্ধতামুক্ত নগরী। বর্ষা এলেই ঘরবন্দি জীবন, ব্যবসায় ক্ষতি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াতের দুর্ভোগ এবং রোগবালাইয়ের ঝুঁকি নগরবাসীকে ক্লান্ত করে তোলে। তাই নতুন এই মহাপরিকল্পনা ঘিরে মানুষের প্রত্যাশাও অনেক বেশি। এখন দেখার বিষয়, ঘোষিত প্রকল্প কত দ্রুত বাস্তবায়নের পথে এগোয় এবং বাস্তবে কতটা কার্যকর পরিবর্তন এনে দিতে পারে।


